BSS-BNhrch_cat_news-24-5
বাসস
  ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৮:৪৫

ইএফটি পদ্ধতিতে ভাতা প্রাপ্তির সুবিধা ভাতাভোগী প্রবীণদের জীবনে এনেছে স্বস্তি

॥ এস এম মজিবুর রহমান ॥
শরীয়তপুর, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১ (বাসস) : বয়সের ভারে নুয়ে পড়া অবসন্ন ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে পেনশন ভোগীদের ভাতা গ্রহণ করা এক সময় ছিলো নৈমিত্তিক ব্যাপার। আবার যারা অসুস্থ হয়ে পড়তেন, তাদের জন্য আরো অসুবিধা। তখন আবার কাউকে অনুমোদনপত্র দিয়ে পাঠাতে হতো। তাতেও হতো নানা ঝামেলা। কিন্তু  ডিজিটালাইজেশনের সুবাদে অবসরে যাওয়া সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের সেই সব কষ্টের দিনের অবসান হয়েছে। সরকারের ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) সফটওয়্যারের  মাধ্যমে এখন ভাতা গ্রহণে হয়রানি বন্ধের পাশাপাশি সাশ্রয় হয়েছে সময় ও অর্থ দুই’ই। 
জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর কার্যালয় সুত্র জানায়, শরীয়তপুর জেলার ৬ উপজেলায় ৩ হাজার ৬৮৫ জন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়মিত ভাতা উত্তোলন করে থাকেন। তাদের এই ভাতা বন্টন ও পরিবেশন করেন জেলা ও উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিস। 
ডিজিটালাইশনের আগে ভাতা গ্রহণের জন্য একজন ভাতাভোগীকে দিনের পর দিন জেলা ও উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ে এসে বসে থাকতে হতো। জনবল সংকটসহ নানা কারণে এসব ভাতাভোগীদের চরম ভোগান্তিসহ আর্থিক জরিমানাও গুনতে হতো। পাশাপাশি প্রবীণ নাগরিকদের শারিরীক কষ্টসহ আর্থিক ব্যয়ও বেড়ে যেতো। সরকারের নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাতা গ্রহণে দীর্ঘদিনের কষ্টের অবসান হলো। 
নড়িয়া উপজেলার ডগরি ইউনিয়নের ১০ নং পাচুখারকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক আলাউদ্দিন আহমেদ ২০০৯ সালে চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। বাসস’র সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, “আগে বাড়ি থেকে ভাতা নেওয়ার জন্য একদিন উপজেলা সদরে যেয়ে হিসাব রক্ষণ অফিসে বই জমা দিতে আসতে হতো। পরে আরেক দিন বই নিয়ে ব্যাংকে গিয়ে টাকা তুলতে হতো। অসুস্থ হলে আবার একজনকে অথারাইজেশন লেটার দিয়ে পাঠাতে হতো।  এতে করে ভাতা থেকে মোটা অংকের একটা অংশ যাতায়াতের পথেই খরচ হয়ে যেতো।”
তিনি ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগ সম্পর্কে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভাতা দেয়ার প্রচলন করে সরকার আমাদের সেই দৌঁড়ঝাপের অবসান ঘটিয়েছে। এখন ঘরে শুয়ে-বসেই ভাতার টাকা ব্যাংকে আসার খবর পেয়ে যাই। নিজের ইচ্ছেমতো সময়ে ব্যাংক থেকে অতি সহজেই টাকা তুলতে পারি। আল্লাহ যেন তাঁকে নেক হায়াত দান করেন ও সুস্থ রাখেন।
ভেদরগঞ্জ উপজেলা সরকারি কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা হাজী দ্বীন মোহাম্মদ সিকদার বলেন, সরকারি কর্মজীবন শেষে অবসরে গিয়ে গত ১২ বছর যাবৎ আমাদের অবসর ভাতা গ্রহণের জন্য উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসে দিনের পর দিন ধর্ণা দিতে হতো। কোনদিন স্যার নাই, আরেক দিন অডিটর আসেনি, আবার কখনো ভাতা বই সমন্বয় হয়নি। আবার ভাতা গ্রহণের বই ব্যাংকে নেওয়ার আগেই অফিসের লোকজনদের ম্যানেজ করতে হতো। এখন ইএফটি’র মাধ্যমে ভাতা প্রদান করায় আমাদের সেই কষ্টের দিন শেষ হয়েছে। আমরা ঘরে বসেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জানতে পারি আমাদের ভাতা ব্যাংকে জমা হয়ে গেছে। যখন ইচ্ছা আমাদের সুবিধামত সময়ে গিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে আনতে পারি। 
শরীয়তপুর সদর উপজেলার অবসরপ্রাপ্ত সেনা বীর মুক্তিযোদ্ধা জানে আলম মুন্সী বলেন, সরকারের দেওয়া অবসর ভাতা নিতে গিয়ে বৃদ্ধ ও প্রবীণ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যে চরম ভোগান্তি পোহাতে হতো ইএফটি কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরে আমাদের সেই সব কষ্টের অবসান হয়েছে। 
শরীয়তপুর জেলা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোঃ মজিবুর রহমান সিকদার জানান, সদর উপজেলায় ৯৯৮ জন, জাজিরা উপজেলায় ৪২৬ জন, নড়িয়া উপজেলায় ৭৬৬ জন, ভেদরগঞ্জ উপজেলায় ৬৮৫ জন, গোসাইরহাট উপজেলায় ৩৫০ জন, ডামুড্যা উপজেলায় ৪৬০ জন অবসরপ্রাপ্তরা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সর্বমোট ৩ হাজার ৬৮৫ জন অবসর ভাতা ভোগী তাদের ভাতা ভোগ করে থাকেন। যাদের অনেকেরই বয়স ৭০ বছরের বেশি। 
জেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের অডিটর ফিরোজ আলম বলেন, ইএফটি’র মাধ্যমে বর্তমানে জেলার সকল ভাতাভোগীদের ভাতা প্রদান করা হয়ে থাকে। এ কাজটি সম্পূর্ণভাবে সম্পাদন করে থাকে জেলা ও উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিস। আর পেনশন ভোগীদের অবস্থা ও অবস্থান নির্ণয়ের জন্য পেনশন এ্যান্ড ফান্ড ম্যানেজমেন্ট দপ্তর ৫-৬ মাস পর পর মৃত ভাতাভোগীদের তালিকা প্রস্তুত করে আমাদের কাছে পাঠিয়ে থাকেন। 
তিনি আরও বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ভাতাভোগীদের পছন্দনীয় ব্যাংকে অবসর ভাতা প্রদান করে থাকেন। অতিতে এই ভাতা বন্টনের জন্য আমাদের ৩টি জায়গায় কাজ করতে হতো। প্রথম অবস্থায় বই জমা নেয়া, ক্রমিক নম্বর দেয়া, এরপর সমন্বয় ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিবীক্ষণ করে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কাছে উপস্থাপন করা। তারপর কর্মকর্তার অনাপত্তি নিয়ে বিল প্রস্তুত করে ব্যাংকে পাঠানো হতো। একজন বয়স্ক প্রবীণ অবসর ভাতাভোগীকে অন্ততঃ ২দিন আমাদের কার্যালয়ে আসতে হতো। বর্তমান ইএফটি শুরু হওয়ার কারণে এসবের প্রয়োজন হয়না। কম্পিউটার থেকে এন্ট্রি দিয়ে জেলা ও উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার অনুমতি পেলেই বিল ব্যাংকে সমন্বয় হয়ে যায়। ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রমের ফলে এখন আর কোন ভাতাভোগীকে আমাদের কাছে আসতে হয়না। তারা মোবাইলে ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে তথ্য পাওয়ার পর পর নিজেদের পছন্দের ব্যাংক থেকে সুবিধামতো সময়ে টাকা তুলতে পারেন।
 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন