শিরোনাম

ঢাকা, ২ এপ্রিল ২০২৬ (বাসস) : ইরানের প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ বিরতি চেয়েছেন বলে বুধবার দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তবে তিনি বলেন, এর আগে তেহরানকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে হবে।
জাতির উদ্দেশে ভাষণের আগে তিনি এ কথা বলেন।
তেহরান ট্রাম্পের এ দাবি সরাসরি নাকচ করেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ওয়াশিংটনের কাছে যুদ্ধ বিরতি চাননি বলে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বুধবার সন্ধ্যায় ইরান ইসরাইল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি লক্ষ্য করে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘোষণা দেয়।
ওয়াশিংটন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।
বহুল প্রতীক্ষিত প্রাইম-টাইম ভাষণের আগে ট্রাম্প এ বক্তব্য দেন।
স্থানীয় সময় বুধবার রাত ৯টা এই ভাষণ হওয়ার কথা।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার পর শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের পর এটিই তার প্রথম ভাষণ।
ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে লেখেন, ‘হরমুজ প্রণালি খোলা, মুক্ত ও নিরাপদ হলে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বিরতি বিবেচনা করবে। তার আগে আমরা ইরানকে ধ্বংস করে দেব অথবা যেমন বলা হয়, প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেব।’
তেহরান জানিয়েছে, যুদ্ধ শেষ করতে কোনো আলোচনা চলছে না। বুধবার ইরানের রাজধানীতে বড় বিস্ফোরণের খবর দিয়েছেন এএফপি সাংবাদিকরা।
যুদ্ধ শুরুর পর, ট্রাম্পের অবস্থান কখনও কঠোর, কখনও নমনীয় হতে দেখা গেছে।
মঙ্গলবার তিনি বলেন, এক মাসের এই যুদ্ধ ‘দুই সপ্তাহ, হয়তো তিন সপ্তাহের মধ্যে’ শেষ হতে পারে।
আলোচনা প্রসঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই ট্রাম্পের দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এটি ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।’
এর আগে ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, যুদ্ধ বিরতির জন্য ইরানের ‘প্রয়োজনীয় সদিচ্ছা’ রয়েছে।
তবে শর্ত হলো, প্রতিপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে যে তারা আর সংঘাতে ফিরবে না।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বুধবার জানায়, দেশের ‘শত্রুদের’ জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধই থাকবে।
বৈশ্বিক তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় জ্বালানির দাম বেড়েছে।
গার্ড বাহিনী আরও জানায়, উপসাগরে একটি তেলবাহী জাহাজে তারা হামলা চালিয়েছে।
তাদের দাবি অনুযায়ী ওই তেলবাহী জাহাজ ইসরাইলের।
ব্রিটিশ এক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা জানায়, কাতারের উপকূলের কাছে জাহাজটিতে আঘাত হানা হয়েছে। এতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তবে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
-‘শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ’-
ইরানের সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড জানায়, সর্বশেষ হামলায় তেল আবিব ও ইলাতসহ ইসরাইলের বিভিন্ন শহর এবং বাহরাইন ও কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করা হয়েছে।
তবে আঘাতের নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এএফপির একজন সাংবাদিক জানান, বুধবার বিকেলে তেহরানে বড় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এর আগে সাবেক মার্কিন দূতাবাসের কাছেও হামলার ঘটনা ঘটে।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি লিখিত বিবৃতিতে বলেন, ‘নিষ্ঠুর ও নির্মম মার্কিন ও জায়নবাদী শত্রু মানবিক, নৈতিক বা মৌলিক কোনো সীমা মানে না।’
সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি যুদ্ধের প্রথম দিনে বিমান হামলায় তার পিতা নিহত হওয়ার পর দায়িত্ব নেন। এরপর থেকে তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
বুধবার তেহরানে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌ কমান্ডারের জানাজায় হাজারো মানুষ অংশ নেয়।
৫৭ বছর বয়সী শোকাহত মুসা নওরুজি বলেন, ‘আমরা শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ করব।’
ইরানি গণমাধ্যম জানায়, ইসফাহান প্রদেশের একটি যাত্রীবাহী বিমানবন্দর ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের ইস্পাত স্থাপনায় হামলায় ক্ষতি হয়েছে।
ইসরাইলি বাহিনী নিশ্চিত করেছে যে তারা তেহরানে হামলা চালিয়েছে।
অন্যদিকে, ইসরাইলের জরুরি সেবা বিভাগ জানায় যে বুধবার সকালে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১১ বছর বয়সী এক শিশুসহ ১৪ জন আহত হয়েছে।
ইসরাইল আরও জানায়, ইয়েমেন থেকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ করা হয়েছে।
সপ্তাহের শেষে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার পর এটি ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের তৃতীয় হামলা।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, লেবাননে দক্ষিণ বৈরুতের আশপাশে হামলায় সাত জন নিহত হয়েছেন।
ইসরাইলি বাহিনী বলেছে, তারা হিজবুল্লাহর এক জ্যেষ্ঠ কমান্ডারকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
ঘটনাস্থলে এএফপি প্রতিনিধিরা পোড়া ও ধ্বংসস্তূপে ভরা একটি সড়ক দেখতে পান।
স্থানীয় বাসিন্দা হাসান জলওয়ান বলেন, ‘কি হচ্ছে কেউ জানে না।’
তিনি আরও জানান, বাস্তুচ্যুত মানুষ খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ২ মার্চ ইসরাইল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটিতে ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
উপসাগরীয় অঞ্চলে কুয়েতে হামলায় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বাণিজ্যিক স্থাপনায় আগুনের খবর দেয়।
সৌদি আরব জানায়, তারা কয়েকটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রতিহত করা একটি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে এক বাংলাদেশী নাগরিক নিহত হয়েছেন।
এদিকে, ইরাকের স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তানে একটি ইঞ্জিন তেল কোম্পানির গুদামে ড্রোন হামলায় বড় অগ্নিকাণ্ড ঘটে।
ইরাকের ইরবিল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে ৩১ বছর বয়সী ট্রাকচালক ওয়াদ আবদুল রাজ্জাক বলেন, ‘প্রতিদিনই ড্রোনের শব্দ শুনি। সকালে শুনি, রাতে শুনি। এখন আর শান্তিতে ঘুমাতে বা থাকতে পারি না।’
-দামের অস্থিরতা-
যুদ্ধ দ্রুত শেষ হতে পারে— ট্রাম্পের এমন মন্তব্যে বুধবার তেলের দাম কমেছে এবং ইউরোপ ও এশিয়ার শেয়ারবাজারে উত্থান হয়েছে।
তবে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণের কারণে, যেখান দিয়ে উপসাগরীয় তেল ও গ্যাস বিশ্ববাজারে পৌঁছে, জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে পেট্রোলের দাম চার বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো গ্যালনপ্রতি ৪ ডলার ছাড়িয়েছে। ইউরোপে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সহায়তা কর্মসূচি ঘোষণা শুরু করেছে।
ফ্রান্সের তুলুজ শহরে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে অংশ নেওয়া ট্রাক চালক নিকোলা বার্তেস বলেন, ‘আমরা ছোট প্রতিষ্ঠান। এই মাসে অতিরিক্ত ডিজেল খরচ হয়েছে ১৫ হাজার ইউরো। এর পুরোটা গ্রাহকদের ওপর চাপাতে পারছি না।’
যুদ্ধে সহযোগিতা না করায় মিত্রদের সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বুধবার আবারও জানিয়েছেন, তার দেশ এই যুদ্ধে অংশ নেবে না।
যুক্তরাজ্য জানায়, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর উপায় নিয়ে এই সপ্তাহে প্রায় ৩৫টি দেশের বৈঠক আয়োজন করা হবে।