BSS-BNhrch_cat_news-24-5
বাসস
  ৩১ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:৩৮

কৃষিতে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষাণ-কৃষাণীদের সাফল্য এনে দিয়েছে

॥ এজেড এম ইমাম উদ্দিন মুক্তা ॥
ময়মনসিংহ, ৩১ ডিসেম্বর ২০২১ (বাসস) : কৃষিতে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার সহজলভ্য করায় কৃষাণ-কৃষাণীদের দুর্ভাবনার যেমন অবসান হয়েছে, তেমনি তাদের সাফল্যও এনে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে দেশের অর্থনৈতিক মেরুদন্ড কৃষিকে আধুনিকিকরণ করা হয়েছে।  
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার দুল্লা গ্রামের কৃষক রিয়াজুল করিম ফরহাদ প্রথম সারির একজন সফল কৃষক। কৃষিতে তার সাফল্যের অন্যতম প্রধান সহায়ক ‘কৃষকের জানালা’।  দেশের বৃহত্তম অনলাইন প্লাটফর্ম  বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন এর আওতাধীন ৬৫৭ টি ই-সেবার মধ্যে কৃষকের জানালা একটি।
রিয়াজুল করিম বাসসকে জানান, প্রথমে তিনি কৃষি সংক্রান্ত বিষয়ে কৃষি বিভাগ থেকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নেন এবং আধুনিক প্রযুক্তির সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন। এরপরেই তিনি আধুনিক প্রযুক্তির কৃষি উৎপাদন শুরু করেন। প্রথম দিকে ফসলের রোগবালাইসহ নানা সমস্যার সম্মুখীন হতেন। তখন বাড়ি থেকে বেশ দূরের পথ পাড়ি দিয়ে মুক্তাগাছা শহরের কৃষি অফিসে গিয়ে পরামর্শ নিতে হতো। যা ছিলো সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। কিন্তু মোবাইল ফোনে ‘কৃষকের জানালা’ অ্যাপসের মাধ্যমে তিনি এখন তার সমস্যা সমাধান খুঁজে নেন।
ইউনিয়ন কৃষি তথ্য পরামর্শ কেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে এখন মিশ্র কৃষি খামার গড়ে তুলেছি। একই জমি ব্যবহার করে একাধারে খাদ্য শস্যের সাথে সাথে বিভিন্ন শাকসবজি উৎপাদন করি। এছাড়া দেশীয় ফল আম, কাঠাল, লিচুর সাথে ড্রাগন, স্টুবেরীসহ বিভিন্ন বিদেশী ফলও উৎপাদন করছি। এতে বাৎসরিক আয়ও ভালো হয়। “
জৈব পদ্ধতিতে তৈরী সার ও সমন্বিত বালাই দমন পদ্ধতি ব্যবহার করে সম্পূর্ণ বিষমুক্ত শাক সবজি ও ফলমূল উৎপাদন করায় তার কৃষি পণ্যের চাহিদাও বেশি। তার ওপর রয়েছে পণ্য বিক্রয়ের জন্য অনলাইন প্লাটফর্ম । এখন জেলা এবং জেলার বাইরে থেকে ক্রেতারা এসে ন্যায্য মূল্যে তার কাছ থেকে এসব ফসল কিনে নিচ্ছে।  
রিয়াজুল করিম বলেন, “উৎপাদন ও বিপনণ প্রক্রিয়া যেমন সহজ হয়েছে তেমনি আয়ও ভালো হচ্ছে।”
ময়মনসিংহ জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের বিস্তৃত চরাঞ্চলসহ অধিকাংশ গ্রামে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও সরাসরি কৃষি ফসল উৎপাদনে ব্যাপকভাবে এগিয়ে এসেছে। তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে কেঁচু সার তৈরীসহ ফসল উৎপাদন ও বিপণন কাজে সরাসরি মাঠে কাজ করছেন নারীরা। মুক্তাগাছার গোবিন্দবাড়ী গ্রামের কৃষাণি মমতাজ বেগম তাদেরই একজন।
মুক্তাগাছার গোবিন্দবাড়ি গ্রামের কৃষাণী মমতাজ বেগম স্বামীর মৃত্যুর পর অভাব অনটনে দিন কাটাচ্ছিলেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে শাকসবজি চাষের উপর প্রশিক্ষণ নিয়ে বাড়ির আঙ্গিনায় বিভিন্ন জাতের শাকসবজি আবাদ শুরু করেন। ক্রমে স্বামীর রেখে যাওয়া সামান্য জমিতে ধানসহ অন্যান্য শস্য আবাদ করেন। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কৃষি বিভাগের পরামর্শে সুষম সার ব্যবহারসহ কৃষির আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন করেন। তিনি জানান, পণ্য বিক্রির জন্যও তিনি অনলাইন প্লাটফর্ম ব্যবহার করেন। মমতাজ বলেন, বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করে আমি প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকার  বেশি আয় করি। এখন ‘নিজের কাজ নিজে কর’ এই নীতি মেনে চলছি।
বাংলাদেশ এবছর পরিপূর্ণ ডিজিটাল বাংলাদেশ-এ রুপান্তরিত হলো। একজন প্রান্তিক নারীর সফল কৃষক হয়ে ওঠার পেছনের গল্পটি কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশ এর। ২০০৮ সালে আওয়ামীলীগের নির্বাচনী ইশতেহারে দেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তরের ঘোষণা দেন আওয়ামীলীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এটি ছিল প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজিব ওয়াজেদ জয়ের স্বপ্ন ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ‘রূপকল্প ২০২১’ অর্জনের লক্ষ্যে এটুআই কর্মসূচি কাজ শুরু করে। সেসময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এর কার্যক্রম শুরু হলেও বর্তমানে এটুআই ইউএনডিপির সহায়তায় মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের ও তথ্য ও  যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের আওতায় কাজ করছে।
জনগণের তথ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করা এবং সরকারি দপ্তর থেকে প্রদেয় সেবাসমূহ প্রাপ্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এটুআই-এর উদ্যোগ প্রথম দেশের বৃহত্তর ওয়েব পোর্টাল জাতীয় তথ্য বাতায়ন চালু করা হয়। দেশের সকল ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগ, অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়সহ ৫১ হাজার ৫ শ‘র ও বেশি সরকারি দপ্তরের ওয়েবসাইটের একটি সমন্বিত রূপ বা ওয়েব পোর্টাল হচ্ছে জাতীয় তথ্য বাতায়ন।  এটুআই কার্যালয় সুত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নে সরকারি দপ্তরের ৬৫৭ টি ই-সেবা এবং ৮৮ লাখেরও বেশি বিষয়ভিত্তিক কনটেন্ট যুক্ত করা হয়েছে। জাতীয় তথ্য বাতায়নের তথ্য ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষি সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করছে।   
মমতাজের মতোই ঐ এলাকার রুবিয়া খাতুন, সাজেদা খাতুন, রহিমা খাতুন, সাহিদা, ইয়াসমিন, আম্বিয়া ও ফুলেছা বেগমসহ অনেক নারী কৃষি কাজে এগিয়ে এসেছেন। তারা প্রত্যেকেই কৃষিতে আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে  কৃষি উৎপাদন ও বিপণনে সফল হয়েছেন। তারা জানান, কৃষকের জানালা অ্যাপস থেকে তারা তথ্য নিয়ে কাজে লাগাচ্ছেন।
ময়মনসিংহ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মতিউজ্জামান বাসসকে জানান, জেলায় মোট ১০ লাখ ১৯ হাজার ৯৫৬টি কৃষক পরিবার রয়েছে। যারা সরাসরি কৃষি উৎপাদনের সাথে সম্পৃক্ত। মোট আবাদী জমি ৩ লক্ষ ৩০ হাজার ৯১ হেক্টর। জেলায় মোট খাদ্য শস্য উৎপাদন হয় ১৮লাখ ৭২ হাজার ৪৭৫ মেট্টিক টন। চাহিদা রয়েছে ১১লাখ ৫২হাজার ৫৭৩ মেট্রিক টন। জেলায় খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকে ৭ লাখ ১৯ হাজার ৯১২ মেট্রিক টন। জেলায় মোট ৪৪৯টি কৃষি ব্লক রয়েছে। প্রতিটি ব্লকে ১০টি করে মোট ৪৪৯০টি কৃষক দল রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের অন্যান্য  জেলার মতো ময়মনসিংহ জেলার ১৩টি উপজেলার ১৪৫টি ইউনিয়নের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে রয়েছে ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্র। পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ত্বরান্বিত ও নির্বিঘœ করতে ২৯০টি ইউনিয়ন কৃষি পরামর্শ কেন্দ্র রয়েছে। সেখানে প্রতিদিন একজন করে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা কৃষকদের কৃষি জনিত বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন। এখন মোবাইলের মাধ্যমে তারা কৃষকদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। জেলায় ৩১৫টি আইপিএম ক্লাবের মাধ্যমেও কৃষকদের নানাভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে।
মতিউজ্জামান বলেন, কৃষকদের প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব ও নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করার অনীহাসহ মাঠ পর্যায়ে প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করতে যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যাবস্থাসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে ।
দুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হুসেন আলী হুসি বলেন, বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল এখন প্রান্তিক মানুষও ভোগ করছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষক-কৃষাণিরা সঠিকভাবে ফসল যেমন উৎপাদন করতে পারছেন, তেমনি বিক্রি করে ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন। এতে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হচ্ছে। তিনি তার এলাকায় সরকারীভাবে একটি স্থায়ী বিপনণ কেন্দ্র স্থাপনের দাবী জানান।
পেস্ট ডায়াগোনস্টিক সেন্টার ও শস্য হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত পেস্ট ডক্টর উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সেলিম রেজা জানান, এই হাসপাতালের মাধ্যমে ঐ অঞ্চলের আড়াই হাজারের অধিক কৃষক বিভিন্ন সময়ে কৃষি বিষয়ে বিভিন্ন পরামর্শ সেবা গ্রহন করেছেন। প্রতি মঙ্গলবার এলাকার চাষিদের নিয়ে ঐ সেন্টারে কৃষি বিষয়ে পরামর্শ দেয়া হয়। চাষিরা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তার সাথে যোগযোগ করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নেন। অনেক সময়ই ছবি তুলে পাঠিয়ে কিংবা মাঠ থেকে সরাসরি লাইফ দেখিয়ে পরামর্শ নেন। কৃষির উন্নয়নে এই হাসপাতালটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
মুক্তাগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ এমদাদুল হক বাসসকে জানান, সরকারের ডিজিটাল প্লাটফর্ম জাতীয় তথ্য বাতায়নের আওতায় পরিচালিত কৃষকের জানালা থেকে মুক্তাগাছা উপজেলার প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকরা কৃষি সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে সহজেই পরামর্শ নিতে পারছেন। সমস্যা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তাদের সাথে তাৎক্ষনিকভাবে মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে যোগযোগ করে ব্যবস্থা নিতে পারছেন। এতে কৃষকরা তাদের ফসল রক্ষা ও কাংখিত ফলন লাভে সক্ষম হচ্ছে। বর্তমান সরকারের রূপকল্প বাস্তবায়নে এক্ষেত্রে  মনিটরিং ব্যবস্থা আরো জোরদার করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।  

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন