বাসস
  ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১:০৩

রাজশাহীতে আমের বাগান কমেছে, নওগাঁয় বেড়েছে

ছবি : বাসস

মো. আয়নাল হক

রাজশাহী, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : রাজশাহী অঞ্চলের সারি সারি আমবাগান মুকুলে ভরে উঠেছে। বসন্তের ফাল্গুন মাসে গাছগুলো হলুদ ও সবুজের মিশ্র রঙে সেজেছে। প্রতিটি আম গাছ মুকুলে ভরপুর, যার মিষ্টি সুবাস চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে।

মৌসুমের শুরুতেই ব্যাপক মুকুল আসায় কৃষকের মনোবল বেড়ে গেছে এবং তারা এবার বাম্পার ফলনের আশা করছেন। তবে, এ বছর রাজশাহী জেলায় আমবাগানের পরিমাণ কমেছে, অন্যদিকে নওগাঁয় তা বেড়েছে।

রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় সব আমগাছেই এ মৌসুমে বিভিন্ন মাত্রায় মুকুল এসেছে। আগাম জাতের আম গাছে ইতোমধ্যে ছোট সবুজ ফলের কুঁড়ি দেখা যাচ্ছে।

এখন পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূল রয়েছে এবং কোনো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ না থাকায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বাম্পার ফলনের আশা করছে।

গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় সব গাছে মুকুল বেশি এসেছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা প্রবল।

গত বছর উৎপাদন ভালো হলেও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে বিপুল পরিমাণ আম নষ্ট হয়েছিল। ফলে দাম কমে যায় এবং কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী অঞ্চল চারটি জেলা নিয়ে গঠিত— রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

এ চার জেলায় মোট ৯২ হাজার ৫৫২ হেক্টর জমিতে আমবাগান রয়েছে, যেখানে ৩ কোটি ৪৯ লাখ ৬০ হাজার ৫৫৪টি আম গাছ আছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৩ শতাংশ গাছে ইতোমধ্যে মুকুল এসেছে। কৃষি কর্মকর্তারা ও কৃষকরা আশা করছেন, ধাপে ধাপে সব গাছেই মুকুল আসবে।

রাজশাহী জেলায় আমবাগানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর, যা গত বছরের ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টরের তুলনায় ৫৪১ হেক্টর কম। জেলায় মোট ৩৬ লাখ ৯৫ হাজার ২৭৭টি আম গাছ রয়েছে, যার মধ্যে ৬০ শতাংশ গাছে মুকুল এসেছে।

নওগাঁ জেলায় এ বছর আমবাগানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৫০০ হেক্টর, যা গত বছরের ৩০ হাজার ৩০০ হেক্টরের তুলনায় বেশি। জেলায় মোট ২ কোটি ৫ লাখ ৩৪ হাজার ৩২৫টি আমগাছ রয়েছে, যার মধ্যে ৭১ শতাংশ গাছে মুকুল এসেছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমবাগানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর, যা গত বছরের ৩৭ হাজার ৫০৪ হেক্টরের তুলনায় ১৭ হেক্টর কম। জেলায় মোট ৯২ রাখ ৪৪ হাজার ৭৬৫টি আম গাছ রয়েছে, যার মধ্যে ৭০ শতাংশ গাছে মুকুল এসেছে।

নাটোরে আমবাগানের পরিমাণ ৫ হাজার ৬৯ হেক্টর, যেখানে ১৪ লাখ ৮৬ হাজার ১৮৭টি গাছ রয়েছে। এর মধ্যে ৫৩ শতাংশ আম গাছে মুকুল এসেছে।

কৃষি কর্মকর্তারা জানান, অনেক গাছে এখনো মুকুল আসেনি এবং আগাম মুকুল আসা গাছগুলো সাধারণত মৌসুমের শুরুতেই আম দেয়।

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আম চাষি শফিকুল ইসলাম বলেন, এ বছর গত বছরের তুলনায় গাছে বেশি মুকুল এসেছে।

তিনি বলেন, যদি বড় কোনো ঝড় না হয়, আমরা প্রচুর ফলনের আশা করছি। আবহাওয়া ভালো থাকলে ফলন চমৎকার হবে। তবে এখনই নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে না। আমরা নিয়মিত কীটনাশক প্রয়োগ করছি এবং বাগান পরিচর্যা করছি।

পুঠিয়ার আমচাষি মোহাম্মদ আলী বলেন, মৌসুমের শুরু থেকেই আবহাওয়া মুকুল আসার জন্য অনুকূল রয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা দিনের প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা সূর্যের আলো থেকে পাচ্ছি। অনেক গাছে ইতোমধ্যে মুকুল এসেছে। যদি এ আবহাওয়া আরো ১০ দিন থাকে, আরো বেশি গাছে মুকুল আসবে।

রাজশাহীর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান বলেন, আমরা এ বছর চমৎকার ফলনের আশা করছি।

তিনি বলেন, আমরা কৃষকদের আম রপ্তানির সুযোগ নিশ্চিত করতেও কাজ করছি। প্রতিটি উপজেলায় এ কাজে কৃষি কর্মকর্তা নিয়োজিত রয়েছেন। আমরা এ মৌসুমে প্রচুর আম বিক্রির আশা করছি।

রাজশাহীর ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, এ বছর শীতকাল নির্বিঘ্নে শেষ হয়েছে, কোনো  কুয়াশা বা বৃষ্টিপাত হয়নি।

তিনি বলেন, তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বেড়েছে, হঠাৎ ওঠানামা হয়নি। এর ফলে গাছগুলো মুকুল আসার প্রক্রিয়া বজায় রাখতে পেরেছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী জুলফিকার আলী বলেন,  লাভ কমে যাওয়ায় কৃষকরা  আমগাছ কেটে ফেলছেন।

তিনি বলেন, উৎপাদন কমেছে এবং কৃষকরা ন্যায্য বাজারমূল্য পাচ্ছেন না। একসময় আম উৎপাদনে রাজশাহী এগিয়ে ছিল, কিন্তু এখন নওগাঁ সেই অবস্থান নিয়েছে। সাতক্ষীরা ও বান্দরবানের কিছু এলাকাতেও আম চাষ বেড়েছে।

তিনি আরো বলেন, রাজশাহী আগে ধান চাষে বেশি গুরুত্ব দিত এবং বেশি লাভের আশায় কৃষকরা আম চাষে ঝুঁকেছিলেন। এখন ধানের দাম ও চাহিদা বেশি। ফলে কিছু কৃষক আবার ধান চাষে ফেরার কথা ভাবছেন।

কাজী জুলফিকার আলী আরো উল্লেখ করেন, রাজশাহীর অধিকাংশ আমের জাত দেরিতে ফলন দেয়, অন্যদিকে সাতক্ষীরার আম বাজারে আগে আসে এবং ভালো দাম পায়। রাজশাহী, নওগাঁ ও রংপুর অঞ্চলের আমগুলো মূলত দেরিতে ফলন দেওয়া জাত। এ সময় বাজারে আমের দাম পড়ে যায়।

তিনি বলেন, আম পচনশীল ফল। কৃষকরা আলু বা অন্যান্য ফসলের মতো সংরক্ষণ করতে পারেন না। যথাযথ সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় কম দামে আম বিক্রি করতে হয়, যা তাদেরকে পরের বছর আম চাষ অব্যাহত রাখতে নিরুৎসাহিত করে।