বাসস
  ২৮ জুন ২০২৬, ২৩:১৯

বাজেটের প্রশংসায় বিএনপি, ‘সংস্কার ছাড়া বাস্তবায়নযোগ্য নয়’-দাবি বিরোধী দলের

ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

সংসদ ভবন, ২৮ জুন, ২০২৬ (বাসস) : সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, বিরোধী দল বলেছে, জুলাই সনদ অনুযায়ী রাজনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়ন ছাড়া এই বাজেট কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

সরকারি দলের সদস্যরা বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট মানবসম্পদ উন্নয়ন, জনকল্যাণ ও অর্থনৈতিক সংস্কারে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে। তবে বিরোধী দলের অভিযোগ, জুলাই সনদে স্বাক্ষর করলেও সরকার সেখানে উল্লিখিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করেনি।

আজ জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা এসব কথা বলেন।

গত ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেন। এতে আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, যেখানে বিদায়ী অর্থবছরে প্রাথমিক হিসাবে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অর্থমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বাজেটে গৃহীত পরিকল্পনার সুফল তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান না হলেও আগামী ছয় মাসের মধ্যে এর ইতিবাচক প্রভাব দেশবাসী দেখতে পাবে।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, অত্যন্ত সংকটময় সময়ে এ বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশ- এ সংকট কাটিয়ে উঠবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, বিএনপি সবসময় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে এবং এবারও করবে। অর্থমন্ত্রীও একটি বড় চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন এবং তিনি সফলভাবে বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।

বিরোধী দলের সমালোচনা করে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী এখনো ১৯৭১ সালে তাদের ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চায়নি। জনগণের কাছে ক্ষমা চাইলে তাদের জন্য রাজনীতি আরও সহজ হবে।

বিরোধী দলের চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই সনদের অন্যতম স্বাক্ষরকারী দল হওয়া সত্ত্বেও বিএনপি সরকার এখন পর্যন্ত কোনো সংস্কার বাস্তবায়ন করেনি। ফলে বাজেটে দেওয়া প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়িত হবে-এমন বিশ্বাস করার কারণ নেই।

তিনি দুর্নীতি বন্ধ, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং অর্থপাচারে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানান, যাতে বাজেট সফলভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে।

পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, সরকার ফারাক্কা ব্যারাজ থেকে বাংলাদেশের ন্যায্য পানির হিস্যা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।

তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি বিশেষ কারিগরি কমিটি এ বিষয়ে কাজ করছে। একই সঙ্গে পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প ইতোমধ্যে একনেকে অনুমোদিত হয়েছে। প্রথম ধাপে ১৯ জেলার ১২০টি উপজেলা উপকৃত হবে। প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে ২৬ জেলার ১৬৩টি উপজেলার প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ এর সুফল পাবে।

তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, চলতি বছরের মধ্যেই এ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে। এটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের অন্তত পাঁচটি জেলার কৃষি, সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ওষুধ শিল্পের ৭৭টি কাঁচামালের ওপর শুল্ক কমানো ও অব্যাহতির প্রস্তাব মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে সহায়ক হবে।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, সরকার সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দও বাড়ানো হয়েছে।

তিনি জানান, বর্তমানে দেশের মানুষ চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ নিজ পকেট থেকে বহন করেন। তুলনামূলকভাবে থাইল্যান্ডে এই হার ১০ শতাংশ এবং মালদ্বীপে ১৮ শতাংশ।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, জ্বালানি খাতকে স্বনির্ভর করতে আগামী বাজেটে ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় বেশি। নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, বর্তমান সরকার জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ হার ছিল ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ।

শিল্প, বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, দেশের অর্থনীতি এখন নিরাপদ হাতে রয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাবে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, বাজেট সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে মানুষের জীবনমান উন্নত হবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, বর্তমান সংসদে সরকার ও বিরোধী দল পারস্পরিক শ্রদ্ধার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা ভবিষ্যতের জন্য অনুসরণীয়।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, বাজেটে ব্যয় কাঠামো নতুনভাবে বিন্যাস করা হয়েছে। সামাজিক অবকাঠামোয় ৩০ শতাংশ, ভৌত অবকাঠামোয় ১৮ শতাংশ এবং সাধারণ সেবায় ২৬ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

তিনি জানান, পরিচালন ব্যয় ৭২ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশে নামানো হয়েছে এবং উন্নয়ন ব্যয় ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ করা হয়েছে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদ বলেন, বাজেটে সড়ক ও মহাসড়ক খাতে ৩৬ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে উন্নয়ন ব্যয়ে ব্যয় হবে ৩০ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা।

তিনি জানান, বর্তমানে দেশে ১০৬টি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। ভবিষ্যতে ৩ হাজার কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হবে এবং রাজধানীর যানজট নিরসনে মেট্রোরেলের পাশাপাশি মনোরেলও নির্মাণ করা হবে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বাজেটকে নারীবান্ধব আখ্যা দিয়ে বলেন, এতে নারীর ক্ষমতায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমীন বলেন, সমাজকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে এসব সুবিধা যাতে প্রকৃত তৃণমূল মানুষের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেন, ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং দেশের উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়েই এ বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, এ বাজেট একটি আত্মনির্ভরশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে সহায়ক হবে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, এ বাজেট প্রাথমিক শিক্ষার সামগ্রিক চিত্র বদলে দেবে।

প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাসহ ১০টি গুরুত্বপূর্ণ খাতে সরকারের অগ্রাধিকার প্রশংসনীয়।

সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট দেশের মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, জাতীয় ঐকমত্য বজায় থাকলে জুলাইয়ের চেতনা অক্ষুণ্ন থাকবে এবং কোনো অপশক্তি দেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে না।

বাজেট আলোচনায় সরকারি দলের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরের সফলতার জন্যও তাকে অভিনন্দন জানান।

এছাড়া আলোচনায় অংশ নেন সমাজকল্যাণ ও মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান, সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, কুমিল্লা-১ আসনের সংসদ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, ঢাকা-২ আসনের সংসদ সদস্য আমানউল্লাহ আমান, নোয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য এ এম মাহবুব উদ্দিন, হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপু, রাকিবুল ইসলাম, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু এবং বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান (রাজশাহী-২) ও এটিএম আজহারুল ইসলাম (রংপুর-২)।