বাসস
  ২৯ জুন ২০২৬, ১৬:১১

কর ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ও পাচারকৃত অর্থ ফেরালে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াবে : ডা. শফিকুর রহমান

সংসদে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. মো. শফিকুর রহমান। ফাইল ছবি

সংসদ ভবন, ২৯ জুন, ২০২৬ (বাসস) : জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. মো. শফিকুর রহমান বলেছেন, কর ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা গেলে প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে আজ জাতীয় সংসদে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে সততা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারলে ব্যবসায়ীরা আরো উৎসাহ নিয়ে কর দেবেন। বর্তমানে সৎ করদাতারাই নানা ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

গত ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেন। এতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, যেখানে বিদায়ী অর্থবছরে সাময়িক হিসেবে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সব খাতের জন্য ন্যায়সঙ্গত বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়নি অভিযোগ করে শফিকুর রহমান বলেন, 'যে বাজেট সব খাতকে সমান গুরুত্ব দেবে এবং সমাজের সব অংশীজনকে উপকৃত করবে, সেই বাজেটই গ্রহণযোগ্য ও সফল বাজেট হিসেবে বিবেচিত হবে।'

তিনি বলেন, একটি বাজেট তখনই ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক হয়, যখন দেশের সব মানুষের অধিকার যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়।

বাংলাদেশে ইবতেদায়ি শিক্ষা সাধারণ প্রাথমিক শিক্ষার সমমানের হলেও এ শিক্ষাব্যবস্থার জন্য বাজেটে কোনো বরাদ্দ বা বিশেষ বিবেচনা রাখা হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিরোধী দলের নেতা আরো বলেন, শিক্ষা উন্নয়নের পাশাপাশি কয়েকটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণার দায়িত্ব দিতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবেই থেকে যাবে।

বাজেটের সমালোচনা করে তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে অসাধু ব্যবসায়ীদের একটি অংশ দেশ থেকে ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার করেছে। কিন্তু সেই অর্থ কীভাবে ফেরত আনা হবে, সে বিষয়ে বাজেটে কোনো দিকনির্দেশনা নেই।

তিনি বলেন, 'বাজেট ঘাটতি খুব বেশি নয়। পাচার হওয়া অর্থের মাত্র এক-নবমাংশ উদ্ধার করা গেলেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব। পাশাপাশি অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং এ বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে চাই।'

পাহাড়ি ও অন্যান্য অনগ্রসর ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর উন্নয়নে বাজেটে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এসব জনগোষ্ঠীর অনেকেই এখনো যোগাযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার দিক থেকে বঞ্চিত। তাদের উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে পার্বত্য অঞ্চলে অস্থিরতা কমবে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।

স্বাস্থ্য খাত সম্পর্কে তিনি বলেন, বিদেশি স্বাস্থ্যব্যবস্থার অনুকরণ না করে দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ গবেষণাভিত্তিক স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করতে হবে।

সরকারি হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধেও প্রয়োজনে বেসরকারি হাসপাতালের মতো ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সম্প্রতি আদ-দ্বীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে সরকারের পদক্ষেপের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, হাসপাতালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখানে অধ্যয়নরত প্রায় ৭৫০ জন শিক্ষার্থী ও নার্সের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। হাসপাতাল বন্ধ না করে মানবিক সমাধান খুঁজে বের করার আহ্বান জানান তিনি।

বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়াগামী শ্রমিকদের কাছ থেকে ৮৫ হাজার টাকার পরিবর্তে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা আদায় করছে একটি সিন্ডিকেট উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে পারলে বৈদেশিক কর্মসংস্থান আরো বাড়বে।

দুর্নীতিকে দেশের অন্যতম প্রধান বাধা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুর্নীতি নির্মূলে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বাজেটের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না।

মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার বীরত্বসূচক খেতাবপ্রাপ্ত কিছু মুক্তিযোদ্ধার ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। তবে এ সুবিধা সব মুক্তিযোদ্ধার জন্য প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা প্রসঙ্গে ড. শফিকুর রহমান বলেন, বিরোধী দলের কাজ হলো বাজেটের দুর্বল দিকগুলো তুলে ধরা। আলোচনা ও সমালোচনার মাধ্যমে বাজেট আরো সমৃদ্ধ হয়।

তিনি বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটে বিরোধী দলের একটি কাট-মোশনও গ্রহণ করা হয়নি। অন্তত একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হলে গণতন্ত্রের জন্য তা ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হতো।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবারের বাজেটেও বিরোধী দলের যৌক্তিক প্রস্তাবগুলো সরকার বিবেচনায় নেবে এবং অর্থমন্ত্রী প্রয়োজনীয় সংশোধনীসহ তা সংসদে উপস্থাপন করবেন।

জনগণের অর্থের অপচয় কমাতে তিনি অর্থবছরকে জানুয়ারি-ডিসেম্বর ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, বর্তমানে অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে মোট বরাদ্দের ৪২ শতাংশ এবং শেষ দুই মাসে বাকি অর্থ ছাড় হওয়ায় দুর্নীতি ও অপচয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

বক্তৃতার শুরুতে বিরোধীদলীয় নেতা স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানী, মহান মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদ এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।