বাসস
  ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:২৫
আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৪৬

কক্সবাজারে গ্যাস পাম্পে বিস্ফোরণ; দগ্ধ ১৬ জন

ছবি: বাসস

কক্সবাজার,২৭ ফেব্রুয়ারি,২০২৬ (বাসস): পর্যটন শহর কক্সবাজারের কলাতলী এলাকার একটি এলপিজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) পাম্পে গতকাল বৃহস্পতিবার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ওই পাম্পটির নাম ‘কক্সবাজার এলপিজি স্টেশন’।

গত বুধবার উদ্বোধন করা হয় পাম্পটি। উদ্বোধনের পরদিন বৃহস্পতিবার রাতে পাইপ লাইন ফুটো হয়ে সেখানে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার তদন্তে  ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শহরের কলাতলীর হোটেল মোটেল জোনের পূর্ব দিকে বাইপাস সড়কের আদর্শগ্রামে (চন্দ্রিমা হাউজিংয়ে প্রবেশের মুখে) নির্মিত হয় গ্যাস পাম্পটি। বুধবার সন্ধ্যায় পাম্পের ট্যাংক থেকে ফুটো হয়ে গ্যাস নির্গত হয়ে আগুন ধরে যায়। পাম্পের কর্মচারীরা বালু ও পানি ছিটিয়ে তা নেভানোর চেষ্টা করে। পরে রাত সাড়ে ১০টায় বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে এবং আবার আগুন ধরে যায়। সেই আগুন চারদিকে ছড়াতে থাকে। আগুন দ্রুত ঘরবাড়ি, গাড়ি মেরামতের গ্যারেজ ও পার্কিংয়ে ছড়িয়ে পড়ে। এসময় আগুনে দগ্ধ হন অন্তত ১৬ জন। এর মধ্যে ৬ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট এবং ৩ জনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

গ্যারেজের কর্মচারী নুরুল আলম বলেন, পাম্প থেকে ছড়িয়ে পড়া আগুনে একে একে ৩০টির বেশি প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও পর্যটক বহনের খোলা জিপ পুড়ে গেছে। গাড়িগুলো গ্যারেজে মেরামতের জন্য রাখা হয়েছিল।

একটি জিপ গাড়ির মালিক শামসুদ্দীন বলেন, ৮ লাখ টাকা খরচ করে তিনি পর্যটক পরিবহনের জন্য জিপ গাড়িটি তৈরি করে পার্কিংয়ে রাখেন। আগামী ঈদুল ফিতরের ছুটিতে এই গাড়ি চালানোর কথা ছিল। কিন্তু মধ্যরাতের আগুনে তার জিপসহ অন্তত ২৪টি জিপ গাড়ি পুড়ে ছাই হলো। লোকালয় এবং আবাসিক এলাকা থেকে গ্যাস পাম্প সরানো উচিত। গ্যাস পাম্প সরানোর দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন।

‘কক্সবাজার এলপিজি স্টেশন’ নামে গ্যাস পাম্পটির মালিক এন আলম দাবি করেছেন, পাম্পের ছাড়পত্র আছে। তদন্ত কমিটির কাছে কাগজপত্র যথাসময়ে উপস্থাপন করবেন তিনি। ব্যবসা-বাণিজ্য থাকলে দুর্ঘটনা ঘটবে উল্লেখ করে এন আলম আরও বলেন, আগুনে যারা দগ্ধ বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের পাশে আছেন তিনি।

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে যান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাইদুর রহমান খান। পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের জানান, এলপিজি ফিলিং স্টেশন থেকে গ্যাস লিকেজের কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়। জেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বিত প্রচেষ্টায় রাত ২টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। সময়োপযোগী ও সমুচিত পদক্ষেপ নেয়ায় বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো গেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সচিব জানান, ঘটনার তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম)-এর নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ৫ দিনের মধ্যে কমিটি দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে বিস্তারিত প্রতিবেদন দেবেন। প্রতিবেদন পাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে আহবায়ক করে গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরা হলেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, উপ-পরিচালক পরিবেশ অধিদপ্তর, উপ-পরিচালক ফায়ার সার্ভিস ও সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক।

তিনি আরও বলেন, এলপিজি ফিলিং স্টেশনের মালিকপক্ষের বৈধ কাগজপত্র ও লাইসেন্স ছিল কি-না, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, গ্যাস পাম্পটি নির্মাণের ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি নেয়া হয়নি। পাম্প মালিক এন আলমের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। 

তিনি বলেন, গ্যাসের ফুটো থেকে বিস্ফোরণ ও আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল। মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার পাশাপাশি গ্যাস ফুটো বন্ধে ফায়ার সার্ভিসের সাতটি ইউনিট কাজ করেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের পরিদর্শক মো. মুসাইব ইবনে রহমান বলেন, এ গ্যাস পাম্প নির্মাণের বিপরীতে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেয়া হয়নি। তবে একই মালিকের অন্য জায়গায় একটি পাম্প নির্মাণের জন্য অনুমোদন নিয়েছিল পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে।

বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে গুরুতর দগ্ধ ৬ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাদের সবার অবস্থাই আশঙ্কাজনক। এরমধ্যে বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনজনকে হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে। গত বুধবার রাতে বিস্ফোরণের পর আগুন ছড়িয়ে পড়লে অন্তত ১৫ জন দগ্ধ হন। তাদের মধ্যে গুরুতর আহত ৬ জনকে রাতেই উন্নত চিকিৎসার জন্য চমেক হাসপাতালে নেয়া হয়।

দগ্ধ ৬ জন হলেন: আবদুর রহিম (৩২), সিরাজ (৩০), আবু তাহের (৪০), আবুল কাওসার (২৭), সাকিব (৩০) ও মোতাহের (৪৫)।

চমেক বার্ন ইউনিটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রফিক উদ্দিন আহমদ বাসস’কে বলেছেন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ব্যক্তিদের শরীরের ২০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত পুড়ে গেছে। শ্বাসতন্ত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাদের অবস্থা সংকটাপন্ন। 

আহতদের মধ্যে আবু তাহেরের শরীরের প্রায় ৯০ শতাংশ, আবদুর রহিমের ৫০ শতাংশ, সিরাজের ৪০ শতাংশ, সাকিবের ৩০ শতাংশ এবং আবুল কাওসার ও মোতাহেরের শরীরের প্রায় ২০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।

বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মো. রাশেদ উল করিম বলেছেন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দগ্ধ ৬ জন পুরুষ রোগীর প্রত্যেকেরই শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরমধ্যে আশঙ্কাজনক তিন রোগীকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে। এরা হলেন: আবু তাহের, আবদুর রহিম ও সিরাজ। বাকি রোগীদের অবস্থা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রেখেছি আমরা। প্রয়োজন অনুযায়ী তাদেরও আইসিইউ সাপোর্টের আওতায় নেওয়া হবে। জাতীয় গাইডলাইন অনুসরণ করেই সবার চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী গ্যাস পাম্প এলাকা পরিদর্শন করেছেন পরিবেশ কর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধিসহ শ্রেইি-পেশার মানুষ। তাদের দাবি ব্যস্ততম একটি সড়কের পাশে জনবহুল এলাকা থেকে ওই গ্যাস পাম্পটি উচ্ছেদ করতে হবে।

কক্সবাজার পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও কলাতলীর বাসিন্দা জিসান উদ্দিন বলেন, এমন জনবহুল এলাকায় গ্যাস পাম্প নির্মাণ ঝুঁকিপূর্ণ। যেহেতু আগুনে দগ্ধ লোকজনের চিকিৎসার ব্যবস্থাও নেই কক্সবাজারে। দগ্ধ লোকজনকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চট্টগ্রাম কিংবা ঢাকার বার্ন ইউনিটে পাঠাতে হয়। তাতে পথেই অনেকের মৃত্যু ঘটে।

কক্সবাজার শহর জামায়াতের সেক্রেটারি রিয়াজ মুহাম্মদ শাকিল বলেন, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে এরকম জনবহুল এলাকায় গ্যাস পাম্প স্থাপন কোনভাবেই কাম্য নয়।

দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু-ঈদগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল। তাঁর কাছেও স্থানীয় লোকজন পাম্পের গ্যাস বিক্রি বন্ধ ও তা অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান।