বাসস
  ০২ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:৪২

দিনাজপুরে শীতে বাহারি পিঠার উৎসব, ভাগ্য ফিরেছে অনেকের

ছবি: বাসস

রোস্তম আলী মন্ডল

দিনাজপুর, ২ জানুয়ারী, ২০২৬ (বাসস): জেলা শহরে  নিমতলা মোড় সহ একাধিক স্থানে শীতের এই পৌষ মাসে  পিঠা-পুলি ও মিষ্টিসহ রকমারি পিঠার ঘ্রাণে মোহিত এলাকাটি। এখানে শীতের পিঠা বানিয়ে অনেকের ভাগ্য বদল হয়েছে। তেমনি শীতের পিঠা-পুলি খেয়ে স্বাদ পেয়ে অনেকে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছে।

জেলা শহরের নিমতলা মন্দির মোড়,প্রতি বছর শীত এলেই এখানে জমে উঠে পিঠা বিক্রি'র রমরমা উৎসব। 

ভাঁপা পিঠা,চিতই পিঠা,পাটিসাপটা, ও তেলের পিঠার ধোঁয়া আর সুগন্ধির মিষ্টি ঘ্রাণে সন্ধ্যার পর মোহিত হয়ে ওঠে এলাকাটি।ছড়িয়ে পড়ে পিঠা-পুলির ঘ্রাণ। এখানে কুয়াশা মুড়ানো শীতের হিমেল হাওয়ায় ধোঁয়া উঠা ভাঁপা-চিতই পিঠার স্বাদ না নিলে যেন, তৃপ্তি মিটে না শীত কালীন পিঠা ভোজনকারীদের।

এই শীতের মৌসুমে প্রতিদিন সন্ধ্যা হলেই সারিবদ্ধ চুলার অল্প আঁচে পিঠা তৈরীর ধোঁয়া উড়ছে। গরম গরম ভাঁপা, পাটিসাপটা,চিতই, তেলের পিঠা নামানো হচ্ছে। ক্রেতারা এসে সারিবদ্ধ হয়ে পিঠা কিনে খাচ্ছেন,এ দৃশ্য চলে গভীর রাত পর্যন্ত।

শহরের যান্ত্রিক জীবনে অনেকের সময় নেই,বাড়িতে পিঠা তৈরি করার।তাই অধিকাংশ পরিবার নির্ভর করে এসব পিঠার দোকানে, পিঠা কিনে খেতে ভীড় করেন। শীতের পিঠার স্বাদ নিতে তাই এসব দোকানে ধুম পড়ে পিঠা বেচা-কেনার।

এই পিঠা বিক্রি করে অনেকের ভাগ্য বদলে ফিরে পেয়েছে সচ্ছলতা। হয়েছেন,স্বাবলম্বী-ও আত্ম-কর্মসংস্থানের সুযোগ। নারীরা সংসারে অর্থ যোগান দিতে বেছে নিয়েছেন, এখানে পিঠা তৈরির কাজ।

তবে তীব্র শীতের প্রকোপে ক্রেতা কমেছে বলে জানালেন,৪০ বছর বয়সের সাহেরা বেগম। তার ভাই মমিনুল হক সহ তিনি এখানে পিঠা তৈরি ও বিক্রি করেন। তার নিজের ও ভাইয়ের পরিবার পিঠা বিক্রি করে ভাল ভাবে চলে যাচ্ছে।

সাহেরা বলেন, শীতের মৌসুমে পিঠে বেচা কিনা ভালই হয়, তবে গত কয়েক দিন শীত বেশি পড়ে যাওয়ায় বেচা বিক্রি একটু কমে গেছে। পিঠা খাওয়ার মানুষ আসা কমে গেছে।

পিঠা কিনতে আসা যুবক রায়হান বলেন, শীতের কারণে এখান থেকে পিঠা কিনে বাড়ীতে নিয়ে গিয়ে পরিবারের সকলে একসাথে খাওয়া হবে। এ ধরনের গ্রাহক সংখ্যা অতিরিক্ত শীতের কারণে বাড়ছে।

এখানে পিঠা বিক্রেতা শুধু গৃহবধূ মরিয়ম বেগম নয়, দিনাজপুর শহরের এই নিমতলায় শরীফা বেগম ও অঞ্জলি রানীসহ ৭ জন শীতের পিঠার দোকান করেন।

পিঠা বিক্রেতা ৫৫ বছর বয়সের আব্দুল হালিম জানালেন,তিনি আগে ঠেলা গাড়ি চালাতেন।এই নিমতলা মোড়েই তারা ১৫/২০ জন ঠেলাগাড়ি নিয়ে বসে থাকতেন।এই স্থানটি এক সময় শহরে একমাত্র ঠেলা গাড়ি স্ট্যান্ড ছিলো। যান্ত্রিক যুগে কালের বিবর্তনে সেই ঠেলা গাড়ি হারিয়ে গেছে। তাই তিনি বেকার হয়ে পড়ে ছিলেন। কোন কাজ না থাকায় তাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। হঠাৎ তার মাথায় বুদ্ধি আসে।এখানে পিঠা তৈরির দোকান দিয়ে বসেছেন। প্রতি দিন তার পিঠা বেচা বিক্রি ভালোই হচ্ছে বলে দাবি করেন।

গত  ৩'বছর থেকে সাহেব আলী পিঠা বিক্রির দোকান দিয়েছেন। এর আগে সে বিভিন্ন হোটেলে শ্রমিকের কাজ করতেন। এখানে পিঠার দোকান দিয়ে  তার পিঠে বেচা কেনা ভালই হচ্ছে। তার স্ত্রী জুলেখা বেগম তাকে পিঠে বেচা কেনার সহযোগিতা করে। এ ভাবেই তার পরিবার পিঠা বিক্রি করে ভাগ্য বদলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। গত মাসে নিজে জমি কিনে বাড়ি করেছেন। আরো কিছু আবাদি জমি লীজ নিয়ে চাষাবাদ করেন।মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন।এখন ভালোই চলছে তার সংসার।

পিঠা বিক্রেতা হান্নান বলেন, "৭/৮ বছর যাবত এখানে পিঠা বিক্রি করে আসছি।প্রতিদিন সন্ধ্যার আগে এখনে এসে পিঠার দোকান দেই। গভীর রাতে পযন্ত পিঠা বিক্রি করে বাড়ি ফিরে যাই। প্রতিদিন ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকার পিঠা বিক্রি হয়।লাভ মোটামুটি ভালোই থাকে। এখানে আমার ছেলে সহ আরো ২/৩ জন কাজ করে। তবে আগের মতো আর বেচা-বিক্রি নাই।এখন অনেক পিঠার দোকান হয়েছে। আগে এখনে আমার একটাই পিঠার দোকান ছিল । আমার দেখা-দেখি সবাই পিঠার দোকান দিয়েছে।এটা শহরে সরকারি রাস্তার জায়গা।দোকান দেয়া কাউকে মানা করা যাবেনা। যার পিঠা ভালো হবে,তারটাই মানুষ খাবে। আমারটা ভালো লাগলে,আমারটা খাবে। আমার অনেক ধরা-বান্ধা কাস্টমার আছে।যারা অর্ডার দিয়ে বেশি করে পিঠা নিয়া যায়।"

শীত মৌসুমে গ্রামীণ গৃহ-বধূরা রকমারি পিঠা তৈরি করেন। শীতের পিঠার মধ্যে ভাঁপা পিঠা,চিতই পিঠা,তেলের পিঠা পাটিসাপটা পিঠা অন্যতম।

বিশেষ করে ভাপা পিঠা, তেলের পিঠা ও চিতই পিঠা অনেকের জনপ্রিয় খাবার।তাইতো নিমতলায় শীতের পিঠার ব্যবসা জমে উঠেছে। সন্ধ্যা হলেই দেখা যায়, চুলার অল্প আঁচের ধোঁয়া উড়ছে। গরম গরম ভাঁপা, চিতই নামছে। ক্রেতারা এসে সারিবদ্ধ হয়ে পিঠা কিনছেন। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খাচ্ছেন।

অল্প পুঁজি আর কম পরিশ্রমে বেশি লাভ হওয়ায় পিঠা ব্যবসায় নেমেছেন অনেকেই।

শুধু শহরে  নিমতলা মন্দির মোড় নয়,দিনাজপুর শহরে বাঞ্জারাম ব্রীজ, থানা মোড়, বটতলী, কাঞ্চন ব্রীজ মোড়, পুলহাট, ফুলবাড়ী বাস স্টান্ড,শেরশাহ ব্রীজ,মহারাজা মোড়, চাউলিয়াপট্রি মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট পিঠার দোকান সাজিয়ে বসছে নারী-পুরুষ বিক্রেতারা।

অনেকেই এ শীতের মৌসুমে পিঠা বিক্রিকে বেছে নিয়েছেন মৌসুমী পেশা হিসেবে। বেচা-কেনা বেশ ভালই চলে। চলতি পথে থেমে বা অস্থায়ী দোকানের বেঞ্চে বসে বা দাঁড়িয়ে হালকা নাশতাটা সেরে নিচ্ছেন, গরম গরম ভাঁপা পিঠা কিংবা চিতই পিঠা দিয়ে।

কেউবা চিতাই পিঠার সঙ্গে নিচ্ছেন ঝালযুক্ত সরিষা বাটা। ভাঁপা পিঠা খাচ্ছেন গুড় দিয়ে।গুড় আগে থেকেই ভাঁপা পিঠায় দেয়া থাকে।কেউ কেউ নারিকেল দেয় ভাঁপা পিঠায়। প্রতিটি ভাঁপাপিঠা ও চিতাই পিঠা বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকায়।তবে,ঝাল অথবা সরিষা বাটা থাকছে ফ্রি। যুবক-যুবতি,বৃদ্ধ-আবাল সব বয়সের মানুষ আসেন দোকানে পিঠা খেতে। অনেকে বাসায় নিয়ে যান।

নিমতলা মোড়ে দাঁড়িয়ে পিঠা খেতে খেতে বিরল উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তা মো. খাদেমুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয়, তিনি জানালেন, 'আমরা প্রায়ই এখানে এসে পিঠা খাই। পরিবারের জন্য বাসায় পিঠা নিয়ে যাই।আজ বউকেও সঙ্গে এনেছি। কর্মব্যস্ততার কারণে বাড়িতে চাল ভেঙে আটা করে পিঠা বানানোর সময় সুযোগ আর হয় না। ঝামেলা ছাড়াই স্বল্প দামে হাতের নাগালেই এখন পিঠা পাই। তাই এখন পথের ধারে পিঠাই আমাদের ভরসা।'

পিঠা কিনতে আসা চাকুরীজীবি নারী পাপড়ি বেগম বলেন, আমি প্রতিদিনই সন্ধ্যার পর, এখানে পিঠা খাই। 

শীতকালের খাবার মধ্যে পিঠা অন্যতম। আগে যদিও বাড়িতে এসব পিঠা বানানোর হিড়িক পড়তো, এখন তা আর দেখা যায় না,।

সরিফুল ইসলাম নামে আরেকজন বলেন, আমি আমার বন্ধুদেরকে নিয়ে পিঠা খাওয়ার আড্ডায় এসেছি। 

ভাবছি,আগামীকাল আসবো পিঠে খেতে।বেশ মজা লাগছে পিঠে গুলো খেতে।'

পিঠা বিক্রেতারা রমজান আলী জানালেন, 'ভাঁপা পিঠা তৈরির উপকরণ হচ্ছে চালের গুঁড়ো, নারকেল, খেজুরের গুঁড়। গোল আকারে পাতিলে কাপড় পেঁচিয়ে ঢাকনা দিয়ে হাঁড়ির ফুটন্ত গরম পানিতে ভাপ দিয়ে তৈরি হচ্ছে ভাপা পিঠা। অন্যদিকে, চালের গুড়ো পানিতে মিশিয়ে মাটির বাসনে তৈরি করা হচ্ছে চিতাই পিঠা।'

বেশ কয়েক দিন ধরে দিনাজপুরে তীব্র শীত পড়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় কনকনে শীত। এমন পরিবেশে শীতের পিঠা খেতে অনেকে পছন্দ করে।

সন্ধ্যার হিমেল হাওয়ায় খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে পিঠা খেতে অনেকেই ভিড় জমাচ্ছেন নিমতলা মোড়ে ভ্রাম্যমাণ পিঠার দোকান গুলোতে।এর মধ্যে ভাপা আর চিতই পিঠার কদর বেশি। এছাড়াও গড়ে ওঠা পিঠার দোকানে পাওয়া যাচ্ছে পুলি, ভাপা, তেলের পিঠা,পাটিসাপটাসহ হরেক রকম বাহারি পিঠা। এসব রকমারি পিঠা খেতে সুস্বাদু হওয়ায়, শীতের এ মৌসুমে সবার কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।