বাসস
  ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ২৩:৫২

প্রতিবন্ধীদের নিয়ে ব্যতিক্রমী আয়োজন, রবীন্দ্র কুঠিবাড়িতে স্পাইনাল কর্ড ইনজুরিদের সঙ্গে আড্ডা

ছবি : বাসস

কুষ্টিয়া, ১০ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহে পদ্মাপাড়ে অবস্থিত বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত কুঠিবাড়ি। পশ্চিমপাশের পাকা ঘাট ও বড় পুকুর ঘেঁষে কবির স্মৃতিবাহী বকুলতলা। রৌদ্রোজ্জ্বল সেই ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণে শনিবার বসেছিল এক ব্যতিক্রমী ও মানবিক আড্ডা।

ব্যাটারিচালিত হুইলচেয়ারে বসে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা অন্তত ১৭ জন স্পাইনাল কর্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত ব্যক্তি অংশ নেন এ আয়োজনে। হাঁটাচলার শক্তি না থাকলেও তাদের চোখেমুখে ছিল আত্মবিশ্বাস, সাহস আর জীবনের প্রতি গভীর ভালোবাসার ছাপ।

এই প্রতিবন্ধীদের সামনে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে তাদের কথা শোনেন দেশের প্রথম নারী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব রেহেনা পারভীন। সঙ্গে ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ ফউজুল আজিম, কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়াটারলুর ভিজিটিং রিসার্চ স্কলার ড. এ কে এম গোলাম হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রজ্জাক এবং একই বিভাগের আরেক সহযোগী অধ্যাপক হারুন অর রশিদসহ বিশিষ্টজনরা।

গান, হাসি, আড্ডা আর স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নঘেরা আলোচনায় মুখর হয়ে ওঠে বকুলতলা। শারীরিক প্রতিবন্ধীদের সম্ভাবনা, দক্ষতা ও আত্মনির্ভরশীলতার পথ খুঁজে বের করার নানা গল্প উঠে আসে এই ব্যতিক্রমী আড্ডায়। দুপুর আড়াইটার দিকে কুঠিবাড়ির প্রধান ফটকের পাশে জেলা পরিষদের বিশ্রামাগার ‘গীতাঞ্জলী’র সামনে সবাই একসঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ড. নাসের ফাউন্ডেশন এই ব্যতিক্রমী আয়োজনের উদ্যোগ নেয়। আয়োজনে অংশ নিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন উপস্থিত সবাই।

এ সময় যদুবয়রা ইউনিয়নের জোতমোড়া গ্রামের রাজু আহমেদ জানান, তিনি একসময় বালুটানা গাড়িতে শ্রমিকের কাজ করতেন। ২০০২ সালে গাড়ি দুর্ঘটনায় চাপা পড়ে চিরতরে হাঁটাচলার ক্ষমতা হারান। দুর্ঘটনার পর স্ত্রী একমাত্র কন্যাসন্তানকে নিয়ে তাঁকে ছেড়ে চলে যান। বর্তমানে অসুস্থ মাকে নিয়ে অন্যের সাহায্যে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি।

রাজু আহমেদের মতোই চাপড়া ইউনিয়নের উত্তর মিরপুর গ্রামের শামিম আহমেদ বলেন, ‘এতো বড় পর্যায়ের মানুষ আমাদের ডেকে সম্মান জানাবে, কোনোদিন ভাবিনি। একটি দুর্ঘটনায় পা হারিয়ে পরিবার ও সমাজের বোঝা হয়ে আছি। এখানে এসে মনে হয়েছে-আমরাও কিছু করতে পারি।’

শহিদুল ইসলাম নামের আরেক অংশগ্রহণকারী বলেন, ‘এভাবে কেউ আমাদের স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখায়নি। ড. নাসের ফাউন্ডেশনের দেখানো পথে যদি এগোতে পারি, তাহলে পরিবার ও দেশের জন্য কাজ করতে পারব।’

ড. নাসের ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. আবু নাসের জানান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও ক্রীড়া খাতে সংগঠনটি ২০০০ সাল থেকে কাজ করছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বেকার্সফিল্ড ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির কমিউনিকেশনস বিভাগের চেয়ারপার্সন। ব্যক্তিগত খরচ ও উদ্যোগে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিতে তাঁরা কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানান তিনি।

এ ধরনের ব্যতিক্রমী মানবিক উদ্যোগের প্রশংসা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব রেহানা পারভীন বলেন, ‘দেশ ও জাতির কল্যাণে সরকারের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে আরও উদ্যোমী হয়ে এগিয়ে আসতে হবে। প্রতিবন্ধীরা আমাদের বোঝা নয়, তারা সম্ভাবনার শক্তি।’