BSS-BNhrch_cat_news-24-5
বাসস
  ০২ ডিসেম্বর ২০২১, ১৯:১৩

পাহাড়ি জনপদে শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করছে সেনাবাহিনী

॥ জিগারুল ইসলাম (বান্দরবান থেকে ফিরে, পর্ব-২) ॥
চট্টগ্রাম, ২ ডিসেম্বর ২০২১ (বাসস) : চারদিকে উঁচু-নিচু ছোট-বড় পাহাড় আর পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে গড়ে ওঠা বন জঙ্গলই এসব এলাকায় বসবাসকারী উপজাতিদের জীবন-জীবিকা। এসব পাহাড়ি জনপদে শিক্ষার হার ছিল অনেক কম। স্কুলগামী শিক্ষার্থীর চেয়ে ঝরে পড়ার হারই ছিল বেশি। এর প্রধান কারণ ছিল বিদ্যালয় সংকট, শিক্ষক সংকট, অনুন্নত রাস্তাঘাট, দরিদ্রতা, কুসংস্কার, অবহেলা-অসচেতনতা, সর্বোপরি শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশের অভাব। সংগত কারণেই প্রত্যন্ত এলাকার বসবাসকারীদের স্বপ্নের মধ্যেও ছিলনা তার ছেলেমেয়ে স্কুলে পড়বে, শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে দেশ সেবায় নিয়োজিত হবে। স্বাস্থ্যসেবা নির্ভর করতো স্থানীয় বান-টোনা কবিরাজের চিকিৎসায়। যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় জুমে উৎপাদিত কৃষিজ পণ্য বাজারজাতের অভাবে ক্ষেতেই পঁচে যেত অনেক সময়। পার্বত্য তিন জেলার বাসিন্দাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্য, আর্থ-সামাজিক ও অবকাঠামো উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চারটি রিজিয়ন। 
পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ফেরাতে করা শান্তিচুক্তির ২৪ বছর পূর্ণ হয়েছে আজ ২ ডিসেম্বর ২০২১। চুক্তির ২৪ বছরে সংঘাতের পাহাড়ি জনপদ এখন বহুলাংশে শান্ত। ফলে তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে এখন চলছে উন্নয়নযজ্ঞ। দুর্গম পাহাড়ে জ্বলছে বিদ্যুতের বাতি, গড়ে উঠছে সড়ক ব্যবস্থা আর পর্যটনকেন্দ্র। যার বদৌলতে পাল্টে যাচ্ছে সেখানকার জনজীবনের রূপ ধারা। তবে এখনো পাহাড়ি জনপদে বিদ্যমান কয়েকটি উগ্রবাদী গোষ্ঠীর কারণে মাঝে মধ্যেই উত্তপ্ত হয় পার্বত্য এলাকা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী উগ্রতা দমন ও পাহাড়ে বসবাসকারী জনগোষ্ঠির উন্নয়নে বহুমুখি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় শান্তিচুক্তির আলোকেই পার্বত্য এলাকায় উন্নয়নযজ্ঞ চলছে। রাস্তা-ঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তির সুবিধা সবই এখন সেখানে বিদ্যমান। ধারবাহিকভাবে পার্বত্য জেলাসমূহে উন্নয়নকাজ এগিয়ে আনা হচ্ছে। 
সূত্র মতে, যুগের পর যুগ চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকাগুলো ছিলো অরক্ষিত। সন্ত্রাসী আর উগ্রবাদীদের অভয়ারণ্য। গোষ্ঠীগুলোর পরস্পরবিরোধী কার্যকলাপে প্রায়ই ঘটতো প্রাণহানি। রাষ্ট্রীয়ভাবে দমন-নিপীড়ন করার চেষ্টা হতো অগণতান্ত্রিকভাবে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পাহাড়ে শান্তি ফেরানোর উদ্যোগ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশের বিধিবিধান ও আইন অনুযায়ী সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে কয়েক দফা সংলাপের পর পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এটি একটি ঐতিহাসিক এবং যুগান্তকারী চুক্তি। এতে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ এবং শান্তি বাহিনীর পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতা সন্তু লারমা।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র এক শতাংশের বসবাস তিন পার্বত্য জেলায়। পার্বত্যাঞ্চলের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকিকে দূরে রেখে সেনাবাহিনী কর্তৃক গৃহীত ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও উপজাতিদের কল্যাণমূলক কাজগুলিও করছেন সেনাবাহিনী। এজন্য ইউনিফর্ম পরা সেনা সদস্যদের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেশ জনপ্রিয় করে তোলে। শান্তিচুক্তির পর পার্বত্য জেলায় শান্তি আনার পাশাপাশি ভৌত অবকাঠামো এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে পার্বত্য জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন এখন দৃশ্যমান। পাহাড়ে অনেক স্থান ছিলো, যেখানে যাওয়া দুস্কর, সেখানেও এখন সড়কপথ সৃষ্টি হয়েছে। সেনাবাহিনীর সহায়তায় গড়ে উঠছে বিস্তৃত যোগাযোগ ব্যবস্থা। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও আয়বর্ধন মূলক কাজেও রয়েছে সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ।
শান্তি চুক্তির পর শিক্ষার মানোন্নয়নে রাঙামাটিতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছে সরকার। শান্তিচুক্তির আগে তিন পার্বত্য জেলায় হাইস্কুল ও কলেজের সংখ্যা ১১টি থেকে বর্তমানে প্রায় ৫শয়ে উন্নীত হয়েছে। প্রতিটি পাড়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। শিক্ষার হার দুই থেকে বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে।
আইএসপিআরের এক তথ্য বিবরণীতে জানা যায়, ১৯৯৭ সালে পার্বত্য তিন জেলাতে যোগাযোগের উপযোগী রাস্তা ছিল ২ হাজার ৮০৩ কিলোমিটার, বর্তমানে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের তত্ত্বাবধানে নির্মিত সড়ক যোগাযোগের পরিধি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৯৪৯ কিলোমিটার। শান্তিচুক্তির পূর্বে তিন জেলায় হাসপাতাল-ক্লিনিক ছিল মাত্র ২৪টি, এখন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও কমিউনিটি পর্যায়ে ক্লিনিক স্থাপিত হয়েছে ২৭০টি। শান্তিচুক্তির পূর্বে পাহাড়ে ক্ষুদ্র-মাঝারিসহ কল কারখানা ছিল ১৩৫টি, বর্তমানে ২২৩টিতে উন্নিত হয়েছে। তিন পার্বত্য জেলায় ৮০টি দেশি-বিদেশী এনজিও’র মাধ্যমে ১০১টি প্রকল্প চলমান রয়েছে, এসব প্রকল্পে কর্মরত ৬৪ শতাংশ উপজাতি এবং ৩৪ শতাংশ বাঙালি বাসিন্দা। এসব প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের ৬৩ শতাংশ উপজাতি ৩৭ শতাংশ বাঙালি। পার্বত্য বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও গুইমারা রিজিয়নের অধীনে গত একবছরে পার্বত্যাঞ্চলের উপজাতি জনগোষ্ঠির কল্যাণে ৬৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও পূণনির্মাণ করা হয়েছে। সুপেয় পানির কষ্ঠ লাগবে ১৫টি গভীর নলকুপ স্থাপন করা হয়েছে। ৩৯ হাজার ৪৪৮ পরিবারে খাদ্য সঙ্কট নিবারণে দেয়া হয়েছে ত্রাণ সামগ্রী। বিভিন্ন আর্থিক অনুদান দেয়া হয়েছে ১১ হাজার ২২৪জনকে। ২২০টি ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণ ও পূণনির্মাণ করে দেয়া হয়েছে। যাত্রী ছাউনি ও ব্রীজ নির্মাণ করা হয়েছে ২০টি। উপজাতিদের নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতি রক্ষায় ৭৪টি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, প্রদর্শন করা হয়েছে ৪৬টি উম্মুক্ত চলচ্চিত্র। ১৮ হাজার ৮৩০ পরিবারকে দেয়া হয়েছে শীতবস্ত্র।
পাহাড়ে বসবাসকারি উপজাতিদের তথাকথিত আদিবাসী মর্যাদার মতো বিষয়গুলি উত্থাপনের জন্য বেশ কয়েকটি বেসরকারি এবং আন্তর্জাতিক সাহার্য্য সংস্থাকে দায়ী করে বান্দরবানের মিলনছড়ি এলাকার বাসিন্দা একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসবাসকারী উপজাতীয় পুরুষ ও মহিলারা আদিবাসী নয়, কারণ তাদের পূর্বপুরুষরা ভারত, মায়ানমার, মঙ্গোলিয়া এবং তুরস্কের মতো বিভিন্ন দেশ থেকে এখানে এসেছেন। পাহাড়ের বিবদমান সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর অবৈধভাবে চাঁদা আদায় এবং মাদক ব্যবসার উপার্জন মূলত অস্ত্র কেনার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। উপজাতিদের একাংশের বিরোধীতার সত্ত্বেও সেনাবাহিনী দ্বারা বাস্তবায়িত ব্যাপক উন্নয়ন কাজের মাধ্যমে তাদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে খুশি সাধারণ উপজাতীয় জনগণ। কারণ তারা শান্তি চায়। তিনি বলেন, উপজাতিদের একটি গোষ্ঠি একদিকে উন্নত জীবন চায়, কিন্তু অন্যদিকে সরকার ও সেনাবাহিনীকে হেয় করার অবলম্বন করছে। মাঝে মাঝে আমরা ভাবি তারা আসলে কী চায় ? পাহাড়ে বাঙালিদের তুলনায় উপজাতীয় সম্প্রদায়ের মানুষ এখন বেশি শিক্ষিত, তারা বাড়তি সুবিধাও পায়। উপজাতীয় শিশুদের জন্য উন্নত শিক্ষা এবং কোটা সুবিধা রয়েছে। অনেকেই উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গেছেন। 
৬৯ পদাতিক ব্রিগেড এবং বান্দরবান রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জিয়াউল হক জানান, পার্বত্যাঞ্চলের মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতারপাশাপাশি ‘অপারেশন উত্তরণ’ এর অধীনে সেনাবাহিনী পার্বত্যাঞ্চলে নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য নানা প্রকল্প গ্রহণ করেছে। দরিদ্র ছাত্রদের সহায়তা করছে, তাদের বেশিরভাগই বিভিন্ন উপজাতি সম্প্রদায়ের সন্তান। করোনাকালীন জুম অ্যাপসে ক্লাসে যোগদানের জন্য দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের মোবাইল ফোন দেয়া হয়েছে। বিবদমান সন্ত্রাসী গোষ্ঠির সংঘর্ষের শিকারদের আর্থিক ও অন্যান্য সাহায্যও দিচ্ছি আমরা। তিনি বলেন, শান্তিচুক্তির আলোকে পার্বত্য অঞ্চলের জেলাগুলোয় স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে টেলিযোগাযোগ, মোবাইল ফোন নেটওয়ার্কের আওতা বৃদ্ধি এবং ইন্টারনেট ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন করা হয়েছে। ফলে দুর্গম পাহাড়েও বিদ্যুতের আলো, মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠেছে সড়ক যোগাযোগ ও ভৌত অবকাঠামো। চার হাজার পাড়াকেন্দ্র রয়েছে। শিশু ও মহিলাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসহ সামাজিক সেবা প্রদানের জন্য পাড়াকেন্দ্রের সেবাসমূহ আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর করে ডিজিটালাইজড করা হচ্ছে। দ্রুত গতির ইন্টারনেট সেবা দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। এসব কর্মকান্ডে সহযোগীতা করছে সেনাবাহিনী। 
বান্দরবানের রুমা উপজেলার মুনলাই পাড়ার বাসিন্দা শিক্ষক জিংরাম থাং বম জানান, চুক্তির মাধ্যমে অশান্ত পাহাড়ে অনেকাংশে শান্তি ফিরেছে। আওয়ামী লীগ সরকার শান্তিচুক্তির মাধ্যমে অন্ধকার পাহাড়ে আলোর প্রদীপ জ্বালিয়েছে। আগে নিজ পরিবারের খাবার (চাল, ডাল) আনতে দুইদিন হেঁটে বাজারে যেতে হতো। কয়েকদিন পর আবার যেতে হতো, এভাবেই আমরা চলতাম। এখন রাস্তা হয়েছে, বিদ্যুৎ এসেছে। পর্যটক আসায় পাড়ার সবাই অর্থনৈতিকভাবে ভালো আছে। তিনি বলেন, আমাদের ‘মুনলাই পাড়া’ পাহাড়ের মধ্যে একটি পরিচ্ছন্ন গ্রাম হিসেবে পরিচিত। এখানে কোন চুরি হয়না, কেউ কারো ক্ষতি করেনা, এমনকি কেউ ঘরের দড়জা খুলে অন্যত্র গেলেও পাশেরজন পাহাড়া দেন। পাহাড়ি জনপদে এমন পরিবর্তন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সচেতনতামূলক কার্যক্রমের ফলেই সম্ভব হয়েছে।  
একজন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেছেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পাহাড়ে অত্যন্ত জনপ্রিয়। কারণ তারা পাহাড়িদের সব কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছে। সেনাবাহিনী এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে যা সরাসরি তাদের জীবনধারা পরিবর্তন করেছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে জল সরবরাহ নিশ্চিত করা, যা তাদের কৃষিতে সহায়তা করেছে এবং সড়ক যোগাযোগের উন্নয়নের ফলে তাদের কৃষি পণ্য বাজারজাত করতে সহায়তা করেছে।
তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর পার্বত্য এলাকায় রাস্তা, সেতু এবং অন্যান্য সুবিধা নির্মাণে ব্যাপকভাবে ভুমিকা রাখছে। এসব উন্নয়ন কাজের সময় সেনাবাহিনীর অনেক সদস্যের মৃত্যুও ঘটেছে। তবুও আমরা দেশের স্বার্থে আমাদের সেরাটা দিয়ে যাচ্ছি।
 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন