শিরোনাম

//মো. তানভীর হায়াত খান//
নেত্রকোণা, ৩ মার্চ ২০২৬ (বাসস): ফুটবল মাঠের গোলপোস্ট আগলে রাখা মানে কেবল প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকানো নয়, কখনও কখনও জীবনের চরম প্রতিকূলতা আর অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণাকে রুখে দেওয়া।
নেত্রকোণার সদর উপজেলার নাগড়া পৌর এলাকার মেয়ে সেজ্যোতি ইসলাম স্মৃতির জীবনের গল্পটি ঠিক তেমনই এক হার না মানা উপাখ্যান। বারবার ভয়াবহ ইনজুরি যার পথ আগলে দাঁড়িয়েছে, সমাজ আর পারিপার্শ্বিকতার বিষাক্ত অবজ্ঞা যাকে বিদ্ধ করেছে, সেই সেজ্যোতিই আজ ফুটবলের সবুজ গালিচায় এক বিজয়ী বীরের নাম।
সদর উপজেলার নাগড়া পৌর এলাকার মৃত ইসলাম উদ্দিন ও সুফিয়া বেগমের মেয়ে সেজ্যোতির বাবা ছিলেন অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা। রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে হয়েও ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন বুনেছিলেন মেজ বোন সেলিনা আক্তার ইতির অনুপ্রেরণায়। নেত্রকোণা আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে শুরু হওয়া সেই যাত্রা ক্রিকেট, হ্যান্ডবল, ভলিবল, কাবাডি ও অ্যাথলেটিক্সের সব ইভেন্ট হয়ে অবশেষে থিতু হয় ফুটবলের গোলপোস্টের নিচে। গোলকিপার হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার গড়ার লড়াইটা শুরু করেছিলেন তিন মাসের কঠোর প্রশিক্ষণে, যেখানে জেলা স্টেডিয়ামে ছেলেদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গোলকিপিং কোচ ও সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষক খুদিরাম দাসের অধীনে কঠোর তালিম নিয়েছিলেন তিনি।
সেজ্যোতির ক্যারিয়ারের বড় টার্নিং পয়েন্ট ছিল টাঙ্গাইল জেলা দলের হয়ে অনূর্ধ্ব-১৪ জেএফ কাপে খেলার সুযোগ পাওয়া। রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত সেই টুর্নামেন্টে মূল গোলকিপার ইনজুরিতে পড়লে কোচ বাপন স্যারের আস্থায় হুট করেই মাঠে নামতে হয় তাকে। জীবনের প্রথম বড় টুর্নামেন্টে নেমেই অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন তিনি। কলসিন্দুরের শক্তিশালী দলের বিপক্ষে সেই ম্যাচে রানার্সআপ হলেও জাতীয় দলের কোচ গোলাম রব্বানী ছোটনের নজর কাড়েন এবং ২০১৬ সালে অনূর্ধ্ব-১৬ জাতীয় দলের প্রাথমিক ক্যাম্পে ডাক পানসেজ্যোতি।
কিন্তু ২০১৬ সালে সেজ্যোতির ক্যারিয়ার যখন আকাশ ছোঁয়ার অপেক্ষায়, তখনই তার জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। টাঙ্গাইলে আন্তঃস্কুল প্রতিযোগিতায় ম্যাচ চলাকালীন প্রতিপক্ষ পূর্বধলা স্কুলের স্ট্রাইকারের বুটের সরাসরি আঘাতে ভেঙে চুরমার হয়ে যায় তার ডান পায়ের দুটি হাড়।
থাই পর্যন্ত ভারী প্লাস্টার নিয়ে টানা ছয় মাস বিছানায় নিথর পড়ে থাকতে হয়েছিল তাকে। চিকিৎসক বলেছিলেন দুই বছর পূর্ণ বিশ্রাম ছাড়া হাঁটা অসম্ভব, আর প্রতিবেশীদের অনেকেই বলেছিল—একটি পা ছোট হয়ে যাবে, মেয়েটি সারাজীবন খুঁড়িয়ে হাঁটবে। এমনকি নিষ্ঠুর সমাজ তাকে 'লুলা' বলে সম্বোধন করে মানসিকভাবে পিষে ফেলার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সেজ্যোতির মনে ছিল অন্য জেদ আর আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন। বিছানায় শুয়ে অসহ্য যন্ত্রণার মাঝেও সেজ্যোতিকে আগলে রেখেছিলেন তার দুই ছোট ভাই হৃদয় ও সাগর এবং বাবা। ধান কাটার মৌসুমে মা গ্রামের বাড়িতে থাকায় সেই ছয় মাস দুই ভাই মিলে রান্নাবান্না থেকে শুরু করে সেজ্যোতির গোসল করানো, মাথার পানি ঢালা ও পিরিয়ডকালীন সব প্রয়োজনে নার্সের মতো সেবা দিয়েছেন। প্লাস্টারের প্রচণ্ড তাপে শরীর যখন ধোঁয়ার মতো জ্বলত, তখন ভাইয়েরা রাত জেগে মাথায় পানি ঢেলে বোনকে শান্ত রাখতেন। সেই ভালোবাসা আর নিজের অলৌকিক মানসিক শক্তি তাকে মাত্র এক বছরের মাথায় আবার মাঠে ফিরিয়ে আনে।
তবে ভাগ্য যেন বারবার সেজ্যোতির পরীক্ষা নিচ্ছিল। ইনজুরি ছায়ার মতো তার পিছু ছাড়ছিলই না। ঢাকার মহিলা ফুটবল লিগ খেলতে গিয়ে গোলপোস্ট রক্ষা করতে গিয়ে প্রতিপক্ষ স্ট্রাইকারের বুটের সরাসরি আঘাতে তার সামনের মাড়ির দাঁত ভেঙে যায় এবং চোখের মনিতে মারাত্মক রক্ত জমাট বেঁধে যায়।
সরেজমিনে সেজ্যোতির সঙ্গে কথা হলে সেই দুঃসহ দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, "সেই সময় আমি ভালো করে তাকাতে পারতাম না, চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ত। সবাই বলত খেলা ছেড়ে দিতে, ইনজুরি যেন আমার পিছুই ছাড়ছিল না। তবুও আমি হার মানিনি।" ফুটবলের প্রতি এই অমোঘ ভালোবাসার কারণে বোরকা পরে হিজাব প্যাঁচিয়ে লুকিয়ে মাঠে গিয়ে প্র্যাকটিস চালিয়ে গেছেন তিনি।
জাতীয় দলের বিভিন্ন ক্যাম্পে ডাক পেলেও বারবার রহস্যময় কারণে চূড়ান্ত স্কোয়াড থেকে বাদ পড়া ছিল তার চিরসঙ্গী। চোখের জল মুছে ক্যাম্প ছেড়ে বাসায় চলে যাওয়ার উপক্রম হলেও জ্যেষ্ঠ খেলোয়াড় সাবিনা খাতুন ও সুমাইয়া আপুর অকুতোভয় সমর্থনে দ্বিতীয়বার এমআরআই করিয়ে নিজেকে শতভাগ ফিট প্রমাণ করেন তিনি। এই সব বাধা ও চোখের জল মাড়িয়ে অবশেষে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়ে লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে দেশে ফেরেন তিনি। তার এই সাফল্যে আজ নেত্রকোণাবাসী গর্বিত।
আজ তার বাবা বেঁচে থাকলে হয়তো মেয়ের এই সাফল্যে উদযাপন করতেন।
বর্তমানে সেজ্যোতি ইসলাম স্মৃতি সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ও সমাজকর্ম বিভাগে অনার্স ৫ম সেমিস্টারে অধ্যয়নরত আছেন। ফুটবলের পাশাপাশি তিনি উশু, বক্সিং এবং রাগবিতেও জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য দেখিয়েছেন।
বাংলাদেশ আনসারের হয়ে বক্সিং ও উশুতে জাতীয় পর্যায়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করে তিনি বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। বসুন্ধরা কিংসে ট্রায়াল দিয়ে টিকে গেলেও কেবল একাডেমিক পরীক্ষার জন্য খেলা হয়নি তার। জীবনের প্রতিটি ধাপে পরীক্ষা আর খেলার মধ্যে যুদ্ধের সম্মুখীন হওয়া এই নারী ফুটবলারের বর্তমান লক্ষ্য জাতীয় দলের গোলপোস্ট দীর্ঘমেয়াদে রক্ষা করা। একইসাথে যে কোনো একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীতে (আর্মি/পুলিশ/আনসার) সম্মানজনক চাকরি লাভ করে নিজের পরিবারের হাল ধরা এবং দেশসেবা করা।
সেজ্যোতির এই দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী লড়াই আজ দেশের তৃণমূলের হাজারো নারী ফুটবলারের জন্য এক জ্বলন্ত অনুপ্রেরণা ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক।