শিরোনাম
সংসদ ভবন, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস) : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদসহ বিদেশে পালিয়ে থাকা সব আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আইনের আওতায় আনতে সরকার কোনো ধরনের গাফিলতি করবে না।
তিনি বলেন, ‘সাবেক আইজিপিসহ অতীতের ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া সব পলাতক আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার সংশ্লিষ্ট সব বিদেশি সংস্থার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।’
আজ জাতীয় সংসদে ১৪৭ বিধির আওতায় ঢাকা-১৪ আসনের বিরোধী দলের (জামায়াতে ইসলামী) সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেমের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে উত্থাপিত প্রস্তাবের ওপর আলোচনার জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন।
অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
উভয় পক্ষের আলোচনা শেষে সংসদে প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হয়। পরে স্পিকার এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে তা অবিলম্বে সংসদকে অবহিত করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পলাতক সব আসামিকে শনাক্ত, গ্রেপ্তার এবং দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোল, সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সরকার কাজ করছে।
সাবেক আইজিপিকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তিনি বলেন, তার বর্তমান অবস্থান শনাক্ত করা, প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া, একাধিক পাসপোর্ট রাখার অভিযোগ যাচাই এবং দেশে-বিদেশে থাকা তার সব অবৈধ সম্পদ শনাক্ত ও জব্দ করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, ‘সরকার আইনের শাসন, যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সাবেক আইজিপিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সম্ভাব্য সব ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।’
সাবেক আইজিপিকে প্রত্যর্পণে সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে বিষয়টি পরিচালনার জন্য গত ৩০ জুলাই সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক অন্যতম শীর্ষ আইনজীবী প্রতিষ্ঠান ‘হামদান আল কাবি অ্যাডভোকেটস অ্যান্ড লিগ্যাল কনসালটেন্সি’কে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সেন্ট লুসিয়ায় সাবেক আইজিপির বর্তমান অবস্থান নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, উপযুক্ত সূত্রের মাধ্যমে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, এ সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুমসহ বিভিন্ন ঘটনায় মোট মামলার সংখ্যা ৭ থেকে ৮ হাজারেরও বেশি।
তিনি বলেন, হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ৪৮টি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতনে মৃত্যুর ঘটনা ১৩৩টি।
গুমের বিষয়ে তিনি বলেন, নথিভুক্ত গুমের সংখ্যা ৬৮৪টি। এ ছাড়া ‘মায়ের ডাক’ ও ‘অধিকার’-সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের হিসাবে নিবন্ধিত গুমের সংখ্যা প্রায় ৭০৯টি।
গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনে দাখিল করা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৮৫০ জনকে জোরপূর্বক গুম করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, ওই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় হত্যার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৩০টি এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ২ হাজার ৬৯৩টি। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, বিচারবহির্ভূত মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা ৩ হাজারের বেশি হতে পারে, যার সবগুলো নথিভুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) একটি তথ্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা ২ হাজারের বেশি।
তিনি বলেন, নিহতদের অধিকাংশই সামরিক রাইফেল ও শটগান থেকে ছোড়া প্রাণঘাতী গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান, যা সাধারণত দেশের নিরাপত্তা বাহিনী ব্যবহার করে থাকে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধী দলের সদস্যদের সরকারের সমালোচনা না করে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া সহজ করতে সরকারকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।
আইজিপি বেনজীর ও মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিবাদী সরকারের সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্যাতন ও গুমসহ বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। ইতোমধ্যে মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সাবেক ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মহাপরিচালক ও বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গুম এবং শতাধিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ অভিযোগ গঠন করেছে।
উল্লেখ্য, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গত ১২ জুন দুবাইয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ গ্রেপ্তার করে। পরে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশকে তার গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা একটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টারপোলের সহায়তায় তাকে আটক করা হয়।
গত ১৪ জুন সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে চাইলে গ্রেপ্তারের ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানাতে হবে।
গত ২০ জুন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাবেক আইজিপিকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
তিনি বলেন, ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত পুলিশ বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের পর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ সম্পন্ন করতে বাংলাদেশকে ৩০ দিন সময় দেওয়া হয়েছিল।
তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ১৪৪ পৃষ্ঠার নথিপত্র প্রস্তুত ও অনুবাদ করে মাত্র তিন দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের কাছে পাঠায়।
আলোচনায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান, কুমিল্লা-১১ আসনের সদস্য, বিরোধীদলীয় উপনেতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, সংরক্ষিত নারী আসন-৪৫-এর রোকেয়া বেগম, ফরিদপুর-৪ আসনের এম শাহিদুল ইসলাম, সংরক্ষিত নারী আসন-৩৮-এর মারজিয়া বেগম, পটুয়াখালী-৪ আসনের এ বি এম মোশাররফ হোসেন, সংরক্ষিত নারী আসন-৪৭-এর তাসমিয়া প্রধান এবং রংপুর-৪ আসনের আখতার হোসেন অংশ নেন।