শিরোনাম

সংসদ ভবন, ১৩ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, গভীর সমুদ্রবন্দর চালুর লক্ষ্যে সরকার লজিস্টিক ব্যয় কমানো এবং আমদানি-রপ্তানি পণ্য দ্রুত খালাস নিশ্চিত করতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি একাধিক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
আজ জাতীয় সংসদে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের বিরোধী দলের (জামায়াতে ইসলামী) সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলামের লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোর সীমিত নাব্যতার কারণে অধিকাংশ আমদানি-রপ্তানি পণ্য সিঙ্গাপুর, কলম্বো ও মালয়েশিয়ার মতো আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরের মাধ্যমে ফিডার জাহাজে বাংলাদেশে আনতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত সময় লাগে।
তিনি বলেন, বর্তমানে কর্ণফুলী চ্যানেলের গভীরতা ৮ দশমিক ৫ থেকে ১০ মিটার। এটি একটি প্রাকৃতিক নৌ-চ্যানেল, যার নাব্যতা মূলধনী ও রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বজায় রাখা হচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বোচ্চ ১০ মিটার ড্রাফটের এবং গড়ে প্রায় ৩ হাজার টিইইউ (টুয়েন্টি-ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিটস) ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজ ভিড়তে পারে। তবে এটি জোয়ার-নির্ভর বন্দর হওয়ায় জাহাজের আগমন ও প্রস্থান জোয়ারের ওপর নির্ভরশীল।
আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে সময় ও ব্যয় কমাতে সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ইউরোপ, আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সরাসরি জাহাজ চলাচল (ডাইরেক্ট শিপিং) চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, কনটেইনার খালাস ও সরবরাহ কার্যক্রমের প্রায় ৮০ শতাংশ ইতোমধ্যে ডিজিটালাইজড হয়েছে এবং অবশিষ্ট ২০ শতাংশ ডিজিটালাইজেশনের কাজ চলমান রয়েছে।
মন্ত্রী আরো বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) চুক্তির আওতায় সৌদি আরবভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আরএসজিটি পরিচালনা করছে।
শেখ রবিউল আলম বলেন, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং বে টার্মিনালের নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে। এগুলো চালু হলে ১২ থেকে ১৪ মিটার ড্রাফটের জাহাজ সরাসরি ভিড়তে পারবে, ফলে জাহাজের অপেক্ষার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
তিনি জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের ভেতরে জমে থাকা ১০ হাজারের বেশি টিইইউ অবমুক্ত না হওয়া কনটেইনার কাস্টমসের মাধ্যমে নিলামে বিক্রি এবং সব আমদানিকৃত কনটেইনার বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি/অফডক) দিয়ে সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে বন্দরের জট কমে।
এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে সমন্বয় করে জাহাজ বন্দরে ভিড়ানোর আগেই আমদানি পণ্যের কাস্টমস ছাড়পত্র (প্রি-অ্যারাইভাল কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স) সম্পন্ন করার ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, ‘পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নাধীন এসব উদ্যোগ বন্দরের উৎপাদনশীলতা বাড়াবে এবং কম সময় ও কম ব্যয়ে পণ্য খালাস নিশ্চিত করবে।’
তিনি বলেন, বর্তমানে সমুদ্রবন্দরগুলোর সীমিত গভীরতা ও জোয়ার-নির্ভরতার কারণে বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর, কলম্বো ও মালয়েশিয়ার ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরের ওপর নির্ভর করতে হয়।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, কক্সবাজারে প্রায় ১৬ মিটার গভীর নৌ-চ্যানেল এবং আধুনিক কনটেইনার টার্মিনালসহ এ বন্দর নির্মাণাধীন রয়েছে।
তিনি জানান, ২০২৯ সালে বন্দরটি চালু হওয়ার কথা রয়েছে। চালু হলে এটি প্রায় ৮ হাজার ২০০ টিইইউ ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন কনটেইনার জাহাজ বা প্রায় ১ লাখ ডেডওয়েট টন (ডিডব্লিউটি) ধারণক্ষমতার পণ্যবাহী জাহাজ সরাসরি গ্রহণ করতে পারবে, যা বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা জাহাজের ধারণক্ষমতার প্রায় চার গুণ।
মন্ত্রী বলেন, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে কলম্বো, সিঙ্গাপুর ও পোর্ট ক্লাংয়ের মতো ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এতে পরিবহন সময় ও লজিস্টিক ব্যয় উভয়ই হ্রাস পাবে।
তিনি বলেন, ‘মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। দ্রুত, দক্ষ ও কম ব্যয়ে পণ্য পরিবহন নিশ্চিত হওয়ায় দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে এবং বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।’