বাসস
  ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭:৫৪

ছুটিতে বাড়ি ফেরা হলো না মুরাদের, ট্রেন দুর্ঘটনায় নিভে গেল সম্ভাবনাময় জীবন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী মাহদী হাসান মুরাদের মর্মান্তিক মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন ও সহপাঠীদের মাঝে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। ছবি: বাসস

\ বিপুল ইসলাম \

লালমনিরহাট, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (বাসস): ছুটির আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে থেমে গেল একটি সম্ভাবনাময় তরুণের জীবনের পথচলা। পরিবারের স্বপ্ন, নিজের ভবিষ্যৎ আর দেশসেবার আকাঙ্ক্ষা—সবকিছু এক মুহূর্তেই নিভে গেল ট্রেন দুর্ঘটনায়। 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী মাহদী হাসান মুরাদের মর্মান্তিক মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন ও সহপাঠীদের মাঝে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

আজ শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে নাটোরের লালপুর উপজেলার আব্দুলপুর রেলওয়ে জংশনে ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত হন মাহদী হাসান মুরাদ (২২)। তিনি লালমনিরহাট সদর উপজেলার বড়বাড়ি ইউনিয়নের পশ্চিম শিবরাম গ্রামের বাসিন্দা মো. আব্দুল মালেকের বড় ছেলে।

নিহত মুরাদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। ছুটি কাটাতে প্রিয় পরিবারের কাছে ফিরছিলেন তিনি। বাড়িতে তখন তার জন্য অপেক্ষা করছিল সবাই। একসঙ্গে বসে খাওয়ার আয়োজন করা হচ্ছিল, ছেলের বাড়ি ফেরা ঘিরে বাবা-মায়ের অদৃশ্য উচ্ছ্বাস। কিন্তু সেই অপেক্ষা আর আনন্দে রূপ নেয়নি; ফিরলেন তিনি নিথর দেহ হয়ে।

ছেলের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা মো. আব্দুল মালেক। কাঁপা কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমি গরিব মানুষ। এই ছেলেটাই ছিল আমার সব স্বপ্ন, আমাদের একমাত্র ভরসা। ওকে নিয়ে ভেবেছিলাম আমাদের দুঃখ ঘুচবে। কিন্তু আজ সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল। ছেলেকে হারিয়ে আমি একেবারে অসহায় হয়ে গেলাম।”

তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে শুনেছেন—খাবার কেনার উদ্দেশ্যে ট্রেন থেকে নামার সময়ই দুর্ঘটনার শিকার হয় তার ছেলে মাহদী।

মায়ের বুকফাটা আহাজারি যেন ভারী করে তোলে পুরো বাড়ির পরিবেশ। নিহতের মা মোসাম্মৎ মোকলেজা বেগম বলেন, “আমার ছেলে কোরআনে হাফেজ ছিল। ছোটবেলা থেকেই খুব ভালো ছাত্র ছিল। আমাদের দারিদ্রতা দূর করার স্বপ্ন দেখাত আমাকে। আমি কত স্বপ্ন দেখেছি মাহদিকে নিয়ে। সব স্বপ্ন এক মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল। আমার ছেলে আর কোনোদিন বাড়ি ফিরবে না।” ছেলের বন্ধুরা সমবেদনা জানাতে এলেও মায়ের শূন্য দৃষ্টি আর কান্না থামছে না।

মাহদী হাসান মুরাদ তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড়। তার ছোট বোন জান্নাতুল মাওয়া নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত এবং ছোট ভাই মাহমুদুর হাসান মিরাজের বয়স মাত্র আট বছর। বড় ভাইকে হারিয়ে দিশেহারা পুরো পরিবার।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী মো. তালেবুর রহমান ও আবু নাঈম বলেন, মুরাদ আমাদের খুব ভালো বন্ধু ছিল। সে কোরআনে হাফেজ ও ধার্মিক একজন মানুষ ছিল।

এমন একজন মানুষকে হারিয়ে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।

এদিকে, আব্দুলপুর রেলওয়ে জংশনের স্টেশন মাস্টার এস এম আবু সালেহ জানান, রাজশাহী থেকে চিলাহাটিগামী তিতুমীর এক্সপ্রেস ট্রেনটি ইঞ্জিন ঘোরানোর জন্য জংশনে থামলে মাহদী হাসান মুরাদ ট্রেন থেকে নিচে নামার চেষ্টা করেন। এ সময় দুর্ঘটনাটি ঘটে এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও রেলওয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে ঈশ্বরদী রেলওয়ে থানা পুলিশ প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ নিহতের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে।

মুরাদের পরিবারের সদস্যরা জানান, আজ রাত ৮টায় তার নিজ বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে ধর্মীয় মর্যাদায় তার দাফন সম্পন্ন করা হবে।

একজন সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীর এমন আকস্মিক মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবার নয়—শোকাহত হয়ে পড়েছে তার সহপাঠী, শিক্ষক, এলাকাবাসী ও পুরো শিক্ষাঙ্গন। মুরাদের অপূর্ণ স্বপ্ন আর নাফেরার পথচলা যেন সবাইকে নিঃশব্দে প্রশ্ন করে—এভাবে আর কত তরুণের জীবন হারিয়ে যাবে?