বাসস
  ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১২:৩২
আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১৭:১৮

সৌধের জীবনানন্দ উৎসব নিয়ে দর্শকদের উচ্ছ্বাস

ঢাকা, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ (বাসস) : সৌধ সোসাইটি অব পোয়েট্রি এন্ড ইন্ডিয়ান মিউজিকের আয়োজনে ইস্ট লন্ডনের রিচিমিক্সে অনুষ্ঠিত জীবনানন্দ উৎসবে যোগ দেয়া হল ভর্তি দর্শকরা বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে উপভোগ করেছেন জীবনানন্দকে নিয়ে প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টার অসামান্য আর বিচিত্র সব যাদু। অনুষ্ঠান শেষে ঘোর গ্রস্ত তন্ময় দর্শকরা এমনই বলছিলেন নিজেদের প্রতিক্রিয়ায়।
ড্যানিশ বংশোদ্ভূত চিত্রশিল্পী সোফিয়া হিল বলেন, কবিতা আমার সকল সময়ের প্রিয় বিষয়। বিংশ শতকের এমন মহান এবং এত বৈচিত্র্যময় এক কবিকে এভাবে সারা সন্ধ্যাব্যাপী আবিষ্কার করতে পেরেছি বলে এই সন্ধ্যাটা স্মরনীয় হয়ে থাকবে। সৌধের ধ্রুপদী অনুষ্ঠান মালার শিল্পমান আর  গভীরতা নিয়ে বেশ ভাল করেই ওয়াকিবহাল ছিলাম বলে এমন ঝড়ের সন্ধ্যায়ও উৎসবে ছুটে এসেছি।
ইউরোপের স্লাম চ্যাম্পিয়ান কবি ডেভিড লী মর্গান বলেন ‘আমি বরাবরের মতই অভিভূত। সৌধের পাখায় যুক্ত হল আরেকটি উজ্জ্বল পালক। উৎসবের শেষের দিকে মঞ্চায়িত ‘বনলতা সেন-দি সার্চ ফর বিউটি’ শীর্ষক থিয়েটার প্রযোজনায় আমি বিশেষভাবে আলোড়িত।’ এই প্রযোজনা আমাকে রবার্ট উইলসনের অভিনব থিয়েটার শৈলীর কথা মনে করে দিয়েছে।
চলচ্চিত্র পরিচালক নন্দিনী পাল বলেন, লন্ডনে আবহাওয়ার হলুদ সংকেত উপেক্ষা করে এসে এখন সত্যি খুব আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফিরছি। জীবনানন্দকে নিয়ে এই পরিসরে কোনো অনুষ্ঠান খোদ কলকাতায়ও দেখতে পাব সেটা কল্পনা করিনি। বাঙালি এবং অবাঙালি এত পন্ডিতদের নতুন নতুন জীবনানন্দ ভাবনা আর অতলস্পর্শী কথা। অন্যদিকে একঝাঁক মেধাবি বাচিক শিল্পীদের দিয়ে জীবনানন্দের কবিতার বাংলা ও ইংরেজি উপস্থাপনা, আবার নৃত্যশিল্পী মনিদীপা শীলের সম্মোহনী ভিস্যুয়াল ইন্টারপ্রিটেশন, জীবনানন্দের কবিতা ঘিরে পাবলো খালেদের আলোকচিত্র সহযোগে অত্যন্ত ব্যতিক্রমধর্মী উপস্থাপনা, লেখক শাহাদুজ্জামানের পাঠ ও প্রশ্নোত্তর পর্ব এবং সব শেষে থিয়েটার পরিবেশনা - এক কথায় অভূতপূর্ব। আমার জীবনানন্দ-প্রেমিক বাবা আজ দেশের বাইরে এমন আন্তর্জাতিক পরিসরে তার প্রিয় কবির সাহিত্যকর্ম উদযাপিত হচ্ছে দেখে অত্যন্ত গর্ববোধ করতেন।
লন্ডনের বিখ্যাত বার্বিকান লাইব্রেরির প্রধান গ্রন্থাগারিক রিচার্ড জোনস বলেন, শুধু একজন কবি বা লেখকের কাজ নিয়ে এত বিচিত্র পরিবেশনা সত্যিই বিরল। আদ্যোপান্ত উপভোগ করেছি। বার্বিকান লাইব্রেরিতেও জীবনানন্দ নিয়ে শিগগিরই কিছু করার পরিকল্পনা করছি।
প্রখ্যাত শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিল্পী চিরঞ্জীব চক্রবর্তী আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, এমন একটা ঝড়ের দিনে, তাও রোববার সন্ধ্যায় এমন একটা ক্লাসিক অনুষ্ঠান হল ভর্তি আরো শিল্পুপিপাসুদের সঙ্গে দেখতে  পেরেই গর্বিত নয়, অনেক কিছু শিখতেও পেরেছি, সেটাও কম নয়। কবিতা নিয়ে নাট্য-প্রযোজনা খানা এক কথায় অসামান্য। আদ্যোপান্ত তন্ময় হয়ে উপভোগ করেছি এই বিচিত্র পরিবেশনা।
জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী গৌরি চৌধুরি বলেন, আমার খুব আনন্দ লাগছে যে, প্রায় দেড় ঘন্টা ড্রাইভ করে হলেও শেষ পর্যন্ত থিয়েটার প্রোডাকশনটা দেখতে পেরেছি।
বৃটেনে দক্ষিণ-এশীয় শিল্পের শীর্ষতম সংস্থা সৌধ সোসাইটি অব পোয়েট্রি এন্ড ইন্ডিয়ান মিউজিকের উদ্যোগে সম্প্রতি তৃতীয় বছরের মত আয়োজিত এই উৎসবে বিভিন্ন ধরণের পরিবেশনায় অংশ গ্রহণ করেন বিলাতের প্রথিতযশা বাঙালি ও অবাঙালি কবি, লেখক, তাত্ত্বিক এবং সঙ্গীত, নৃত্য ও অভিনয় শিল্পীরা।
উৎসবে জীবনানন্দের সাহিত্য কৃতির নানা আলোচিত/অনালোচিত দিক নিয়ে কথা বলেন লিডস ট্রিনিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক, প্রখ্যাত কবি ওজ হার্ডউইক, বিখ্যাত বৃটিশ-ইতালিয়ান কবি ও ইংরেজি ভাষায় জীবনানন্দ অনুবাদক স্টিফেন ওয়াটস, কবি ও নাট্যকার জন ফার্নডন। বিশিষ্ট গদ্যকার ও সাসেক্স মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা-প্রতœতত্বের অধ্যাপক  শাহাদুজ্জামান পাঠ করেন জীবনানন্দের জীবন নিয়ে তার রচিত ডকুফিকশন  ‘ডেথ অব এন অরেঞ্জ’ থেকে কিয়দংশ। অংশ নেন সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর পর্বেও। লাতিন আমেরিকার আত্ম-বিধ্বংসী কবি আলাহান্দ্রা পিজারনিক ও জীবনানন্দের কবিতার তুলনামুলক আলোচনা করেন মেধাবী বৃটিশ-আর্জেন্টাইন কবি গাবি সাম্বুসিটি।
সবশেষে মঞ্চস্থ হয় কবি টি এম আহমেদ কায়সারের পরিচালনায় জীবনানন্দের বনলতা সেন কবিতার এক সংক্ষিপ্ত অথচ সম্মোহনী এবং কাব্যিক  নাট্যরূপ ‘বনলতা সেন-এ সার্চ ফর বিউটি।’
‘আবার আসিব ফিরে’ ও ‘নদী শীর্ষক কবিতার অপূর্ব নৃত্য রূপায়নে করেছেন ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্যশিল্পী মনিদীপা শীল।
আলোকচিত্র দিয়ে জীবনানন্দের বিভিন্ন কবিতার অভিনব দৃশ্য-পাঠ উপস্থাপন করেছেন আলোকচিত্র শিল্পী পাবলো খালেদ।  
সৌধ পরিচালক টি এম আহমেদ কায়সার জানান, ভীষন ভারমুক্ত বোধ করছি এটা ভেবে যে আন্তর্জাতিক সাহিত্য মহল বাংলাভাষার অন্যতম প্রধান কবি জীবনানন্দকে আমাদের মতই সমান বিষ্ময় নিয়ে ভালবাসতে শুরু করেছেন। আবার এক মহাকর্মযজ্ঞের দায়িত্বও অনুভব করছি সমানভাবে।      
উৎসবের অন্যতম সহ-আয়োজক কবি শামীম শাহান বলেন, আবহাওয়ার হলুদ সংকেত উপেক্ষা করেও উপস্থিত হয়েছেন হল ভর্তি বিপুল কাব্য-পিপাসু দর্শক আর বিরতিহীন প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টার অনুষ্ঠান উপভোগ করেছেন একটানা। যে শহরে এত শিল্প সংগীত ও  সাহিত্য ভক্ত দর্শকরা থাকেন, জীবনানন্দের নতুন নতুন পাঠ তো এই শহরেই হবে। সৌধ এক অসামান্য বিপ্লব শুরু করেছে, তার অংশ হতে পেরে আমরা কৃতার্থ বোধ করছি।