বাসস
  ১১ জানুয়ারি ২০২২, ০৮:৫২

বাসস ইউনিসেফ ফিচার-১ : প্রজনন স্বাস্থ্য সেবা থেকে দলিত নারীরা উপেক্ষিত  

বাসস ইউনিসেফ ফিচার-১
প্রজনন-দলিত
প্রজনন স্বাস্থ্য সেবা থেকে দলিত নারীরা উপেক্ষিত  
ঢাকা, ১১ জানুয়ারি, ২০২২ (বাসস) : প্রজনন স্বাস্থ্য সেবা একটি দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কেননা সঠিক প্রজনন ছাড়া একটি  জাতি  তার ভবিষ্যত গড়তে পারেনা।  সে দিক থেকে প্রজনন স্বাস্য সেবা  একটি  দেশের উন্নয়নের মাপকাঠিও বটে। এক্ষেত্রে জনসচেতনতা  গুরুত্বপূর্ণ। কালের পরিক্রমায় বিশ্বের প্রতিটি দেশই  নিজ নাগরিকদের প্রজনন স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়নে  বাস্তবমুখী বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও।  সরকারের গৃহীত  বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে  দেশের প্রজনন স্বাস্থ্য সেবার  যথেষ্ঠ উন্নতি হয়েছে। তবে দেশের সকল নাগিরিক  সমানভাবে  এ সেবা পাচ্ছেনা।  সচতনতার  কারণেই এ ক্ষেত্রে অনেক বেশি এগিয়ে রয়েছে শিক্ষিত সমাজ বা এলিট শ্রেণী।  তবে প্রজনন স্বাস্থ্য সেবায়  শিক্ষা কিংবা সচেতনতা তথা  সামাজিক  অবস্থানের কারণে বেশি উপেক্ষিত রয়েছে দলিত নারীরা। দলিত নারী  লক্ষ্মী রানীর বিয়ের দু’বছরের মাথায় প্রথম সন্তান গর্ভে আসে।  মা হওয়ার বাড়তি কোনো উচ্ছ্বাস তার ছিল না। তার দৃষ্টিতে  এ আর এমনকি, সন্তান জন্ম দেয়া সংসারের আর পাঁচটা কাজের মতোই তো। তাই প্রথমবার গর্ভবতী হওয়ার পরও স্বামী কোনোদিন কোনো স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে তার চেকআপ করাননি। এমনকি প্রসব ব্যথা উঠলেও লক্ষ্মীকে বাড়ির কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেয়ার ‘সাহস’ হয়নি স্বামীর। কারণ, লক্ষ্মীরা অচ্ছুৎ, অস্পৃশ্য। হাসপাতাল তাদের কাছে ‘সংরক্ষিত এলাকা’। তার বদলে বাড়িতে ডেকে আনা হয় পরিচিত দাইকে। দাইয়ের তিনদিনের উদয়াস্ত পরিশ্রমে মৃত সন্তান প্রসব করে লক্ষ্মী। 
কিন্তু এখানেই  লক্ষীর কষ্টের শেষ নয়। কয়েক দিন পরই ফিস্টুলা হয় তার। প্রস্রাব, পায়খানার রাস্তা এক হয়ে যায়। এ অবস্থায়ও চিকিৎসকের কাছে নেয়ার ‘ঝামেলায়’ জড়ায়নি তার স্বামী। উল্টো লক্ষ্মীকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে ‘ঝামেলামুক্ত’ হয় সে। এটি কোনো অজপাড়া গাঁয়ের ঘটনা নয়, লক্ষ্মীর নিবাস ঢাকা শহরের ওয়ারীতে। যারা খোঁজ-খবর রাখেন, তারা জানেন, এমন ঘটনা দলিত সম্প্রদায়ের নারীদের ক্ষেত্রে প্রায়ই ঘটে। কেবল জীবিত সস্তান প্রসব করাতেই যেন তাদের স্বস্তি। গর্ভবতী মা ও নবজাতকের সুস্বাস্থ্য তাদের কাছে একেবারেই গৌণ বিষয়। যদিও দেশজুড়ে থাকা কমপক্ষে ১১০ জাতি-গোষ্ঠীর বিভিন্ন পেশার দলিত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। 
শুধুমাত্র জন্মগত অথবা পেশাগত পরিচয়ের কারণে বিশাল এই জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার ভোগ অন্যদের তুলনায় কম। আবার দলিত পুরুষদের তুলনায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে দলিত নারীদের অভিগম্যতা আরো কম। এ দু’টি ক্ষেত্রে দলিত নারীরা দু’ভাবে বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার হন। প্রথমত, দলিত হিসেবে বৃহৎ সমাজে এবং দ্বিতীয়ত, নিজ সমাজে নারী হিসেবে। নারী স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ যে বাল্য বিয়ে, দলিত সম্প্রদায়ের মধ্যে তার হার সবচেয়ে বেশি। 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ও দলিত বিষয়ক গবেষক সায়মা আহমেদের মতে, চরম দরিদ্র্যতাই দলিতদের আনুষ্ঠানিক চিকিৎসা লাভের ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা। তাছাড়া সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও পেশাগত লজ্জাও এজন্য দায়ী। সাধারণ স্বাস্থ্য সেবার বিভিন্ন বিষয়েই দলিত নারীদের  সচেতনতা নেই বললেই চলে। আর প্রজনন স্বাস্থ্য, নবজাতকের সুস্বাস্থ্য ও সঠিক পরিচর্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও তাদের স্পষ্ট ধারণা নেই। 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক মেসবাহ কামাল দলিতদের অধিকার আদায়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। তিনিও জানান, সমাজের চোখে নিচু জাত ও অচ্ছ্যুৎ বিবেচিত হওয়ায় দলিত শ্রেণীর নারীরা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যেতেই পারছে না। দলিতদের ১০০ ভাগ প্রসবই বাড়িতে অদক্ষ দাইয়ের হাতে হচ্ছে। 
তবে আশার কথা, নিজেদের অধিকার আদায়ে দলিত নারীরা সংগঠিত হচ্ছেন। দলিত নারী ফোরামের সভাপতি মনি রানী দাসের মতে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিষয়ে দলিত নারীদের সচেতনতা দিন দিন বাড়ছে। সমাজের বাধা ডিঙিয়ে অনেক দলিত মেয়ে স্কুল-কলেজে পড়ছে। নারী স্বাস্থ্যের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানছে। এটা ইতিবাচক। উদ্যোগ রয়েছে সরকারের তরফেও। সমাজসেবা অধিদপ্তর শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ দলিত জনগোষ্ঠীর সার্বিক জীবনমান উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি দলিত অধ্যুষিত ২১ জেলায় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এছাড়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার দলিতদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ‘বৈষম্য বিলোপ আইন’ নামে একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগও সরকার নিয়েছে। আশা করা যায়, এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে দলিত নারীর বিভিন্ন অধিকার সামগ্রিকভাবে বাস্তবায়িত হবে।
বাসস/ইউনিসেফ ফিচার/এসডিজি/মহ/০৮৫০/এবিএইচ