বাসস
  ০৯ জানুয়ারি ২০২২, ০৯:৩১

শ্রীমঙ্গলের মির্জাপুরের নারীরা ‘পুতুল স্বাবলম্বী’

ঢাকা, ৯ জানুয়ারি, ২০২২ (বাসস) : স্বামী হারা  রেখা বেগমের  সংসারে  মোট সদস্য সংখ্যা  পাঁচ জন।  এক সময় স্বামী ছিলেন  সংসারের  উপার্জনের  একমাত্র ব্যক্তি।  কিন্তু  স্বামী মারা যাওয়ার  পর  স্কুল পড়–য়া তিন  সন্তানকে নিয়ে  যেন  মহাসাগরে পড়ে যান।  সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।  অথচ  সেই রেখা  বেগমের সংসারেই ফিরেছে  আর্থিক স্বছলতা‘পুতুল’ বানিয়ে।  তিনি একা নন  দুই  মেয়েসহ  পুতুল তৈরী করে  তার সংসারে  ফিরেছে  স্বচ্ছলতা। তিনি একাই নন এলাকার অনেক বাড়িতেই  এখন  দেখা যায় পুতুল তৈরীতে  কাজ করছেন  স্থানীয় নারীরা।  তেমনই  এক বাড়িতে গিয়ে গেল   উঠোনে গোলাকার করে বসে কাজ করছেন বেশ কয়েক জন মহিলা। তারা কয়েকটি গ্রুপ করে কাজ করে চলেছেন। সবাই খুব ব্যস্ত। কেউ সুতো বুনছেন। আবার কেউ পরীক্ষা করে দেখছেন ঠিকভাবে সেলাই হয়েছে কিনা।
চিত্রটি সিলেট জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ পাচাউন গ্রামের। এই গ্রামের প্রায় প্রতি ঘরের কর্মক্ষম নারী ও স্কুল-কলেজগামী মেয়েরাই আর্থিকভবাবে স্বাবলম্বী। কারন তাদের উৎপাদিত পন্য বিভিন্ন ধরনের পুতুল সরাসরি রপ্তানি হচ্ছে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে। মূলত এটি একটি বিশেষ ধরনের পুতুল যা বাচ্চারা মুখে নিলেও কোন ধরনের ক্ষতি হয় না। বিশ্ব বাজারে এ পুতুলের ব্যাপক চাহিদা। আর সিলেটের শ্রীমঙ্গল উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামে তৈরী হচ্ছে এ ধরনের পুতুল। 
পাচাউন গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের মেয়েরা খুবই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। যে যখন সময় পাচ্ছেন তখনই বানাতে বসে যাচ্ছেন এই খেলনা তৈরীতে। 
তাদেরই একজন জোবেদা বলেন, আমরা খুব চেষ্টা করি,খুব যতœ করে এসব খেলনা তৈরী করতে। কারন এখান থেকে আমাদের সবারই ভালো একটা আয় হয়। এখন আমরা আমাদের সংসারের খরচেও সহযোগিতা করতে পারছি। আমি এ কাজটাকে খুব উপভোগও করি। চেষ্টা করি ভালো কিছু করার। 
ক্লাইমেন্ট রেজিলিয়ান ইকোসিস্টেমস এন্ড লাভলিহুডস (ক্রেল) এর যোগাযোগ কর্মকর্তা বলেন, বুনন প্রশিক্ষণ সোসাইটির উদ্যোগে এবং ক্রেল এর সহযোগিতায় প্রত্যেক নারীকে দু’মাসের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। এখন মেয়েরা ঘরে বসেই পুতুল  তৈরী করছেন। এরফলে তাদের সবারই একটি আয় হচ্ছে। 
সীমা নামের কলেজগামী এক শিক্ষার্থী বলেন, আমি প্রতিদিন দু’ঘন্টা করে এখানে সময় দিই। মূলত কলেজ এবং পড়া শেষে আমি এই কাজ করি। এখান থেকে আয়কৃত অর্থ আমি শুধু নিজের জন্যই খরচ করি। কারন আমাকে বাড়িতে কোন টাকা দিতে হয় না। এরফলে আমার পড়ার বইসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আমি নিজেই ক্রয় করি আমার নিজের টাকা দিয়ে। 
তিনি বলেন, এই কাজটাকে আমি খুব উপভোগ করি। এটা ভাবতেই ভালো লাগে যে আমাদের উৎপাদিত পন্য সরাসরি বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। আমার মত অনেক শিক্ষার্থীই এখন এই পুতুল তৈরীর কাজ করে স্বাবলম্বী হয়েছে। প্রশিক্ষনের সময় আমরা প্রায় ২০০ এর মতো বিভিন্ন আইটেম বিশেষ করে অক্টোপাস, কেটার পিলার, জিরাফ, পেঁচা তৈরী করেছি। সবগুলোই রপ্তানি হয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে।
ক্রেল কর্মকর্তারা জানান এই গ্রামের নারীদের দুই ভাগে বিভক্ত করে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। তারা সবাই প্রতিদিন দু’ঘন্টা করে প্রশিক্ষণ নিয়ে পুতুল তৈরী করছেন।
কর্মকর্তারা বলেন, প্রতি পিস অক্টোপাসের জন্য নারীরা ত্রিশ টাকা হারে পাচ্ছেন। এছাড়াও সেলাইয়ের যাবতীয় উপকরণ এখান থেকে বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়েছে। তারা যদি এভাবে কাজ করতে থাকে তবে ভবিষ্যতে তারা প্রতিমাসে ২০ হাজার থেকে ত্রিশ  হাজার টাকা উপার্জন করতে সক্ষম হবে। 
মূলত গ্রামীণ নারীদের জীবন-মান উন্নয়নের জন্য এ কার্যক্রমটি বিশেষভাবে পরিচালিত হচ্ছে। 
পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী রাহেলা নামের এক নারী বলেন, আগে আমার স্বামীর একার আয়ে পাঁচজনের সংসার চালাতে আমাদের হিমশিম লেগে যেত। খুব কষ্টে সংসার চালাতে হত। আমার স্বামী রিকশা চালায়। এখন আমিও উপার্জন করছি। দু’জনের আয়ে এখন সংসারে সচ্ছলতা এসেছে। 
তিনি বলেন, শুরুতে ভয় ছিল কাজটি করতে পারব কিনা। কিন্তু প্রশিক্ষণের পর এখন খুব কম সময়ে আমি পুতুল তৈরী করতে পারি। যত বেশি পুতুল তৈরী করতে পারব, ততো বেশি আয় হবে। আর আমাদের উৎপাদিত পন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ডে যাচ্ছে ... বিষয়টি ভাবতেই ভালো লাগে।