শিরোনাম

ঢাকা, ৩০ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস): আলিয়া আল-হাল্লাকের ছেলে মোহাম্মদকে গত বছরের অক্টোবরে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর গুলিতে হত্যার সময় তার বয়স ছিল মাত্র নয় বছর। কিন্তু এই ফিলিস্তিনি গৃহিণী এখনো নিজেকে চার সন্তানের মা নয়, বরং পাঁচ সন্তানের মা হিসেবেই পরিচয় দেন।
তিনি বলেন, ‘আমি এখনো এই শোক মেনে নিতে পারিনি। প্রায়ই বাড়ির উঠানে বসে নিচে মোহাম্মদের কবরের দিকে তাকিয়ে কাঁদি। তবে খেয়াল রাখি, আমার সন্তানরা যেন আমাকে কাঁদতে না দেখে।’
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
তিনি জানান, অধিকৃত পশ্চিম তীরের দক্ষিণাঞ্চলের আল-রিহিয়া গ্রামে টহলরত ইসরাইলি সেনাদের দেখে পালানোর সময় মোহাম্মদ গুলিবিদ্ধ হয়।
মোহাম্মদের চাচা মোহাম্মদ হাল্লাক বলেন, সেনাবাহিনীর একটি টহল দলের সঙ্গে কয়েকজন কিশোরের সংঘর্ষের সময় ছোড়া একটি গুলি মোহাম্মদের শরীরে লাগে।
জরুরি সেবাদানকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গুলিটি মোহাম্মদের পেট ভেদ করে বেরিয়ে যায়।
তার মা বলেন, ‘মোহাম্মদের মৃত্যু যেন সবকিছু শেষ করে দিয়েছে।’
মোহাম্মদের মৃত্যুর বিষয়ে মন্তব্য জানতে এএফপি ইসরাইলি সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানায়, আল-রিহিয়ায় দায়িত্ব পালনকালে একটি সংঘর্ষের সময় সেনারা গুলি চালিয়েছিল।
সেনাবাহিনী তখন বলেছিল, ‘পাথর নিক্ষেপে জড়িত সন্দেহভাজনদের লক্ষ্য করে সেনারা গুলি চালায়। গুলিতে আঘাতের ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে।’ কাউকে গুলি করে আহত বা নিহত করার ঘটনা বোঝাতে ইসরাইলি সেনাবাহিনী সাধারণত এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করে।
গাজা যুদ্ধ শুরুর পর বেড়েছে নিহতের সংখ্যা
গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বাহিনীর হাতে ফিলিস্তিনি শিশু ও কিশোর-কিশোরী নিহত হওয়ার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ইসরাইলি মানবাধিকার সংগঠন বি’তসেলেমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বাহিনীর হাতে ২৩৫ জন ফিলিস্তিনি শিশু ও কিশোর-কিশোরী নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে পাঁচজন ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারীদের হাতে নিহত হয়েছে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা উপত্যকা থেকে হামাস ইসরাইলে বড় ধরনের হামলা চালানোর পর থেকেই ওই সংঘাত শুরু হয়।
অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি সরকারের একটি প্রতিষ্ঠান ‘কলোনাইজেশন অ্যান্ড ওয়াল রেজিস্ট্যান্স কমিশন’ একই সময়ে নিহতের সংখ্যা ২৫০ জন বলে জানিয়েছে।
বি’তসেলেমের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১৭ বছরে ইসরাইলি বাহিনীর হাতে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় একজন ফিলিস্তিনি শিশু বা কিশোর নিহত হয়েছে।
অন্যদিকে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে একই সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী প্রতি মাসে নিহতের গড় সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাতজনে।
পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় গুলি
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর সন্তান হারানো ১২ জন নারীর সঙ্গে কথা বলেছে এএফপি। প্রতিটি ঘটনার বিবরণ আলাদা হলেও তারা সবাই বলেছেন, সন্তান হারানোর পর তাদের পারিবারিক জীবন যেন হঠাৎ থেমে গেছে। একই সঙ্গে তারা জবাবদিহির অভাবের কথাও জানিয়েছেন।
বি’তসেলেমের হিসাবে, গত বছর ইসরাইলি বাহিনীর হাতে নিহত ৫৪ ফিলিস্তিনি শিশু ও কিশোর-কিশোরীর মধ্যে সবচেয়ে ছোটটির বয়স ছিল মাত্র দুই বছর। নিহতদের বেশিরভাগের বয়স ছিল ১৪ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে।
ইসরাইলি বাহিনী যখন পাথর নিক্ষেপকারী ফিলিস্তিনি তরুণদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়, তখন প্রায়ই এসব কিশোরকে সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বাহিনীর কমান্ডার মেজর জেনারেল আভি ব্লুথ ২০২৬ সালের শুরুতে জানান, ২০২৫ সালে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় সেনাবাহিনী ৪২ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। তবে নিহতদের মধ্যে কতজন অপ্রাপ্তবয়স্ক, তা তিনি জানাননি।
তবে মোহাম্মদের মতো আরও কয়েকটি ঘটনায়Ñবিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি, ইসরাইলি সেনারা নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে এবং ঘটনাস্থলে থাকা শিশুরাও এতে নিহত হয়েছে।
এরকমই একটি ঘটনায় চলতি বছরের জুনে পশ্চিম তীরের হেবরন শহরে ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে নিহত হয় সাত মাস বয়সী সাম আবু হাইকেল। তার মুখে গুলি লাগে।
‘ফিলিস্তিনিরা ন্যায়বিচার পায় না’
সামের মা ২৮ বছর বয়সী দানিয়া আবু হাইকেল এএফপিকে জানান, সাম যখন তার কোলে ছিল, তখন ইসরাইলি সেনারা তাদের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এতে তিনিও আহত হন। একটি গুলি তার গাল ভেদ করে কান দিয়ে বেরিয়ে যায়।
বেথলেহেমে নিজের বাড়িতে এএফপির সঙ্গে কথা বলার সময় তার মুখে গুলির বড় ক্ষতচিহ্ন দেখা যাচ্ছিল। সে সময় তিনি তার ছেলের একটি খেলনা শিয়াল হাতে ধরে ছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবু হাইকেল বলেন, ‘শিশুকে কেন গুলি করবে? মাত্র সাত মাসের একটি ছোট্ট শিশু সেনাদের এমন কী ক্ষতি করেছিল যে তাকে গুলি করতে হলো?’
ঘটনার প্রাথমিক তদন্তের পর ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানায়, তাদের এক সেনা ‘ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন এমন বেসামরিক নাগরিকদের’ লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিলেন। সেনাবাহিনীর দাবি, ওই বেসামরিক নাগরিকদের গাড়িটি সেনাদের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার পর ওই সেনা গুলি চালান।
তবে আবু হাইকেল সেনাবাহিনীর এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে বলেন, সেনারা গুলি চালানোর আগেই তার স্বামী গাড়িটি থামিয়ে দিয়েছিলেন।
একমাত্র সন্তানকে হারানোর মানসিক যন্ত্রণার সঙ্গে গুলিতে আহত হওয়ার শারীরিক কষ্টও বয়ে বেড়াচ্ছেন দানিয়া।
তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিদিন কাঁদি। এখন তাকে ছাড়া আমার জীবন শূন্য লাগে।’
এএফপির সঙ্গে কথা বলা অন্য মায়েদের মতো দানিয়াও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবিতে একজন আইনজীবীর সহায়তা নিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘ইসরাইলিদের হাতে নিহত হওয়ার ঘটনায় ফিলিস্তিনিরা ন্যায়বিচার পায় না। তবু আমরা আশা করি, এবার আমরা ন্যায়বিচার পাব।’