বাসস
  ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৮:১৮

পথচারী নিহতের ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশ করবে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ: সড়ক উপদেষ্টা

ফাইল ছবি

ঢাকা, ১ জানুয়ারি ২০২৬(বাসস): সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেছেন, রাজধানীর ফার্মগেটে মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড পড়ে পথচারী নিহতের ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশ করবে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ।

আজ বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন মহাসড়ক বিভাগের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

উপদেষ্টা বলেন, ২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় মেট্রোরেলের পিলারের বিয়ারিং প্যাড বিচ্যুত হয়ে খুলে পড়ার ঘটনায় একজন পথচারী নিহত হন। নিহত পথচারীর নাম আবুল কালাম (৩৫) এবং তাঁর বাড়ি শরীয়তপুর।

তিনি বলেন, এই দুঃখজনক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দুর্ঘটনার দিনই সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটিতে ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক ড. এ বি এম তৌফিক হাসান, এমআইএসটির সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জাহিদুল ইসলাম এবং ডিএমটিসিএল-এর লাইন-৫-এর প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব। উপসচিব আসফিয়া সুলতানা কমিটিতে সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন।

উপদেষ্টা জানান, পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এছাড়া কমিটি আরও দুইজন বিশেষজ্ঞ সদস্যকে কো-অপ্ট করা হয়েছে। তাঁরা হলেন- বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. খান মাহমুদ আমানত, এবং অধ্যাপক ড. রাকিব আহসান। এছাড়াও দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের যোগসাজশ আছে কিনা তা সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করার জন্য ফরেনসিক প্রতিনিধি হিসেবে পুলিশের(সিআইডি) মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামকে তদন্ত কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

উপদেষ্টা বলেন, দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করে। কমিটি দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং প্রত্যক্ষদর্শী, ট্রেন চালক, অপারেটর, মেট্রোরেল কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। এছাড়াও বিয়ারিং প্যাড প্রস্তুতকারক কোম্পানি, ঠিকাদার ও ডিজাইন পরামর্শকদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। কমিটি প্রাপ্ত ডিজাইন ডকুমেন্ট এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত ও প্রতিবেদন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। পাশাপাশি মেট্রোরেল স্ট্রাকচারের বিভিন্ন অংশ পরিদর্শন করেন এবং বিচ্যুত বিয়ারিং প্যাডের ল্যাবরেটরি টেস্ট, ট্রেন চলাকালীন সময়ে ভাইব্রেশন পরিমাপসহ গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষানিরীক্ষা পরিচালনা করেন।

উপদেষ্টা বলেন, তদন্ত কমিটি দশটি সভা করে। প্রাপ্ত সকল তথ্যাদি বিশ্লেষণ করেছেন এবং তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছেন। কমিটির কার্যপরিধি অনুসারে ইতোপূর্বে ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সংঘটিত দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন কমিটি কর্তৃক পর্যালোচনা করা হয়। পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, পূর্ববর্তী তদন্ত প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে কিছু বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে, তবে তার কোনটিই নিশ্চিত করা হয়নি। প্রথমবার দুর্ঘটনার পরে যথেষ্ট সময় পাওয়ার পরেও ঠিকাদার এবং পরামর্শকের পক্ষ থেকে ডিটেইল্ড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যানালাইসিস করে দুর্ঘটনার মূল কারণ চিহ্নিত করা হয়নি।

উপদেষ্টা বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে বিচ্যুত বিয়ারিং প্যাডের হার্ডনেস, কম্প্রেশন সেট ও নিওপ্রিন কন্টেন্ট প্রচলিত স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী সঠিক ছিল না বলে কমিটির নিকট প্রতীয়মান হয়। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য দেশের বাইরের ল্যাবরেটরিতে আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন আছে। এছাড়া, বিয়ারিং প্যাডসমূহ কিছুটা ঢালু অবস্থায় (০.৮% স্লোপ) সন্নিবেশিত করা হয়েছে। বিয়ারিং প্যাড বিচ্যুতির ক্ষেত্রে এর কিছুটা প্রভাব রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনটির উভয় প্রান্তে বৃত্তাকার অ্যালাইনমেন্ট অবস্থিত। প্রতীয়মান হয় যে, ভায়াডাক্টের এলাইনমেন্টের সোজা অংশ ও বৃত্তাকার অংশের মধ্যে কোনো ধরনের ট্রানজিশন কার্ড ব্যবহার করা হয়নি।

তিনি বলেন, কমিটির অনুসন্ধানে মেট্রোরেলের এই এলাইনমেন্টের নকশায় ত্রুটি থাকতে পারে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। কার্ড এলাইনমেন্টের জন্য পৃথকভাবে মডেলিং ও অ্যানালাইসিস করা হয়নি। সোজা এলাইনমেন্টের মডেলিং ও অ্যানালাইসিস দিয়েই কার্ড এলাইনমেন্টের জন্য নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে।

কমিটি কর্তৃক ট্রেন চলাকালীন সময়ে পরিচালিত কম্পন পরিমাণে বিচ্যুত বিয়ারিং প্যাড সংশ্লিষ্ট পিয়ারসমূহে (পিয়ার নং-৪৩০ ও পিয়ার নং-৪৩৩) অন্যান্য পিয়ারের তুলনায় কম্পন অনেক বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে। কার্ড এলাইনমেন্টে নকশায় সম্ভাব্য ত্রুটির কারণে এ অংশে অযাচিত পার্শ্ববল এবং সংশ্লিষ্ট কম্পন এর উদ্ভব হচ্ছে যার সাথে বিয়ারিং প্যাডের বিচ্যুতির সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

উপদেষ্টা জানান, অনুসন্ধানে দেখা যায় কার্ড এলাইনমেন্ট এবং নিকটস্থ স্টেশনে রেল ট্র্যাকের নিচে নিওপ্রিন রাবার ম্যাস-স্প্রিং ড্যাম্পার সিস্টেম ব্যবহার করা হলেও মধ্যবর্তী দুর্ঘটনার স্থান সংশ্লিষ্ট ট্রাকের জায়গায় রিজিড ট্র্যাক রাখা হয়েছে। ধারণা করা হয় যে, এসব জায়গায় ম্যাস-স্প্রিং ড্যাম্পার সিস্টেম ব্যবহার করা হলে ভাইব্রেশন কমানো সম্ভব হতো। তবে কমিটি ঘটনার সাথে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের কোনো যোগসাজশ পায়নি।

উপদেষ্টা জানান, কমিটির কতগুলো সুপারিশ করেছে-

ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য কার্ড এলাইনমেন্টের সংশ্লিষ্ট স্থানে বিয়ারিং প্যাড যাতে সরে যেতে না পারে, সেজন্য যথাযথ কারিগরি ব্যবস্থা জরুরি ভিত্তিতে সন্নিবেশিত করতে হবে- যার কার্যক্রম ডিএমটিসিএল কর্তৃক বাস্তবায়িত হচ্ছে।

বিয়ারিং প্যাড সরে যাওয়ার কারণ সুনিশ্চিতভাবে নির্ণয়ের জন্য থার্ড পার্টি ইন্ডিপেন্ডেন্ট কনসালট্যান্ট দ্বারা বিস্তারিত অ্যানালাইসিস এর মাধ্যমে ভায়াডাক্টের স্ট্রাকচারাল ডিজাইন ও ট্র্যাক ডিজাইন এর গভীর পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

মেট্রো রেলের সার্বিক প্রজেক্ট ডিজাইনের উপর একটি থার্ড পার্টি সেফটি অডিট পরিচালনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন;

নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য অতি দ্রুত একটি কার্যকর ও যথাযথ স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং সিস্টেম স্থাপন করতে হবে; এবং সর্বোপরি, মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বিদেশি পরামর্শকের নিকট থেকে স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের নিকট টেকনোলজি ট্রান্সফার নিশ্চিতকরণে জোর প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে।

উপদেষ্টা বলেন, কমিটির রিপোর্ট সাবমিট করা হয়েছে কমিটির রিপোর্ট নিয়ে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের বোর্ড  সভায় বিস্তারিত আলোচনা করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে