শিরোনাম

ঢাকা, ২১ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ ও আশপাশের এলাকায় রাতভর রাশিয়ার হামলায় অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছে।
এ হামলার পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মস্কোর চলমান ‘উত্তেজনা বৃদ্ধির’ বিরুদ্ধে বিশ্বকে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
ভোরে কিয়েভে উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালাচ্ছিলেন। রাশিয়ার হামলায় একটি শিশু হাসপাতালও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি আবাসিক ভবন থেকে দুইজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মরদেহ উদ্ধারের সময় স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
৪৫ বছর বয়সী বাসিন্দা মারিয়া আব্রামোভা বলেন, ‘এখানে আগে একটি ভবন ছিল, এখন সেটি আর নেই।’
বিমান হামলার সতর্কসংকেত শুনে তিনি সন্তানদের ঘরে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরই বিস্ফোরণ শুরু হয়। বিস্ফোরণে তার ঘরের জানালা উড়ে যায় এবং তার স্বামী অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।
রাশিয়া কিয়েভে ক্রমেই ব্যাপক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র ঘণ্টায় হাজার হাজার কিলোমিটার গতিতে ছুটতে পারে এবং সতর্কসংকেত দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই রাজধানীতে পৌঁছে যায়।
বুধবার গভীর রাতে সরকারি সতর্কবার্তা জারির তিন মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে কিয়েভে প্রথম বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। ফলে সাধারণ মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য তেমন কোনো সময়ই ছিল না।
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে কিয়েভের সক্ষমতা সীমিত। এগুলো কার্যকরভাবে ঠেকাতে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন।
রাশিয়ার হামলা বাড়তে থাকায় ইউক্রেন বারবার মিত্র দেশগুলোর কাছে আরও প্রতিরক্ষা সহায়তা চেয়ে আসছে। ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনীর তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী এএফপি জানায়, জুলাইয়ে রাশিয়া রেকর্ডসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
জেলেনস্কি সন্ধ্যায় এক ভাষণে বলেন, ‘আমাদের প্যাট্রিয়টের জন্য ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন—যা শুধু আমাদের অংশীদাররাই দিতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে।
কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো জানান, রাজধানীতে ১৫ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া কিয়েভ অঞ্চলে আরও এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন।
কিয়েভের বাইরে বোরিসপিল এলাকায় কয়েকটি গুদামও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
রাজধানীতে হামলা প্রায় নয় ঘণ্টা ধরে চলে। কয়েক দিন ধরেই কিয়েভের বাসিন্দারা সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় ছিলেন।
জেলেনস্কি বলেন, ‘এটি ছিল ব্যাপক হামলা। রাশিয়া দীর্ঘ সময় ধরে এর প্রস্তুতি নিয়েছে এবং বিভিন্ন ধরনের ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ড্রোন হামলা করেছে।’
ইউক্রেনের বিমান বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া অন্তত ৪৪টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এর মধ্যে ৩৯টি ভূপাতিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে মস্কো জানিয়েছে, তারা কিয়েভ ও এর আশপাশে সামরিক-শিল্প স্থাপনা, একটি পরিবহন ও লজিস্টিক কেন্দ্র এবং গুদামগুলোতে হামলা চালিয়েছে।
পোল্যান্ড, রোমানিয়া ও মলদোভায়ও সতর্কতা
রুশ হামলার প্রভাবে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। এর মধ্যে ন্যাটোর সদস্য পোল্যান্ড ও রোমানিয়া রয়েছে।
পোল্যান্ডের সামরিক কমান্ড জানায়, তারা বিমান মোতায়েন এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করেছে। বিশেষ করে ইউক্রেন সীমান্তসংলগ্ন এলাকাগুলো সুরক্ষায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
রোমানিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাতে ইউক্রেন সীমান্তের কাছে তাদের রাডারে কয়েকটি আকাশযান শনাক্ত হয়। এরপর ন্যাটোর মিশনে থাকা দুটি স্প্যানিশ যুদ্ধবিমান এবং রোমানিয়ার বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারকে আকাশে পাঠানো হয়।
মন্ত্রণালয় আরও জানায়, একটি ড্রোন গালাতি এলাকার কাছে রোমানিয়ার আকাশসীমায় প্রবেশ করে এবং ইউক্রেন সীমান্তের কাছাকাছি তুলচিয়া এলাকায় জনবসতিহীন স্থানে বিধ্বস্ত হয়।
মলদোভাও জানিয়েছে, রাশিয়া ব্যবহৃত শাহেদ ধরনের একটি ড্রোন তাদের ভূখণ্ডে বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে ইউক্রেন সীমান্তের কাছে আগুন ধরে যায়।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রতিবেশী দেশগুলোর আকাশসীমায় এ ধরনের অনুপ্রবেশের ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে।
অন্যদিকে রাশিয়া দাবি করেছে, রাতভর ইউক্রেন থেকে নিক্ষেপ করা ৭২৬টি ড্রোন তারা ভূপাতিত করেছে।
যুদ্ধ থামাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ
কিয়েভ প্রায় প্রতি রাতেই রুশ হামলার মুখে পড়ছে। এদিকে ইউক্রেনও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়ার ভেতরে পাল্টা হামলা বাড়িয়েছে। এর একটি উদ্দেশ্য হলো মস্কোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এই সংঘাতের অবসান ঘটানো।
তবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখনো দুই পক্ষকে কোনো চুক্তির কাছাকাছি আনতে পারেনি।
রাশিয়া ইউক্রেনের কাছে বিস্তৃত ভূখণ্ডগত ও রাজনৈতিক ছাড় দাবি করছে। জেলেনস্কি এসব শর্ত মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তার মতে, এতে কার্যত ইউক্রেনকে আত্মসমর্পণ করতে হবে এবং ভবিষ্যতে আবার রুশ হামলার মুখে দেশটি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে।