বাসস
  ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৩৫
আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩:০৪

সুনামগঞ্জের ভাষা সৈনিক আব্দুর রহিম ছিলেন নিভৃতচারী

সুনামগঞ্জের ভাষা সৈনিক আব্দুর রহিম। ফাইল ছবি

\ মুহাম্মদ আমিনুল হক \

সুনামগঞ্জ, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : সুনামগঞ্জের ভাষা সৈনিক আব্দুর রহিম ছিলেন নিভৃতচারী। তিনি নিরিবিলি থাকতে পছন্দ করতেন। সর্বদা তিনি বই পড়া এবং লেখালেখিতে নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন। প্রমিত বাংলা শুদ্বাচারে তিনি গবেষণা করতেন। তিনি ছিলেন একজন সমাজ সচেতন ব্যক্তি। ভাষা সৈনিক আব্দুর রহিম ছিলেন নানা গুণে গুণান্বিত।

ভাষা সৈনিক আব্দুর রহিম ১৯৫২ সালে মাতৃভাষা আন্দোলনে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। শিক্ষাবিদ ও লেখক মু. আব্দুর রহিম সুনামগঞ্জের ভাষা সৈনিক হিসেবে পরিচিত।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন শুরু হলে তিনি বাংলাভাষার দাবিতে ঢাকাই কারবালা শিরোনামে একটি দীর্ঘ কবিগান রচনা করেন। এটি তখন ভাষার দাবিতে প্রকাশিত বিভিন্ন সংকলনে প্রকাশিত হয়। যা ছাত্রদের মধ্যে বিরাট প্রভাব বিস্তার করে। ১৯৫৯ সনে তার বাংলা ভাষা ও বাংলা শিক্ষকের মর্যাদা নামে প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ১৯৭০ সালে ভাষা আন্দোলনের ওপর তিনি উন্মোচন নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ১৯৫৯ সনে তার কাব্যগ্রন্থ ‘চোখের জলে হাসি’ প্রকাশিত হয়। পরে এই গ্রন্থটি আরো দুইবার মুদ্রণ হয়। ১৯৯৯ সালে কুরআনের কাব্যানুবাদ প্রকাশ করেন।
মু. আব্দুর রহিম সুনামগঞ্জে তিন প্রজন্মের শিক্ষক ছিলেন। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের আলমপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯২৮ সনে জন্মগ্রহণ করেন মু. আব্দুর রহিম। তার পিতা: হাজী ইব্রাহিম আলী মুনশী, মাতা: মালিকা বানু।

ভাষা সৈনিক আব্দুর রহিমের প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি গ্রামের পাঠশালায়। এই পাঠশালা থেকেই প্রথম বৃত্তিপ্রাপ্ত ছাত্র হন তিনি। পরে সুনামগঞ্জ এমই (মিডল ইংলিশ) মাদরাসায় ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে সুরমা উপত্যকা (অবিভক্ত ভারতের আসাম-সিলেট) আসাম সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত বৃত্তি পরীক্ষায় দ্বিতীয় হন। ১৯৪৩ সনে সরকারি জুবিলি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৪৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯৪৯ সনে আইএ এবং ১৯৫১ সনে বিএ পাস করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। তিনি ১৯৫২ সালে সাউথ সুরমা হাইস্কুলে যোগদান করেন। পরে তিনি সিলেটের রাজা জিসি স্কুলে শিক্ষকতায় যোগদান করেন। কিছুদিন ডাক বিভাগেও চাকরি করেছেন।

১৯৫২ সনে ডাকবিভাগ ছেড়ে তিনি শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবর চিঠি লিখে আবারও শিক্ষা বিভাগে যোগদান করেন। 

১৯৫৩ সনে সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলি উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। এই বিদ্যালয়ে বাংলার শিক্ষক ছিলেন। 

১৯৫৩ সন থেকে বিদ্যালয়ের সবগুলো বার্ষিকী সম্পাদনায় যুক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৮৫ সনে অবসর নেওয়ার আগ পর্যন্ত সরকারি জুবিলি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। অবসর নেওয়ার পর সুনামগঞ্জ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে সাড়ে তিন বছর শিক্ষকতা করেন। ২০০০ সালে চাইল্ড কেয়ার একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হলে তাকে প্রিন্সিপালের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এখানে কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ দেড় দশক তিনি পূর্ণ অবসরে ছিলেন। এ সময় বিভিন্ন পত্রিকা ও সাময়িকীতে নিয়মিত লেখালেখি করতেন।

শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ, সম্পাদনা ও গবেষণা কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সময় নবদিগন্ত নামে ম্যগাজিন সম্পাদনা করেন। ২০০৭ সালে আলোকিত ব্যক্তিত্ব মুনাওয়ার আলীর জীবনী প্রকাশে যুক্ত ছিলেন তিনি।

৯২ বছর বয়সে সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘরস্থ বাসভবনে ইহকাল ত্যাগ করেন তিনি। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি চার ছেলে ও তিন মেয়ের জনক। তার গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার আলমপুর গ্রামে। তাকে শহরের পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।