শিরোনাম

ঢাকা, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : ইরানের সরকার বিরোধী বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের প্রতিবাদে ও বিক্ষোভকারীদের প্রতি সংহতি জানাতে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে রোববার বড় ধরনের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে বার্তাসংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।
এএফপির সাংবাদিকরা জানায়, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইরানি প্রবাসী জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল লস অ্যাঞ্জেলেসে কয়েক হাজার মানুষ মিছিল করেন। নিউইয়র্কেও কয়েকশ’ মানুষ সমাবেশে অংশ নেন।
বিক্ষোভকারীদের হাতে ছিল নানা প্ল্যাকার্ড। সেখানে লেখা ছিল— ‘নতুন হলোকাস্ট’, ‘চলমান গণহত্যা’ ও ইরানি সরকারের ‘সন্ত্রাস’ বন্ধের আহ্বান।
লস অ্যাঞ্জেলেসে আয়োজিত সমাবেশে অংশ নেওয়া পেরি ফারাজ বলেন, আমার হৃদয় ভারাক্রান্ত। আমি এতটাই ক্ষুব্ধ যে ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।
৬২ বছর বয়সী এই পে-রোল ম্যানেজার ২০০৬ সালে ইরান ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেন। তিনি জানান, চলতি সপ্তাহেই জানতে পেরেছেন, ইরানে চলমান বিক্ষোভে তার এক ছোট চাচাতো ভাই নিহত হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘তার বয়স ১০ বছরও পূর্ণ করেনি। বিষয়টি ভয়াবহ।’
অর্থনৈতিক দুরবস্থাকে কেন্দ্র করে ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানে যে বিক্ষোভ শুরু হয়, তা দ্রুতই সরকার বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এটি ইরানি নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে ৮ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ রেখে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অভিযানের পর আন্দোলন অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়ে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই অভিযানকে ‘গণহত্যা’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
নরওয়েভিত্তিক সংগঠন ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’ জানায়, তারা নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত ৩ হাজার ৪২৮ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর তথ্য যাচাই করেছে। ইরানের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থার ভেতরের সূত্র, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বাধীন সূত্রের ভিত্তিতে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, প্রকৃত মৃতের সংখ্যা আরো অনেক বেশি হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে এই সংখ্যা যাচাই করতে পারেনি। ইরানি কর্মকর্তারাও এখনো কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করেননি।
লস অ্যাঞ্জেলেসে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ৬৫ বছর বয়সী আইনজীবী আলি পারভানেহ বলেন, ‘জনগণের ওপর এই নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ভীষণভাবে কষ্টদায়ক।’
তার মতো অনেকেই ‘মেক ইরান গ্রেট এগেইন’ লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করেন। তিনি বলেন, ইরানের প্রভাবশালী ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) লক্ষ্য করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ চান তারা।
লস অ্যাঞ্জেলেসের সমাবেশে কেউ কেউ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যার দাবিও তোলেন। তিনি গত ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় রয়েছেন।
জুন মাসে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর ট্রাম্প সম্ভাব্য মার্কিন হস্তক্ষেপ নিয়ে চলতি সপ্তাহে মিশ্র বার্তা দেন।
প্রথমে তিনি বলেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে। পরে আবার জানান, বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে না—এমন ইরানি আশ্বাসে তিনি সন্তুষ্ট।
আলি পারভানেহ বলেন, ‘আমি সত্যিই আশা করি, ট্রাম্প কেবল সমর্থনের কথা বলেই থেমে থাকবেন না।’
লস অ্যাঞ্জেলেসে অনেক বিক্ষোভকারী ট্রাম্পের পাশাপাশি ইরানের সাবেক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ছেলে রেজা পাহলভির সমর্থনে স্লোগান দেন।
প্রবাসী ইরানিদের একটি অংশের মধ্যে রেজা পাহলভির জনপ্রিয়তার কথাও উঠে আসে।
আলি পারভানেহ বলেন, ‘রাজতন্ত্র টিকে থাকলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। ইরান আজ অনেক ভালো অবস্থায় থাকত।’
তবে পাহলভির সমর্থন মূলত বিদেশে সীমাবদ্ধ। ইরানের ভেতরে তার রাজনৈতিক প্রভাব তেমন নেই।
ওয়াশিংটনের নির্বাসনে থাকা সাবেক শাহের ছেলে চলতি সপ্তাহে বলেছেন, তিনি ইরানে ফিরে যেতে প্রস্তুত। তবে অধিকাংশ ইরানি তা চান কি না, তা বোঝা যাচ্ছে না।
ইরানের বিরোধী রাজনীতি এখনো বিভক্ত। একই সঙ্গে শাহ আমলের বামপন্থী বিরোধীদের ওপর চালানো কঠোর দমন-পীড়নের স্মৃতিও অনেকের কাছে তাজা।
লস অ্যাঞ্জেলেসের ওয়েস্টউড এলাকাটি ‘ তেহরানজেলেস’ নামেও পরিচিত। রেস্তোরাঁটির মালিক রুজবেহ ফারাহানিপুর বলেন, প্রবাসীদের উচিত ইরানিদের পাশে দাঁড়ানো, তবে তাদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করার অধিকার খর্ব না করা।