শিরোনাম

ঢাকা, ৪ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় পাকিস্তানের রাজধানী ও জনবহুল প্রদেশে আগামী একমাস সরকারি পরিবহন সেবা বিনামূল্যে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সরকার।
শুক্রবার কর্মকর্তাদের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে। গত রাতে পেট্রোলের দাম ৪২.৭ শতাংশ বাড়িয়ে লিটার প্রতি ৪৮৫ রুপি (১.৭৪ মার্কিন ডলার) করার পর দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। পেট্রোল পাম্পগুলোতে দেখা দেয় মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি।
ইসলামাবাদ থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, তীব্র চাপের মুখে শুক্রবার গভীর রাতে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ পেট্রোলের ওপর থেকে শুল্ক কমিয়ে লিটার প্রতি ৩৭৮ রুপি নির্ধারণের ঘোষণা দেন।
টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, ‘এই হ্রাসকৃত মূল্য অন্তত আগামী এক মাস কার্যকর থাকবে।’ জনগণকে আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, ‘যতক্ষণ আপনাদের জীবন স্বাভাবিক না হচ্ছে, ততক্ষণ আমি স্বস্তিতে থাকব না।’
তবে ডিজেলের দাম কমাননি প্রধানমন্ত্রী। লিটার প্রতি ৫২০ রুপি দরেই ডিজেল বিক্রি হবে, যা আগের চেয়ে প্রায় ৫৪.৯ শতাংশ বেশি।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) জানান, ‘আগামীকাল (শনিবার) থেকে পরবর্তী ৩০ দিন ইসলামাবাদের সব সরকারি পরিবহন সাধারণ মানুষের জন্য বিনামূল্যে চলবে।’ এতে সরকারের ৩৫০ মিলিয়ন রুপি ব্যয় হবে বলে জানান তিনি।
একইভাবে পাকিস্তানের সবচেয়ে জনবহুল প্রদেশ পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রীও সরকারি পরিবহনে যাতায়াত খরচ মওকুফ করেছেন। এছাড়া ট্রাক ও বাসের জন্য ‘টার্গেটেড সাবসিডি’ বা সুনির্দিষ্ট ভর্তুকি ঘোষণা করেছেন তিনি। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ শরিফ পরিবহন মালিকদের বাড়তি ভাড়ার বোঝা যাত্রীদের ওপর না চাপানোর অনুরোধ জানান।
তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি উন্নত হওয়া মাত্রই জনগণকে এই অর্থনৈতিক বোঝা থেকে মুক্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি আমরা।’
সিন্ধু প্রদেশের করাচি শহরেও মোটরসাইকেল চালক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য একই ধরণের ভর্তুকি ঘোষণা করা হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। পাল্টা জবাব হিসেবে ইরান পারস্য উপসাগরের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানলে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই রুট দিয়ে যায়, যার বড় অংশই এশিয়ার দেশগুলোর জন্য।
জ্বালানি সাশ্রয়ে পাকিস্তান সরকার বেশ কিছু ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি অফিস চার দিন করা, স্কুল-কলেজের ছুটি বাড়ানো এবং কিছু ক্লাস অনলাইনে নেওয়া।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ কোটি জনসংখ্যার পাকিস্তানে প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। মার্চ মাসের শুরুতে জ্বালানির দাম ২০ শতাংশ বাড়ালেও সরকার দাবি করেছিল তারা বাড়তি দামের চাপ নিজেরা সামলে নেবে, জনগণের ওপর চাপাবে না।
তবে শুক্রবার পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে বহু মানুষ এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেন।
৩৯ বছর বয়সী নাভিদ আহমেদ এএফপি’কে বলেন, ‘সরকার রাতারাতি জনগণের ওপর ‘পেট্রোল বোমা’ ফেলেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই মুদ্রাস্ফীতির ঝড় থামানো এবং জনগণকে স্বস্তি দেওয়া জরুরি।’
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে এশিয়ার আরও বেশ কিছু দেশ জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজি এবং সিএনজি চালিত গাড়ির গ্যাসের দাম ২৯ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
এদিকে, গত ২৮ মার্চ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পাকিস্তানকে ১.২ বিলিয়ন ডলারের একটি নতুন প্যাকেজ দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে, আইএমএফ সতর্ক করেছে যে, পাকিস্তানের মতো দুর্বল অর্থনীতিগুলো শুধু জ্বালানির দাম নয়, বরং সরবরাহ ব্যবস্থার সংকটের কারণেও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
লাহোরের আরেক বিক্ষোভকারী হাফিজ আব্দুল রউফ বলেন, ‘এই মূল্যবৃদ্ধি যুদ্ধের কারণে নয়, বরং আইএমএফের চাপে হয়েছে।’