বাসস
  ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ২০:৫৩

নেত্রকোণায় কমরেড মণি সিংহের ৩৫তম প্রয়াণ দিবস পালিত

ছবি : বাসস

মো. তানভীর হায়াত খান

নেত্রকোণা, ১ জানুয়ারি ২০২৬ (বাসস): টংক আন্দোলনের মহানায়ক, মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কমরেড মণি সিংহের ৩৫তম প্রয়াণ দিবস নেত্রকোণায় যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে।

প্রয়াণ দিবস পালনে গতকাল বুধবার স্থানীয় টংক শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ ও কমরেড মণি সিংহ স্মৃতি জাদুঘর চত্বরে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, কমরেড মণি সিংহের প্রতিকৃতিতে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে পুষ্পস্তবক অর্পণ, শোক র‌্যালি, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং বিকেলে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

কমরেড মণি সিংহ মেলা উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক ডা. দিবালোক সিংহের সভাপতিত্বে ও সিপিবি উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোরশেদ আলমের সঞ্চালনায় এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় কমরেড মণি সিংহের জীবন ও সংগ্রামের ওপর আলোচনা করেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. তাইয়েবুল হাসান, বীর মুক্তিযোদ্ধা সোহরাব হোসেন তালুকদার, মেলা উদযাপন কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক অজয় সাহা, উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও মেলা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল-মামুন মুকুল, সিপিবি উপজেলা কমিটির সভাপতি আলকাছ উদ্দীন মীর, উদীচী উপজেলা সংসদের সভাপতি শামছুল আলম খান, কমরেড মণি সিংহ ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ডা. সাকি খন্দকার, মেলা কমিটির সদস্য শফিউল আলম স্বপন, কবি বিদ্যুৎ সরকারসহ ছাত্র ইউনিয়ন, যুব ইউনিয়ন ও ক্ষেতমজুর সমিতির নেতৃবৃন্দ।

সভার শুরুতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনা করা হয়।

সভায় বক্তারা বলেন, কমরেড মণি সিংহ ১৯২৮ সালে কলকাতার মেটিয়াবুরুজে কেশরাম কটন মিলে শ্রমিকদের ১৩ দিনব্যাপী ধর্মঘটে নেতৃত্ব দিয়ে দাবি আদায়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবনে প্রথম বড় সফলতা অর্জন করেন। ১৯৩০ সালে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং ১৯৩৭ সালের নভেম্বর মাসে কারামুক্ত হয়ে সুসং দুর্গাপুরে আসেন। সেখানে কৃষকদের সংগঠিত করে টংক প্রথার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলেন।

তারা আরও বলেন, ১৯৪৫ সালে নেত্রকোণায় অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত কিষাণ সভার মহাসম্মেলনে কমরেড মণি সিংহ ছিলেন অন্যতম সংগঠক ও অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি। সারাজীবন তিনি মেহনতি মানুষের কল্যাণে বৈষম্যবিরোধী রাজনীতি করে গেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি প্রবাসী সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

এদিকে কমরেড মণি সিংহের স্মরণে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে দূর্গাপুরে প্রতি বছর ৩১ ডিসেম্বর থেকে ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী কমরেড মণি সিংহ মেলা। এ বছর মেলার তারিখ পরিবর্তন করা হয়েছে। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় মেলার পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি পরিবর্তন করে আগামী ২৫ মার্চ ২০২৬ থেকে ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত সাত দিনব্যাপী মেলা আয়োজনের খসড়া তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে।

কমরেড মণি সিংহ ১৯০১ সালের ২৮ জুলাই কলকাতার এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার মৃত্যুর পর মা সরলা দেবীর সঙ্গে তিনি ময়মনসিংহ জেলার (বর্তমান নেত্রকোনা) সুসং দুর্গাপুরে বসবাস শুরু করেন। শিক্ষাজীবনেই তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হন এবং ‘অনুশীলন’ দলের মাধ্যমে বিপ্লবী রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

১৯২১ সালের অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলন তাঁর চিন্তাধারায় মৌলিক পরিবর্তন আনে। ওই সময় তিনি সন্ত্রাসবাদী পথ পরিহার করে শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনে মনোনিবেশ করেন। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এবং ১৯২৫ সালে গোপেন চক্রবর্তীর সঙ্গে আলোচনার পর তিনি মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন।

এর পর তিনি ১৯২৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী হিসেবে আত্মনিয়োগ করেন। ব্রিটিশ আমলে এবং পরে পাকিস্তান শাসনামলে তাঁকে বহুবার গ্রেপ্তার, কারাবরণ ও আত্মগোপনে থাকতে হয়। টংক প্রথাবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি নেত্রকোনার কৃষক ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

১৯৫১ সালে আত্মগোপন অবস্থায় তিনি পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং পরবর্তীতে একাধিকবার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত থাকেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক নেতৃত্ব প্রদান করেন এবং মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। 

স্বাধীনতার পর তিনি গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত রাখেন। বার্ধক্য ও অসুস্থতার মধ্যেও দীর্ঘদিন তিনি পার্টির নেতৃত্বে সক্রিয় ছিলেন। জাতীয় জীবনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’-এ ভূষিত হন।

১৯৯০ সালের ৩১ ডিসেম্বর এই কিংবদন্তি বিপ্লবীর জীবনাবসান ঘটে। আদর্শনিষ্ঠতা, ত্যাগ ও আপোষহীন সংগ্রামের কারণে কমরেড মণি সিংহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
বক্তারা নতুন প্রজন্মের কাছে এই মহান নেতার সংগ্রামী জীবন ও আদর্শ তুলে ধরার আহ্বান জানান।