শিরোনাম

রোস্তম আলী মন্ডল
দিনাজপুর, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (বাসস) : পৌরাণিক কাহিনী আর নানা জনশ্রুতি নিয়ে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলার ঐতিহাসিক নিদর্শন সুরা মসজিদ। তবে দর্শনার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় এই মসজিদটির দ্রুত ও উপযুক্ত সংস্কার প্রয়োজন।
মন্ত্রী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা ও মুসল্লিরা মনে করেন, প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর ঐতিহাসিক এই মসজিদটির দ্রুত ও উপযুক্ত সংস্কার প্রয়োজন। তারা মসজিদটির সংস্কারের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন এমপি নির্বাচন পূর্ববর্তী প্রচারণার সময় এই মসজিদটি পরিদর্শন করেন। সেসময় তিনি এই মসজিদের অবকাঠামো উন্নয়নসহ ঐতিহাসিক নিদর্শনটি মনোরম পরিবেশ আকারে সংস্কার করার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, সরকারের কাছে আমাদের আবেদন এই ঐতিহাসিক মসজিদটির মূল অবকাঠামো ঠিক রেখে যুগ উপযোগী সংস্কার করা হোক। এতে ঐতিহাসিক নিদর্শনটি রক্ষা পাবে। মসজিদ সংরক্ষণের জন্য মসজিদ এলাকায় একটি বাউন্ডারি ওয়াল ও বড় গেট করে এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও আহ্বান জানান তিনি। এছাড়াও পবিত্র রমজান মাসে এই মসজিদের মুসল্লিদের জন্য ইফতার ও তারাবির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
৫০০ বছরের প্রাচীন স্থাপত্যের সাক্ষী এই সুরা মসজিদ। দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলা পরিষদ থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে ঘোড়াঘাট-হিলি স্থলবন্দরে পাকা রাস্তার পাশে চোরগাছা মৌজায় অবস্থিত। দৃষ্টিনন্দন এ মসজিদের নির্মাণ কারুকার্য এক নজর দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন ছুটি আসেন পর্যটকরা।
সুরা মসজিদের নির্মাণ নিয়ে বহু জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। অনেকেই এই মসজিদকে সৌর মসজিদ বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। আবার কেউ বলে সূর মসজিদ। আবার অনেকের কাছে সম্রাট শাহ সুজা মসজিদ নামেও পরিচিত।
স্থানীয়দের মতে ‘সূর’ শব্দের অর্থ ‘অপদেবতা’ বা ‘জিন’। জনশ্রুতি রয়েছে, শত শত বছর আগে জিনেরা এক রাতে মসজিদটি নির্মাণ করেন। আজও অনেকেই এই জনশ্রুতিতে বিশ্বাস করেন।
মসজিদটির কারুকার্য ও নির্মাণশৈলী দেখে কেউ কেউ ধারণা করেন ১৬ শতকের সুলতানি আমলে হোসেন শাহীর শাসন আমলে এটি নির্মাণ করা হয়। এই মসজিদকে আসমানি বা গায়েবি অর্থাৎ লোক চক্ষুর আড়ালে তৈরি হওয়া মসজিদ বলেও দাবি করা হয়।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, মোগল সম্রাটের আমলে বাংলার সুবেদার শাহ সুজা এই মসজিদ নির্মাণ করেন। তাই তারা একে শাহ সুজা মসজিদ নামে ডাকেন।
তবে এর নির্মাণ ও গঠনশৈলী দেখে ধারণা করা হয়, শাহ সুজার ক্ষমতা গ্রহণের অনেক আগেই এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে। যেহেতু এই মসজিদটিতে কোনো শিলালিপি নেই, তাই গঠনশৈলীর উপর ভিত্তি করে সম্ভাব্য নির্মাণকাল বের করা হয়েছে। স্থাপত্যশৈলী ও নির্মাণ কালের কলা কৌশল পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ধারণা করা হয়।
বড় মসজিদটির বাইরের দিকের আয়তন উত্তর-দক্ষিণে ৪০ ফুট এবং পূর্ব-পশ্চিমে ২৬ ফুট। ৪ ফুট উঁচু মজবুত প্লাটফর্মের উপর মসজিদের অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে।
এর প্রধান কক্ষের আয়তন ভেতরে ১৬ দশমিক ১৬ ফুট। প্রধান কক্ষের সাথে যুক্ত আছে ৬ ফুট প্রশস্ত রাস্তা। পুরো মসজিদের দেয়ালে অসংখ্য খোপ কাটা মৌলক টেরাকোটার অলংকরণ। যা এর ইমারতের বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে।
সুলতানি আমলের বিরল স্থাপত্য সুরা মসজিদ প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত। নামাজের কক্ষ ও বারান্দা। মসজিদের উপরে বর্গাকার ও গম্বুজ বিশিষ্ট নামাজ কক্ষ এবং ছোট ৩ টি গম্বুজ বিশিষ্ট একটি বারান্দা রয়েছে। নামাজের কক্ষটি দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে ৭ দশমিক ৮৪ মিটার। বারান্দার মাপ ৪ দশমিক ৮৪ মিটার লম্বা ও ২ দশমিক ১২ মিটার চওড়া।
চুন সুরকির সাহায্যে ছোট আকৃতির ইট দ্বারা নির্মিত মসজিদের দেওয়াল ১ দশমিক ৮০ মিটার প্রশস্ত। নামাজ কক্ষের ৪ কোণে ৪টি ও বারান্দায় দুটি কালো পাথরের মিনার রয়েছে। মসজিদে প্রবেশের জন্য পূর্ব দিকে ৩ টি ও উত্তর দক্ষিণ দিকে একটি খিলানকৃত প্রবেশ পথ আছে। মসজিদের ভিতরে কেবলা দেয়ালে তিনটি সুন্দরভাবে অলংকৃত পাথরের তৈরি অবতল মেহরাব রয়েছে। মসজিদে ইটের সাথে পাথরের ব্যবহার, দেওয়ালের মাঝে পাথরের স্তম্ভ ও ইটের গাঁথুনি চোখে পরার মত। এছাড়া প্রত্যেক দরজার নিচে চৌকাঠ রয়েছে। সেগুলো পাথরের তৈরি। পূর্ব পাশে মসজিদে প্রবেশের সিঁড়ি রয়েছে।
এখানকার কালো বেলে পাথর বাংলার পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত রাজমহল থেকে আনা হয়েছে বলে মনে করা হয়। প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী মসজিদটি দেখার জন্য আসেন।
অনেকে আসেন এখানে মানত করা গরু খাসি কুরবানি দিয়ে রান্না করে আশ-পাশের লোকজনকে খাওয়ানোর জন্য।
স্থানীয়দের মতে, প্রয়োজনীয় সংস্কার করে মসজিদটি সংরক্ষণ করা হলে এর সৌন্দর্য যেমন অটুট থাকবে, দর্শনার্থীর সংখ্যাও বাড়বে।
মসজিদের ইমাম মওলানা মো. ইনামুল হক বলেন, আমি এই মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়াই। দিনাজপুর জেলার প্রাচীন এ স্থাপত্যের সাক্ষী এ মসজিদটি প্রায় পাঁচশত বছর আগে নির্মিত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা মসজিদটি দেখার জন্য আসেন। দর্শনার্থীরা কেউ নামাজের জন্য আবার কেউ মানত শোধ করার জন্য আসেন।