বাসস
  ১৫ মার্চ ২০২৬, ১৭:০১

চট্টগ্রামের রমজানের বাজারে কমেছে ‘উত্তাপ’, স্বস্তিতে ক্রেতারা

ছবি : বাসস

চট্টগ্রাম, ১৫ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : পবিত্র রমজান মাসকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের প্রধান পাইকারি বাজারগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যাপক আমদানি হওয়ায়, এই মাসে বেশিরভাগ পণ্যের দাম কমেছে ও বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। 

পণ্যের এই ব্যাপক আমদানির প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও। মুসলমানদের সিয়াম সাধণার রোজার মাসকে সামনে রেখে, এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীর অতি-মুনাফা করার অনৈতিক প্রবণতার বিপরীতে এবার অনেকটা উল্টো চিত্র দেখা গেছে। আর তাই এবারের রোজার বাজারের ‘উত্তাপ’ অনেকটাই কমে এসেছে বলে মনে করছে ক্রেতারা। 

কিছু পণ্যের দাম রোজা শুরুর সময়ের তুলনায় আরও নিম্নমুখী হয়েছে। এতে স্বস্তিতে রোজা পালন করতে পেরে, সাধারণ ভোক্তারা খুশি বলে জানিয়েছেন নগরীর চকবাজারে নিয়মিত বাজার করতে আসা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মজীবী কামাল উদ্দিন চৌধুরী।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে অর্থনৈতিক, তথা বাজার স্থিতিশীলতা যে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত তা দেখা গেছে জাতীয় নির্বাচনের ছয় দিন পর শুরু হওয়া রমজানের স্থিতিশীল ও সহনীয় বাজার ব্যবস্থায়। 

কামাল উদ্দিন চৌধুরী আরও বলেন, রোজার শুরুতে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যগুলোর দামে যে বাড়তি উত্তাপ ছিল, তা এখন অনেকটাই কমেছে। 

তিনি বলেন, লেবু, শসা ও বেগুনের মতো পণ্যের দাম কমার পাশাপাশি কিছু পণ্য রোজা শুরুর সময়ের তুলনায় আরও নিম্নমুখী হয়েছে। বিশেষ করে আলু ও পেঁয়াজের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

চকবাজারের ব্যবসায়ী আজমত আলী দ্রব্যমূল্যের দামের প্রসঙ্গে বলেন, রোজার আগে অনেক মানুষ একসঙ্গে দুই থেকে তিন সপ্তাহের বাজার করে রাখেন। ফলে সে সময় কিছু পণ্যের দাম বেড়েছিল। বর্তমানে সেই চাপ নেই। 

তিনি আরও বলেন, চাহিদা কমে যাওয়ার পাশাপাশি সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় আমদানি হওয়ায় বাজারে দামেও স্বস্তি ফিরেছে।

রেয়াজুদ্দিন বাজারে কথা হয় এনজিও কর্মকর্তা শহীদুল ইসলামের সাথে। 

তিনি বলেন, ‘রোজাকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা প্রতিবারই বাড়তি দাম রাখে বলে ধারণা ছিল। তবে বর্তমানে রোজার বাজারে সেই উত্তাপ এবার নেই।’

শহীদুল ইসলাম আরও বলেন, রোজার প্রথম ১০ দিনে সবজির দাম একটু বাড়তি ছিল। এরপর থেকে কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত কমে মিলছে চট্টগ্রাম নগরীর বাজারগুলোতে। তবে ব্রয়লার মুরগির দাম ১৮০ টাকা থেকে ক্রমান্বয়ে বেড়ে কেজি বিক্রি হচ্ছে ২২৫ টাকায়। 

এটা সাধারণ মানুষের জন্য অস্বস্তির বলে জানান তিনি।  

বহদ্দারহাটের মুরগির ব্যবসায়ী আবদুল আজিম বলছেন, রমজানে মুরগির চাহিদা বেশি, সরবরাহ অপর্যাপ্ত। এ কারণে বেড়েছে মুরগির দাম। সরবরাহ বাড়লে দাম কমবে। 

তিনি আরও বলেন, সোনালি মুরগি প্রতি কেজি আকারভেদে বিক্রি হচ্ছিল ৩০০ থেকে ৩১০ টাকায়। গত সপ্তাহে দাম ছিল ৩২০ টাকা। 

এ ছাড়া ব্রয়লার মুরগির ডিম প্রতি ডজন ১০০ থেকে ১০৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে জানান তিনি।
 
ক্রেতা নুর হোসেন বলেন, সিন্ডিকেট করে মুরগির দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। না হয় হঠাৎ এত দাম বাড়ার কারণ নেই। 

তিনি বলেন, ‘এক সপ্তাহের মধ্যে এতটা দাম বাড়বে ভাবিনি।’
 
রোববার (১৫ মার্চ) নগরীর বহদ্দারহাট, চকবাজার, ব্যাটারি গলি বাজার ও রেয়াজুদ্দিন বাজার ঘুরে দেখা যায় টমোটো প্রতি কেজি মানভেদে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, বেগুন ৪০ থেকে ৫০ টাকা, বাঁধাকপি প্রতিকেজি ১৫ থেকে ২০ টাকা, ফুলকপি ৪০ থেকে ৪৫ টাকা, মুলা ৩০ টাকা, শসা ৫০ টাকা, তিতা করলা ১০০ টাকা, ঢেড়শ ৮০ টাকা, বরবটি ৭০ টাকা, শিমের বিচি ৯০-১০০ টাকা, কচুর ছড়া ৮০-৯০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৩০ টাকা, পেঁপে ৩০ টাকা, মূলা ২৫-৩০ টাকা, শালগম ৩০ টাকা, চিচিঙা ৬০ টাকা, ধুন্দল ৭০ টাকা ও লাউ ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। 

রমজান মাসের শুরুতে এ সব সবজি ১৫ টাকা থেকে ২০ টাকা বেশি দরে বিক্রি হয়েছিল। 

ইফতারির অনুষজ্ঞ কাঁচামরিচ প্রতি কেজি ৮০ টাকা, খিরা ৬০ টাকা, গাজর ৪০ টাকা, ধনে পাতা ৪০ টাকা ও ছোট শসা ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। 

রোজার প্রথম সপ্তাহে কাঁচামরিচ ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, খিরা ১০০ টাকা ও ধনে পাতা ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছিল।
 
রেয়াজুদ্দিন বাজারের খুচরা সবজি বিক্রেতা মোহাম্মদ আলী আজগর বলেন, রোজা শুরুর দিকে ক্রেতাদের পণ্য বেশি কেনার চাপ থাকে, সে হিসাবে সরবরাহ কমে থাকে ও দামও বাড়তি পড়ে। এখন সরবরাহ ভালো থাকায় দাম কম আছে।

তিনি আরও বলেন, ‘এখন শীতকালীন সবজি বাজার থেকে চলে যাবার সময়, সেই কারণে কোনো কোনো সবজির দামও কম পড়ছে। এছাড়া নতুন আসা ঢেড়শ, বরবটি ও তিতা করলাসহ গ্রীষ্মকালীন সবজির দাম কিছুটা বাড়তি আছে।’

বহদ্দারহাট কাঁচা বাজারের মেসার্স খাজা মঈনুদ্দিনের ব্যবস্থাপক মো. আইয়ুব জানান, রমজানের শুরুতে ভালো মানের দেশি পেঁয়াজ ৫৫-৬০ টাকা বিক্রি হয়েছিল চট্টগ্রামের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের আড়তে। এখন সেই পেঁয়াজের দাম খুচরা বাজারে ২৫-৩০ টাকায় নেমে এসেছে। 

তিনি বলেন, ‘দেশে নতুন মৌসুমের পেঁয়াজের সরবরাহ বাড়ায় দরপতন হয়েছে। হাসি ফুটেছে ভোক্তাদের মুখে।’

সরেজমিন দেখা গেছে, খাতুনগঞ্জের আড়ত পেঁয়াজে সয়লাব। প্রতিটি আড়তে শত শত বস্তা দেশি পেঁয়াজ। ট্রাক, মিনিট্রাক, সিএনজি অটোরিকশা, রিকশা এমনকি নৌপথে পেঁয়াজ চলে যাচ্ছে শহরের বিভিন্ন খুচরা বিক্রেতার কাছে, বাজারে ও বিভিন্ন উপজেলায়। 

খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ মার্কেটের একে ট্রেডার্সের মো. বেলাল বলেন, আজ মেহেরপুরি পেঁয়াজ ১৬-১৭ টাকা, পাবনার মুড়িকাটা ২০-২৫ টাকা, রাজবাড়ীর হালি পেঁয়াজ ৩০-৩৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে। দেশি নতুন রসুন পাইকারিতে কেজি ৫০-৫২ টাকা বিক্রি হচ্ছে। 

তিনি আরও বলেন, আশানুরূপ বিক্রি নেই। মুড়িকাটা নিয়ে বেকায়দায় চাষি, বেপারী ও পাইকাররা। চাষীর কাছ থেকে কিনে আনছেন যারা, তারাও লোকসানে। 

তবে এতে ভোক্তারা সুবিধা পাচ্ছেন বলে জানান তিনি।

বাজারে সপ্তাহের ব্যবধানে মাছের দাম কিছুটা কমেছে। রুই মাছ দেশি রুই (জ্যান্ত) দেড় থেকে দুই কেজি ৪০০-৪২০ টাকা, আমদানিকৃত রুই মাছ দুই থেকে তিন কেজি ৩০০-৩২০ টাকা, ছোট সাইজের রুই ২০০-২৫০ টাকা, এক থেকে দুই কেজি ওজনের কাতলা মাছ বিক্রি হয়েছে কেজি ৩২০-৪০০ টাকা, তিন থেকে চার কেজি ওজনের ব্রিগেট কার্প কেজি ২৪০-২৯০ টাকা, তেলাপিয়া ১৫০-১৭০ টাকা, দেশি বাইলা কেজি ৫২০-৬০০ টাকা, শিং মাছ সাইজ অনুসারে ৪০০-৫৫০ টাকা, মলা মাছ ৫০০-৬০০ টাকা, শোল মাছ বিক্রি হচ্ছে ৬২০-৭০০ টাকা, পোয়া ৩৫০ টাকা, চিংড়ি মাছ ৬০০-৮০০ টাকা, সুরমা মাছ দেড় থেকে দুই কেজি ওজনের ৬৫০ টাকা, কোরাল ৫৫০-৬০০ টাকা, কালিচান্দা মাছ (কেজিতে ২-৪টি সাইজের) ৩৫০-৪৫০ টাকা ও ইলিশ মাছ বিক্রি হচ্ছে ২৮০০-৩৬০০ টাকায়।

দাম বেড়েছে দেশি মসুর ডালের, সরু মসুর ডাল ১৩০-১৭০, নেপালি মসুর ১৪০, ছোট মুগডাল ১৩০-১৪০, খেসারির ডাল ১০০, বুটের ডাল ১১০, মাষকলাই ১৮০, ডাবলি ৬০ ও ছোলা ১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।