বাসস
  ২২ ডিসেম্বর ২০২১, ১১:৪৯

ঠাকুরগাঁওয়ে তাঁতী পল্লীর তাঁতীরা এখন কম্বল তৈরীতে ব্যস্ত

॥ মো. আসাদুজ্জামান আসাদ ॥
ঠাকুরগাঁও, ২২ ডিসেম্বর, ২০২১ (বাসস) : শীতের শুরুতেই খট-খট, খট-খট শব্দ সকাল, দুপুর-রাতে। এই শব্দে কম্বল বুনণের, এখন ব্যস্ত জেলার তাঁতী বাড়ির তাঁতীরা। এখন তাদের পরিবারের দিন-রাত একটাই কাজ কম্বল বানানো। এ কাজেই তাদের সারাবছরের রোজগারের একমাত্র পথ। তাই নাওয়া-খাওয়া ভুলে কম্বল বানাচ্ছেন তারা।
প্রস্তুতিটা শুরু হয় শীত আসার এক দু মাস আগে থেকেই। আর শীত এলেই শুরু হয় ব্যস্ত সময়। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বড়গাঁও ইউনিয়নের কেশুরবাড়ির গ্রামের তাঁত পল্লী এখন কর্মমুখর। কেশুরবাড়ি গ্রামের তাঁতী সুজন দাস বলেন, এটা আমার দাদার দাদা করছিলেন তারপর আমার দাদা ও বাবা করেছেন, এখন আমি দেশ স্বাধীন হবার পর থেকে কম্বল তৈরি করি। শুধু আমি না আমার পরিবারের সবাই করে। আগে লাভ ছিল ভালো এ কাজে এখন নাই। সুতার দাম বেশি। সুতা পাওয়া যায় না। পরিবারের সবাই কাজ করে অল্প কিছু পাই। কম্বল তৈরি করে বিক্রি করে যা টাকা পাই তা দিয়ে কোনো মতো টেনে টুনে সংসার চালিয়ে নেই।
সবুজ দাস আরো বলেন, ‘এক সময় হামার (আমার) গ্রামত (গ্রামে) প্রায় ৭০০ পরিবার কম্বল তৈরি করিছিন (করেছে)। লাভ কম হয়, এজন্য দিন-দিন এই পেশা অনেকে ছাড়ে (ছেড়ে)় দিছে। গতবার ৪০ পরিবার কম্বল তৈরি করেছে এবার করছে ২০-২৫টি। কেউ আর এই পেশাত থাকিবার চাহে না (এ পেশায় থাকতে চায় না)। এখন লাভ কম, সুতার দাম বেশি। হামরা সুদের পর টাকা নিয়ে কম্বল তৈরির কাজ শুরু করিছি। শুধু পৈত্রিক পেশাকে টিকিয়ে রাখার জন্য ও পরিবার পরিজন নিয়ে বাঁচার জন্যই এই  কাজ চালিয়ে যাওয়া।’   
ওই পল্লীর আরেক নারী তাঁত কারিগর অনামিকা দাস বলেন, আমার যখন বিয়ে হয় আমার শ্বশুড় কম্বল তৈরির কাজ করতেন। আগে আমি কম্বল তৈরির কাজ জানতাম না, আমার শ্বশুরের কাছে দেখে-দেখে আমি শিখেছি। এখন আমার বয়স প্রায় ৫৭ বছর এখনও আমি এই কম্বল তৈরির কাজ করি। আমার সঙ্গে আমার বউমা ও ছেলে করে।  
আরেক কাজ মিলন দাস বলেন, শীতের ৪ মাস হামরা কম্বল তৈরি করি। গরমের সময় কম্বল তৈরি করার কাজ থাকে না। তখন শহরে গিয়ে রিক্সা চালাই। বাপ-দাদার পেশা ছাড়তেও পারি না। তাই ধরে আছি বাপ-দাদার পেশা।  
কম্বল কিনতে আসা পাইকার রফিকুল ইসলাম ও কাজী আজগর আলী বলেন, আমি ১০ বছর ধরে কম্বলের ব্যবসা করি। শীত এলেই ৪ মাস ভালোই হয় আমার ব্যবসা। কিন্তু এর পরেই সারাবছর বসে থাকতে হয়।
তাঁতীরা জানান, পুঁজির অভাবে তারা এ ব্যবসায় আগের মতো আর বিনিয়োগ করতে পারছেন না। বেশির ভাগ তাঁতীই পুঁজি জোগাতে মহাজন ও দাদন ব্যবসায়ীদের সুদের জালে জড়িয়ে পড়েছেন। ফলে সুদ পরিশোধেই চলে যাচ্ছে তাঁতীর পুঁজির বড় অংশ। ফলে তাদের লাভের অংশটাও থাকে না। ফলে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর দিনাতিপাত করছেন এই তারা। তবে সরকারি পৃষ্টপোষকতা ও সহযোগিতা পেলে এই পল্লীর তাঁতীরা পুরোনো ও পৈত্রিক পেশাকে টিকিয়ে রাখতে পারেন। আর তা না হলে দ্রুত আধুনিক প্রযুক্তির কাছে এই পল্লী ও পল্লীর তাঁত পেশা হারিয়ে যাবে দ্রুত।  
 ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু তাহের মো. শামসুজ্জামান বলেন, তাঁতশিল্প ধরে রাখার জন্য এখন তাঁতীদের সহযোগিতা প্রয়োজন। আমি চেষ্টা করবো তাদের জন্য সরকারিভাবে সুযোগ-সুবিধা ও বিনা সুদে লোনের ব্যবস্থা করার।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক মো. মাহবুবুর রহমান জানান, তাঁত শিল্প একটি পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী পেশা। এই ধরণের পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী পেশা ও কাজকে টিকিয়ে রাখতে বর্তমান সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। তাদেরকে সরকার বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রণোদনা ও সহযোগিতা করে আসছে। তবে তাদের চাহিদার তুলনায় আরো অপ্রতুল। আমরা এই পেশার সকল মানুষদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে অর্ন্তভূক্তিরসহ তাদের জন্য সহজ শর্তে লোনের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হবে। আর তাদের বিভিন্ন রকম সহায়তার আওতায় আনার মাধ্যম্যে এই পেশাকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করবো বলেও জানান জেলা প্রশাসক।