বাসস
  ০৪ জুলাই ২০২৬, ১৯:৩২

খরায় পুড়ছে ইউরোপের ধানের ভাণ্ডার, খুঁজছে বাঁচার পথ

ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা, ৪ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : গ্রীষ্ম এবার যেন সময়ের আগেই এসে হাজির হয়েছে ইউরোপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধান উৎপাদন অঞ্চলে। ইতালির পাভিয়া প্রদেশে তীব্র খরার কারণে শুকিয়ে যাওয়া ধানক্ষেতে এখন আগাছাই দখল নিচ্ছে জমি।

ইতালির তোরে বেরেত্তি থেকে এএফপি জানায়, ২২ বছর বয়সী শারন আঙ্গোলি নিজের শুকিয়ে যাওয়া একটি ধানক্ষেতের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘এ জমির আর কিছুই হওয়ার নয়, এরপর যা-ই ঘটুক না কেন।’

জুন মাসে ইউরোপজুড়ে আঘাত হানা ভয়াবহ তাপপ্রবাহে তার এই জমি প্রায় পুড়ে গেছে।

তিনি বলেন, গ্রীষ্মের বাকি সময়জুড়ে প্রচুর বৃষ্টি হলেও এ ফসল আর বাঁচবে না। মিলান থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণে তোরে বেরেত্তিতে তাদের সেপ্টেম্বরে কাটার কথা থাকা অন্য ধানক্ষেতগুলো নিয়েও শঙ্কায় রয়েছেন তিনি ও তার বাবা কার্লো আঙ্গোলি।

কার্লো বলেন, ‘আমাদের অন্তত ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি দরকার, তবে শিলাবৃষ্টি ছাড়া।’

হাসতে হাসতে তিনি যোগ করেন, ‘অথবা সেপ্টেম্বরে বড় ধরনের শিলাবৃষ্টি হোক, তাহলে অন্তত বিমার টাকা পাব।’

পাভিয়া ইতালির ধান উৎপাদনের কেন্দ্রস্থল। প্রতি বছর এ প্রদেশে প্রায় ৫০ লাখ টন ধান উৎপাদিত হয়।

কিন্তু এ বছর বসন্তে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয়নি। ফলে ধানচাষিরা চরম হতাশায় রয়েছেন।

সংকটে নদীগুলো

আল্পস পর্বতমালা থেকে অ্যাড্রিয়াটিক সাগর পর্যন্ত উত্তর ইতালির বেশ কয়েকটি নদী ভয়াবহ খরার কারণে ‘সংকটাপন্ন অবস্থায়’ রয়েছে বলে শুক্রবার সতর্ক করেছে পো নদী কর্তৃপক্ষ (এডিবিপিও)।

পো নদী ও এর শাখা নদীগুলোতে পানি সরবরাহ বজায় রাখতে বিভিন্ন হ্রদের পানি ছাড়তে হচ্ছে। তবে বর্তমান হারে পানি ছাড়তে থাকলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই মজুত শেষ হয়ে যাবে।

অ্যাপেনাইন পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত পাভিয়া সাধারণত প্রচুর বৃষ্টিপাতের জন্য পরিচিত। বছরের এ সময় ধানক্ষেতগুলো থাকার কথা সবুজে ভরা।

কিন্তু এখন তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ায় শ্যারন অ্যাঙ্গোলিকে সেচ সীমিত করতে হচ্ছে। অন্য কৃষকদের মতো তিনিও আশঙ্কা করছেন, ২০২২ সালের ভয়াবহ খরার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।

সুশির জন্য ব্যবহৃত বিশেষ জাতের ধান উৎপাদনের একটি জমিতে পানি দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে সেখানে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে আগাছা।

সাম্প্রতিক কয়েক দিনের বৃষ্টিতে কিছুটা তাপমাত্রা কমলেও আগামী দুই সপ্তাহে আবার তাপমাত্রা বাড়বে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। কার্লো অ্যাঙ্গোলির ভাষায়, তখন আবহাওয়া হবে ‘সমুদ্রসৈকতে যাওয়ার জন্য আদর্শ’।

৫৫ বছর বয়সী প্রতিবেশী নিকোলা ভালদি বলেন, ‘স্বাভাবিক বছরে চারদিকে পানি থাকত।’

তিনি জানান, এ সময় জমিতে পানি থাকা ধানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে ধান গাছ অতিরিক্ত বিষাক্ত ক্যাডমিয়াম শোষণ করা থেকেও সুরক্ষিত থাকে।

একটি শুকিয়ে যাওয়া ধানের শীষ দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘একটি সুস্থ গাছে ৭০ থেকে ৮০টি ধান হওয়ার কথা। কিন্তু এটিতে হবে মাত্র ১০টি।’

পানির জন্য দ্বন্দ্ব

পানির সংকটকে কেন্দ্র করে কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভও বাড়ছে।

পাভিয়াসহ লোম্বার্দিয়া অঞ্চলের কৃষকদের অভিযোগ, প্রতিবেশী পিয়েমন্ত অঞ্চলের কৃষকেরা অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করছেন। আবার পো নদীর বদ্বীপ অঞ্চলের কৃষকদের অভিযোগ, উজানের কৃষকেরা এত বেশি পানি নিয়ে নিচ্ছেন যে তাঁদের এলাকায় পর্যাপ্ত পানি পৌঁছাচ্ছে না।

ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের জলবায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন, জুনে ইউরোপজুড়ে যে তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন না হলে এমন পরিস্থিতি কার্যত অসম্ভব ছিল।

তবে ইতালির কৃষকদের মতে, এ পানিসংকট আগেই অনুমান করা সম্ভব ছিল।

কৃষক সংগঠন কোলদিরেত্তির স্থানীয় প্রধান সিলভিয়া গারাভালিয়া বলেন, শীতকালে পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা উন্নত করার দাবি তারা গত ২০ বছর ধরে জানিয়ে আসছেন।

পরিবেশবাদী সংগঠন  লেগাম্বিয়েন্তে বলেছে, কৃষি অবকাঠামো জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। তাই কৃষি ব্যবস্থায় নতুন ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন।

লেগাম্বিয়েন্তে লোম্বার্দিয়ার পানি সম্পদবিষয়ক প্রধান লোরেনৎসো বাইও বলেন, গ্রীষ্মকালে পানির চাহিদার সর্বোচ্চ চাপ কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ভুট্টা চাষের জমির পরিমাণ কমিয়ে বসন্তেই ধানক্ষেতে পানি ধরে রাখার নতুন পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন।

ভালদি জানান, তিনি কিছু জমিতে গম ও সয়াবিনও চাষ করেছেন। কিন্তু পানির অভাবে সেগুলোর অবস্থাও ভালো নয়।

তিনি বলেন, ‘তার ওপর এগুলো ধানের মতো লাভও দেয় না।’

পো উপত্যকার পিয়েমন্ত অংশের ভেরচেল্লি শহরের কাছাকাছি এলাকার কৃষকেরাও ‘ভীষণ উদ্বিগ্ন’ বলে জানান স্থানীয় কোলদিরেত্তি শাখার ৫৫ বছর বয়সী প্রধান রোবের্তো গুয়ের্রিনি।

রিসোতো তৈরির ধান উৎপাদনকারী গুয়ের্রিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা সবাইকে কোনোভাবে পানি দিতে পেরেছি। পালাক্রমে ধানক্ষেতে পানি দিচ্ছি। কিন্তু এক সপ্তাহ বা ১০ দিনের মধ্যে যদি নতুন পানি না আসে, তাহলে আমাদের ফসল নষ্ট হয়ে যাবে।’