শিরোনাম

।। মো. তানভীর হায়াত খান।।
নেত্রকোণা, ১৫ মার্চ ২০২৬ (বাসস): পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে নেত্রকোণা জেলা শহরে এখন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। বিশেষ করে এ বছর ধানের ভালো দাম পাওয়ায় হাওরাঞ্চলের মানুষের মুখে ফুটেছে হাসির ঝিলিক, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে ঈদের বাজারে।
গতকাল শনিবার (১৪ মার্চ) রাতে জেলায় শিলাবৃষ্টি হওয়ায় আজ রোববার আবহাওয়া বেশ শীতল এবং উপভোগ্য, যার প্রভাব পরেছে ঈদের কেনাকাটায়। গত দুইদিন জেলায় বৃষ্টি হওয়ায় গরম একটু কম থাকায় রোজা রেখে ক্রেতারা স্বস্তিতে কেনাকাটা করছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, জেলা শহরের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র ‘বড় বাজার’ এখন ক্রেতাদের প্রধান মিলনমেলা। প্রতিদিন সকাল ৯টার পর থেকেই পুরো শহর সরগরম হয়ে উঠছে। বিকেলের ভিড় এড়াতে অনেক ক্রেতা সাতসকালেই হাজির হচ্ছেন পছন্দের পোশাক ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করতে। রমজান মাস হওয়ায় সকাল থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত শহরের বড় বাজার, ছোট বাজার ও মোক্তারপাড়া এলাকায় ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘ সময় কেনাকাটায় ব্যস্ত থাকায় অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের একসাথেই ইফতার করতে দেখা যাচ্ছে।
বড় বাজারে সেবা ফ্যাশনের স্বত্বাধিকারী মো. শাওন চৌধুরীর সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, এ বছর ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন বয়সের মানুষের পোশাক রয়েছে তার বিপণিবিতানে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে ঈদের বাজার, এখন নাগাদ বেচাকেনা ভালোই চলছে, আশা করা যায় চাঁদ রাত নাগাদ প্রত্যাশা অনুযায়ী বিক্রি হবে ইনশাআল্লাহ।"
কাপড় কিনে পোশাক দর্জির কাছে নিজের পছন্দের ডিজাইনে তৈরি পোশাকেও আনন্দ খুঁজে পান ক্রেতারা। বিশেষ করে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া মেয়েদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে কারিগরদের দোকানে।
বড় বাজারে রহমান প্লাজার রেখা টেইলার্সের প্রধান কারিগর হিমেল সরকার অপূর্ব জানান, নারী ক্রেতাদের বিভিন্ন ডিজাইনে তিনি কাপড় তৈরি করতে হিমশিম খাচ্ছেন, সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন চাঁদ রাতের আগেই সবার কাপড় তৈরি করে ঈদের আনন্দ বাড়িয়ে দিতে।
জেলা শহরের সেবা ফ্যাশন, লস্কর গার্মেন্টস, ঢালী গার্মেন্টস, সাহা গার্মেন্টস, মদিনা গার্মেন্টস, লিলি গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন তৈরি পোশাকের বিপণিতে বেশ ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে পুরুষ ক্রেতার চেয়ে নারী ক্রেতার ভিড় বেশি দেখা যায়। তুলনামূলকভাবে একদরের দোকানের চেয়ে দরদাম করে পণ্য কিনে নেওয়া যায় এমন দোকানে ভিড় একটু বেশিই। পোশাকের পাশাপাশি জুতোর দোকান, জুয়েলারি ও কসমেটিকস শপগুলোতেও ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।
জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলা থেকে জেলা শহরের বড় বাজারে ঈদের কেনাকাটা করতে এসেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমাইয়া খানম। তিনি জানান, ঈদে বান্ধবীদের সাথে ঘুরে ঘুরে নিজের পছন্দের পোশাক কেনার মাঝে রয়েছে আলাদা আনন্দ, এবার সুতি কাপড়ের জামা, কসমেটিকস ও হাতব্যাগ কিনবেন তিনি।
পোশাক বিক্রেতারা মনে করছেন এবারের ঈদের বেচাকেনা বাড়বে আগামীকাল থেকে। এবারের ঈদের লম্বা সময়ের ছুটি পাবেন সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মজীবীরা। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে কাজের সুবাদে অনেকে জেলার বাহিরে থাকেন। ঈদের ছুটিতে তারা নিজ জেলায় এসে ঈদ করবেন এবং নিজেদের পরিবাররের সদস্যদের হাতে তুলে দিবেন ঈদ উপহার।
জেলা শহরের অন্যতম পোশাক বিক্রেতা ও লস্কর গার্মেন্টসের স্বত্বাধিকারী এবং গার্মেন্টস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দিদার লস্কর বাসসকে বলেন, "আলহামদুলিল্লাহ, এ বছর অন্যান্য বছরের তুলনায় বিক্রি বেশ ভালো। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আমাদের দম ফেলার সময় নেই। বিশেষ করে ২০ রমজানের পর থেকে ক্রেতার সংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে।"
তিনি আরও জানান, এবার বাজারে ভারতীয় ও পাকিস্তানি পোশাকের আধিপত্য কম। দেশীয় পোশাকের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ ও চাহিদা লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
জামাকাপড় কেনাকাটার পাশাপাশি ঈদের আগে অনেকে নিজের সৌন্দর্যবর্ধণে ভিড় জমাচ্ছেন লেডিস ও জেন্টস পার্লারগুলোতে। বিশেষ করে লেডিস পার্লারগুলোতে সেবাগ্রহীতাদের বেশ ভিড় জমেছে।
জেলা শহরের আরামবাগ এলাকায় ওমেন্স স্টাইল পার্লারের স্বত্বাধিকারী সৈয়দা নাজনীন সুলতানা সুইটি জানান, শুধুমাত্র জামা, কাপড় কিনলেইত হয়না, প্রয়োজন নিজেকে আরো সুন্দর করে উপস্থাপন করা। তাই অনেকে ঈদের আগে পূর্ব প্রস্তুতিমূলক সেবা নিচ্ছেন। আমার এখানে ৬জন নারীকর্মী সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন, চাঁদরাতে মেহেদী উৎসব থাকবে, সবমিলিয়ে কাজ উপভোগ করছি।
এদিকে, শহরের দর্জি পাড়ায় চলছে মহাব্যস্ততা। ছোট বাজার এলাকার টেইলার্সগুলোতে কারিগররা বিরামহীন কাজ করে যাচ্ছেন। পাঞ্জাবি তৈরির জনপ্রিয় কারিগর মিল্টন মিয়া বাসসকে বলেন, "চাহিদা এত বেশি যে ১০ রমজানের পর অর্ডার নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। প্রায় ৫০০ পাঞ্জাবির অর্ডার আছে। চাঁদ রাত এমনকি ঈদের দিন সকাল পর্যন্ত আমাদের দিনরাত এক করে কাজ করতে হবে।"
কেনাকাটার পাশাপাশি টুপি, আতর ও জায়নামাজের দোকানগুলোতেও ভিড় বাড়ছে। বাহারি রঙের টুপি ও সুগন্ধি আতর সংগ্রহ করছেন ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা। পাশাপাশি মুদি দোকানগুলোতেও ঈদের আগাম বাজার সেরে নিচ্ছেন অনেকে।
জেলা চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক দিদারুল আলম দিদার বাসসকে জানান, জেলায় এ বছর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বেশ ভালো, নিয়মিত জেলা প্রশাসন থেকে মনিটরিং করা হচ্ছে, কোথাও অনিয়ম পরিলক্ষিত এখন নাগাদ হয়নি, ক্রেতারা স্বাচ্ছন্দ্যে তাদের আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী কেনাকাটা করছে। ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে তাদের ব্যবসা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
জেলার ১০ টি উপজেলার পাশাপাশি পাশ্ববর্তী সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যনগর ও ধর্মপাশার ক্রেতারাও আসছেন নেত্রকোণা শহরে। সকালবেলার আন্তঃনগর হাওর এক্সপ্রেস ট্রেনে করে জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলা থেকে অনেকে আসছেন জেলা শহরে কেনাকাটা করতে।
সবার একটাই প্রত্যাশা পরিবার,স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের সাথে মিলেমিশে সবাই যেন ঈদের আনন্দ ভাগ করে একটি আনন্দমুখর উৎসব উপহার দেওয়া।