বাসস
  ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:১৫

‘অকল্পনীয়’ দুর্যোগে নেপালে প্রাণহানি বাড়ছে

ঢাকা, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস): চীন-নেপাল সীমান্ত থেকে সুনামির মতো ধেয়ে আসা হিমবাহের বন্যায় সৃষ্ট ‘অকল্পনীয়’ দুর্যোগের ষষ্ঠ দিনেও সোমবার কাদা ও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। 

এদিকে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৪ হাজার ৫০০-তে দাঁড়িয়েছে।

খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।

সর্বশেষ হিসাবে জানা গেছে, মৃতের সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়েছে। ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের পর শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি— এমন কিছু লাশ গণকবরে দাফন করা হয়েছে।

বুধবার হিমবাহ থেকে নেমে আসা বরফশীতল পানি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল ঢলে নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে অন্তত ৯৩৯ জন নিহত হয়েছেন। 
এছাড়া ভারতের ভাটির দিকে প্রবাহিত নদীগুলো থেকে আরও অন্তত ১৭টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

রাসুয়া জেলার এক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী শিবু গিরি নিজেকে বেঁচে যাওয়ার জন্য নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছেন।

৪৪ বছর বয়সী গিরি এএফপিকে বলেন, একটি হেলিকপ্টারের উদ্ধারকারী দল তাকে ‘তিনবার উদ্ধারের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কোমর পর্যন্ত কাদায় আটকে থাকায়’ তারা তাকে বের করতে পারেনি।

তিনি আরও বলেন, ‘আমি তাদের পানি ও খাবার ফেলে দিতে বলেছিলাম।’ 
পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ রোববার এই দুর্যোগকে ‘অকল্পনীয় ও হৃদয়বিদারক’ বলে বর্ণনা করেন।

চিতওয়ান জেলায় সেনাসদস্যরা রাবারের নৌকা থেকে নেমে নদীর পাড় বেয়ে নীল ব্যাগে রাখা লাশগুলো তুলে আনেন। পরে মাটির রাস্তার পাশে লাশগুলোকে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়।

এদিকে বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। একাধিক সুড়ঙ্গে আটকে পড়া প্রায় ১০০ জন জলবিদ্যুৎ কর্মীকে উদ্ধারে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ সরাতে খনন, ড্রিলিং ও বিস্ফোরণ ব্যবহার করা হচ্ছে।

এখন পর্যন্ত দুটি সুড়ঙ্গ থেকে তিনটি লাশ দ্ধার করা হয়েছে। তবে উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন, সুড়ঙ্গের ভেতরের পথ কাদায় বন্ধ হয়ে গেছে।

বিশেষায়িত সুড়ঙ্গ উদ্ধারকারী দলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ভারতীয় সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, উদ্ধারকারীরা ‘কাদামিশ্রিত পলির স্তর’ ভেদ করে এগোচ্ছেন। 
তিনি এএফপিকে বলেন, ভেতরে কেউ বেঁচে থাকতে পারেন— এ বিষয়ে তিনি ‘এখনো আশাবাদী’।

নেপালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে ২০ হাজার ৬০০ জনকে মোতায়েন করা হয়েছে। দুর্যোগ কবলিত এলাকা থেকে এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে।

সোমবার নেপালের নুওয়াকোট ও রাসুয়া জেলায় হেলিকপ্টার থেকে উদ্ধার করা লাশ নামাতে দেখা যায় সেনা সদস্যদের।

তবে এই ভয়াবহতার মধ্যেও মিলেছে কিছুটা আশার খবর। শুক্রবার কাদা থেকে উদ্ধার করা ছয় বছর বয়সী এক শিশুকে। শিশুটিকে পরে তার বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। 

নেপাল সশস্ত্র পুলিশের মুখপাত্র নেত্র বাহাদুর কার্কি এএফপিকে বলেন, ‘শিশুটির শরীর কাদায় আটকে ছিল, তবে মাথাটি কাদার বাইরে ছিল।’

তিনি জানান, শিশুটি এখন ‘বিপদমুক্ত এবং হাসপাতালে সুস্থ হয়ে উঠছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, একটি হিমবাহ ধসে এই দুর্যোগের সূত্রপাত হয়।

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ গলে যাওয়ায় এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেন, ‘পরিবর্তনশীল জলবায়ু ও এর প্রভাবের বড় ভুক্তভোগীদের মধ্যে নেপালের মানুষ অন্যতম।’

বিজ্ঞানীরা বলছেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতমালা হিমালয় দ্রুত গলছে।

পুরো জনপদ ভেসে যাওয়ায় এখন ত্রাণ ও সহায়তার প্রয়োজন ব্যাপক।

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের কর্মকর্তা আবিওদুন বানিরে এএফপিকে বলেন, ‘এটি একটি চলমান বিপর্যয়।’ 
তিনি আরও বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত হাজার হাজার মানুষের চাহিদা ব্যাপক।

বন্যার পানিতে সড়ক ভেসে গেছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস হয়েছে ও বহু সেতু ভেঙে পড়েছে।

মর্গগুলোতে লাশ রাখার জায়গা না থাকায় উদ্ধার করা শত শত লাশের কিছু দাফন শুরু করেছে নেপাল। তবে এর আগে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে, যাতে পরে পরিবারের সদস্যরা তাদের স্বজনদের শনাক্ত করে লাশ নিয়ে যেতে পারেন।

চিতওয়ান জেলায় শোকাহত স্বজনরা কয়েকটি লাশের শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছেন। অন্যদিকে দেবীঘাটের মতো নদীতীরবর্তী গ্রামগুলোতে বেঁচে যাওয়া মানুষ ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িঘর থেকে অবশিষ্ট জিনিসপত্র উদ্ধারের চেষ্টা করছেন।

লাশ সংরক্ষণের জন্য ‘এক হাজারের বেশি’ ফ্রিজার ইউনিট প্রয়োজন বলে আন্তর্জাতিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছে কাঠমান্ডু।

স্বজন হারানো পরিবারগুলো কমিউনিটি সেন্টারে পর্দায় লাশের ছবি দেখছেন ও নিখোঁজ প্রিয়জনদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন।