বাসস
  ২৮ জুন ২০২৬, ১৮:২৮

প্রযুক্তিনির্ভর ও আনন্দমুখর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য : শিক্ষামন্ত্রী

ছবি : ভিডিও থেকে নেওয়া

সংসদ ভবন, ২৮ জুন, ২০২৬ (বাসস) : শিক্ষামন্ত্রী ড. আ. ন. ম. এহছানুল হক মিলন বলেছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষাখাত সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দক্ষ, মানবিক ও প্রযুক্তিনির্ভর নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ শিক্ষা বাজেট ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ডিজিটাল রূপান্তর এবং বৈষম্যহীন শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে একাধিক যুগান্তকারী কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

বক্তব্যের শুরুতেই শিক্ষামন্ত্রী বান্দরবানের দুর্গম থানচি উপজেলার তিন্দু এলাকার এক ব্যতিক্রমী প্রধান শিক্ষক বাম খিয়াং ম্ল্যাংকের সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৫৬ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। অধিকাংশ শিক্ষার্থীর পরিবার দরিদ্র হওয়ায় নিয়মিত বেতন দিতে না পারায় বিদ্যালয় পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যালয়টি টিকিয়ে রাখতে প্রধান শিক্ষক নিজেই ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালিয়ে পর্যটক পরিবহন করেন। সেই আয় থেকে প্রায় ৩০ হাজার টাকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য ব্যয় করেন।

মন্ত্রী বলেন, বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নজরে এসেছে এবং তিনি ইতোমধ্যেই ওই বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের নির্দেশ দিয়েছেন। সংসদেই প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তের বার্তা তিনি তুলে ধরেন।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এবারের বাজেটে শিক্ষাখাতে জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ। তিনি জানান, শিক্ষা খাতে মোট ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে শিক্ষা-সম্পর্কিত আরো অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়কেও শিক্ষা উন্নয়নে ১০৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি করা।

শিক্ষামন্ত্রী জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এর আওতায় প্রতিটি শিক্ষককে ট্যাব সরবরাহ করা হবে এবং এর মাধ্যমে ২৫ হাজার মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ গড়ে তোলা হবে। এতে শিক্ষকরা ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহার করে পাঠদান করতে পারবেন এবং শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ কর্মসূচির মাধ্যমে পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা থেকে বেরিয়ে আনন্দময় শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। এ লক্ষ্যে ৩০ হাজার শিক্ষককে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে আরো ২০ হাজার মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রী জানান, দেশের ৫০ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম (জিআইএস) ম্যাপিং করা হবে, যাতে সামাজিক ও ভৌগোলিক বৈষম্য চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা যায়। এছাড়া ১৫ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য ইউনিক এডুকেশন আইডি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে মত দেন, জন্মের পর থেকেই যদি জাতীয় পরিচয়ভিত্তিক একটি স্থায়ী পরিচয় নম্বর চালু থাকত, তাহলে আলাদা শিক্ষা আইডির প্রয়োজন হতো না।

পরিবেশ সংরক্ষণে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করতে ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীর মাধ্যমে বছরে অন্তত একটি করে গাছ লাগানোর কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী সক্ষমতা তুলে ধরতে চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে স্টার্টআপ ইনোভেশন শোকেস আয়োজন করা হচ্ছে। সেখানে দেশের তরুণদের নতুন নতুন উদ্ভাবন প্রদর্শিত হবে।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সরকার শুধু পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক শিক্ষা নয়, সহশিক্ষা কার্যক্রমেও গুরুত্ব দিচ্ছে। অলিম্পিয়াড, বিতর্ক, স্কাউট, বিএনসিসি ও গার্লস গাইড কার্যক্রম আরো সম্প্রসারণ করা হবে। আগামী বছর থেকে সারাদেশে ২৪ হাজার নতুন বিএনসিসি ইউনিট গঠনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্রাথমিক পর্যায়ে খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা এবং পরে উপবৃত্তি কর্মসূচি চালু করেছিলেন। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত উপবৃত্তির সেই ধারাবাহিকতাকে আরো সম্প্রসারণ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত উপবৃত্তি চালুর ঘোষণা দিয়েছেন।

উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গ তুলে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরে শিক্ষা খাতে একাধিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিশেষ করে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (টিভিইটি)-কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে দেশের বিপুল জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়।

তিনি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা থেকেই শিক্ষার্থীদের ক্রীড়া, সংস্কৃতি, পারিবারিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা, ধর্মীয় শিক্ষা এবং প্রযুক্তিগত শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই বিতর্ক, কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

মন্ত্রী আরো জানান, বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুদের জন্য উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ড্রেস, জুতা-মোজা, ব্যাগ সরবরাহ এবং অপুষ্টি দূর করতে ধাপে ধাপে মিড-ডে মিল কর্মসূচি সারা দেশে চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রী জানান, পূর্ববর্তী সরকারের নিয়োগ দেওয়া প্রায় ১৭ হাজার মাদ্রাসা শিক্ষকের বেতনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না থাকায় সাময়িক জটিলতা তৈরি হয়েছিল। তবে অর্থমন্ত্রী দ্রুত ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন এবং আগামী জুলাই মাসে বাকি অর্থও দেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

তিনি আরো বলেন, ২০২২ সাল থেকে অবসর নেওয়া বহু শিক্ষক এখনও অবসর ভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থ পাননি। এ সমস্যা সমাধানে অর্থমন্ত্রী ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন বলে তিনি জানান।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সরকার এমন একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও মানবিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে প্রতিটি শিশুর মেধা বিকাশ, দক্ষতা অর্জন এবং মূল্যবোধের চর্চা সমানভাবে নিশ্চিত হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রস্তাবিত শিক্ষা বাজেট বাস্তবায়িত হলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি নতুন যুগের সূচনা হবে।