বাসস
  ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ২১:৫৭

নীলফামারীতে ১ হাজার শয্যার হাসপাতাল নির্মাণ করবে সরকার

ঢাকা, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : নীলফামারীতে ১ হাজার শয্যাবিশিষ্ট বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২ হাজার ৪৫৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি বৃহৎ স্বাস্থ্য অবকাঠামো প্রকল্প আজ অনুমোদন দিয়েছে সরকার।

ঢাকা ও রংপুরের হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমানো এবং দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য আধুনিক ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়।

১ হাজার শয্যার ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল স্থাপন’ শীর্ষক এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে, ২ হাজার ৪৫৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।

এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ১৭৯ কোটি ২৭ লাখ টাকা এবং বাকি ২ হাজার ২৮০ কোটি ৭ লাখ টাকা আসবে বৈদেশিক উৎস থেকে, যার বড় অংশ মূলত চীন সরকারের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা।

রংপুর বিভাগের নীলফামারী সদর উপজেলায় প্রকল্পটি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে বাস্তবায়ন করা হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বাসসকে জানান, উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে একটি আধুনিক ও বিশেষায়িত ১ হাজার শয্যার জেনারেল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠাই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।

হাসপাতালটিতে নেফ্রোলজি, কার্ডিওলজি, অনকোলজি ও নিউরোলজি বিভাগসহ সাধারণ ও বিশেষায়িত সেবা দেওয়া হবে, যা জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।

একনেক সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, নীলফামারীতে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী হাসপাতাল একটি কৌশলগত ও সময়োপযোগী উদ্যোগ।

তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টার চীন সফরের সময় সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমেই এই প্রস্তাবের সূচনা হয়, যেখানে চীন সরকার বাংলাদেশে একটি অত্যাধুনিক হাসপাতাল নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করে।

ড. মাহমুদ স্পষ্ট করে বলেন, ঢাকার বাইরে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হাসপাতালটি নীলফামারীতে স্থাপনের সিদ্ধান্ত চীন নয়, বরং বাংলাদেশ সরকারই নিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘যদি আমরা সত্যিকারের বিকেন্দ্রীকরণ চাই, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল বা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান-এ ধরনের বড় ও উন্নত প্রতিষ্ঠান ঢাকার বাইরে স্থাপন করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, দারিদ্র্য ও মৌসুমি দুর্ভোগপ্রবণ রংপুর অঞ্চলের নীলফামারীতে এই প্রকল্পের অবস্থান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি নিকটবর্তী সৈয়দপুর বিমানবন্দর থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও সহজ হবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, পরিকল্পিত মানের কারণে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর রোগীরাও এখানে চিকিৎসা নিতে আসতে পারেন, কারণ এ অঞ্চলে এ ধরনের কোনো আধুনিক হাসপাতাল নেই।

ড. মাহমুদ আরও বলেন, প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে চীনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের সুবিধার্থে। তবে চীনের সহায়তার প্রকৃত পরিমাণ ও ধরন চূড়ান্ত হলে ব্যয়ের কাঠামো কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে।

প্রকল্পটির লক্ষ্য হলো- রংপুর ও ঢাকার হাসপাতালগুলোর অতিরিক্ত চাপ কমানো, আধুনিক জরুরি সেবা, আইসিইউ, সিসিইউ, এইচডিইউ ইউনিট, উন্নত ডায়াগনস্টিক সেবা ও অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটারের মাধ্যমে সময়োপযোগী ও জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা নিশ্চিত করা।

এছাড়া হাসপাতালটি চিকিৎসা গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও মানবসম্পদ উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে, যা দেশের স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।

কার্যকারিতা ও রোগী সেবার মান উন্নয়নে আধুনিক প্রযুক্তি, হাসপাতাল অটোমেশন, ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড (ইএইচআর) এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চালু করা হবে।

এই উদ্যোগের ফলে রোগীরা নিজ এলাকার কাছাকাছি উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ায় চিকিৎসা ব্যয় ও ভ্রমণজনিত ভোগান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলেও আশা করা হচ্ছে।

প্রকল্পের প্রধান উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে : প্রায় ৯ লাখ ৯৩ হাজার ৬৯১ বর্গফুট আয়তনের সেমি-বেজমেন্টসহ ১০ তলা মূল হাসপাতাল ভবন, অধ্যাপক ও সিনিয়র চিকিৎসকদের জন্য একটি ১০ তলা আবাসন ভবন (৯৬ হাজার ৮০০ বর্গফুট), চিকিৎসকদের জন্য স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টসহ ১০ তলা ডরমিটরি (৬৫ হাজার বর্গফুট), পরিচালকদের জন্য দুইতলা ডুপ্লেক্স ভবন, দুইটি ছয়তলা নার্স ডরমিটরি ভবন, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য দুইটি ১০ তলা আবাসিক ভবন, দুইতলা মসজিদ, একতলা হাসপাতাল রান্নাঘর, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট, পাঁচতলা সার্ভিস ভবন, হাসপাতাল গ্যাস ম্যানিফোল্ড ও ভ্যাকুয়াম ইনসুলেটেড ইভাপোরেটর (ভিআইই) ট্যাংক সুবিধা, হেলিপ্যাড ও স্বয়ংক্রিয় অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা এবং দুইতলা জেনারেটর ও সাবস্টেশন ভবন।

প্রকল্পের পটভূমি ব্যাখ্যা করে কর্মকর্তারা জানান, নীলফামারী জেলায় প্রায় ২১ লাখ মানুষের বসবাস, যাদের অধিকাংশই গ্রামীণ ও আধা-শহুরে এলাকায় বসবাস করেন।

বর্তমানে জেলাটির স্বাস্থ্যসেবা মূলত ২৫০ শয্যার নীলফামারী জেনারেল হাসপাতাল এবং উপজেলা পর্যায়ের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরশীল।

এসব প্রতিষ্ঠানে  পর্যাপ্ত আইসিইউ, এইচডিইউ, ডায়ালাইসিস সেবা, পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার ইউনিট, নিউরো-ইমার্জেন্সি কেয়ার, কার্ডিয়াক কেয়ার, বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি সেবা এবং বিশেষায়িত মাতৃ ও নবজাতক সেবার ঘাটতি রয়েছে।

ফলে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের প্রায়ই রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। যার কারণে চিকিৎসায় বিলম্ব, অতিরিক্ত ব্যয় এবং ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

কর্মকর্তাদের মতে, হাসপাতালটি একটি টেকসই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠবে, যা স্বাস্থ্যসেবায় আঞ্চলিক বৈষম্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে এবং উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের জন্য সময়োপযোগী, মানসম্মত ও জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।