শিরোনাম

মো. নাসির আহমেদ
বগুড়া, ২ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার খ্যাত প্রাচীন শহর বগুড়াকে একটি ‘আধুনিক ও স্মার্ট সিটি’ হিসেবে গড়ে তুলতে সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বা ‘মাস্টারপ্ল্যান’ প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসন, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অসহনীয় যানজট দূর করাই হবে আগামী পাঁচ বছরের উন্নয়নের মূল লক্ষ্য।
বগুড়া পৌরসভার নগর পরিকল্পনাবিদ মোহাম্মদ আল মেহেদী হাসান বাসস’কে জানান, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে প্রশাসনের উদ্যোগে একটি আধুনিক মাস্টারপ্ল্যান তৈরির জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রস্তাব পাঠানো হয়। যার প্রেক্ষিতে বর্তমানে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর কাজ শুরু করার সবুজ সংকেত দিয়েছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও জন আকাঙ্ক্ষা:
বগুড়াবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘ ১৭ বছর এই জনপদ কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত ছিল। তবে বর্তমানে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব বগুড়া থেকে নির্বাচিত হওয়ায় জেলাবাসীর মনে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। গণমানুষের প্রত্যাশা, এবার বগুড়ার অবহেলিত অবকাঠামোর আমূল পরিবর্তন ঘটবে।
জনসংখ্যা ও ঘনত্বের চাপ:
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বগুড়া জেলার বর্তমান জনসংখ্যা ৩৭ লাখ ৩৪ হাজার ২৯৭ জন। এরমধ্যে কেবল শহর এলাকাতেই বাস করেন ৯ লাখ ৬১ হাজার ৩৫৪ জন মানুষ। জেলা পর্যায়ে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ১২৮৮ জন। বিপুল এই জনসংখ্যার চাপ সামলাতে একটি বিজ্ঞানসম্মত নগর পরিকল্পনা এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জলাবদ্ধতা ও ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক:
নগর পরিকল্পনাবিদ বাসস’কে জানান, শহরের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা। বর্তমানে শহরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা মূল ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের বাইরে রয়েছে। একটি বিজ্ঞানসম্মত মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তবে বর্তমানে জরুরি ভিত্তিতে কিছু জায়গায় ম্যানুয়াল সার্ভের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
নাগরিক ও বিশেষজ্ঞ মতামত:
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), বগুড়ার সহ-সভাপতি মিলন রহমান বাসস’কে বলেন, ‘শহরের প্রধান সমস্যা হলো যানজট। এর সঙ্গে ড্রেনেজ ও ফুটপাত দখল ওতপ্রোতভাবে জড়িত।’ তিনি করতোয়া নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে গোবিন্দগঞ্জের কাটাখালির রেগুলেটর খুলে দেয়া এবং নদী খনন ও দখলমুক্ত করার ওপর জোর দেন।
একইভাবে সংস্কৃতিকর্মী ও শিক্ষিকা প্রীতি দত্ত বলেন, ‘যানজটের কারণে গন্তব্যে পৌঁছাতে দেরি হওয়া এবং হকারদের ফুটপাত দখলে থাকায় পথচারীদের চলাচলে ভোগান্তি এখন নিত্যদিনের বিষয়। এই সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।’
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ:
বগুড়া শহরে প্রতিদিন প্রায় ২শ’ টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। বগুড়া পৌরসভার নগর পরিকল্পনাবিদ মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমরা নিজস্ব ডাম্পিং স্টেশনের জন্য জমি ক্রয়ের অনুমোদন পেয়েছি। এখানে সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট এবং ফেকাল স্লাজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।’ সেপটিক ট্যাংকের সংযোগ ড্রেনে দেয়াকে তিনি একটি ‘অমানবিক কাজ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
যানজট ও ফুটপাত:
অতিরিক্ত অটোরিকশা এবং একই রাস্তায় বিভিন্ন গতির যানবাহনের সংমিশ্রণকেই যানজটের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আগামী পরিকল্পনায় ট্রাফিক ভলিউম সার্ভে অনুযায়ী যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং ফুটপাত দখলমুক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে।
পরিকল্পনাবিদ আশা প্রকাশ করেন, বিশাল এই জনসংখ্যার বিপরীতে আধুনিক মাস্টারপ্ল্যান সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে বগুড়া কেবল নামেই নয়, সেবা ও আধুনিকতার বিচারেও একটি প্রকৃত ‘স্মার্ট সিটি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।