BSS-BNhrch_cat_news-24-5
বাসস
  ০৫ আগস্ট ২০২১, ১৮:০৩
আপডেট  : ০৫ আগস্ট ২০২১, ১৯:৩৩

বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বঙ্গমাতা নীরবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন

॥ মলয় কুমার দত্ত ॥
ঢাকা, ৫ আগস্ট, ২০২১ (বাসস) : দেশের বরেণ্য শিক্ষাবিদগণ বলেছেন, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব তাঁর স্বামী বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে প্রেরণা দানের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও এ দেশের সুদীর্ঘ সংগ্রামের ফসল আমাদের স্বাধীনতা’র ইতিহাসে এক অনন্য ভূমিকা রেখেছিলেন।
রোববার বঙ্গমাতার ৯১তম জন্ম-বার্ষিকীর প্রাক্কালে তাঁর সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে আজ জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বাসসকে বলেন, ‘বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুর জীবনে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। বঙ্গবন্ধুর পর, আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখেন বঙ্গমাতা।  
তিনি আরো বলেন, প্রচার-বিমুখ বঙ্গমাতা আড়ালে থেকে নীরবে দেশের স্বাধীনতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
বাংলা একাডেমীর সভাপতি অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বঙ্গমাতা সম্পর্কে আরো বলেন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, গণ-অভ্যুত্থান ও আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের যে কোন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বঙ্গমাতা সব সময় বঙ্গবন্ধুকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন।
অধ্যাপক বলেন, উদাহরণ স্বরূপ, ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের আগে- বঙ্গবন্ধু সেখানে কি বলবেন, সে ব্যাপারে প্রচুর আলোচনা হয়। এই সময়ে বঙ্গমাতা প্রধান ভূমিকা রাখেন।
তিনি আরো বলেন, ‘আওয়ামী লীগের অনেক নেতা ও অন্যান্যরা ওই সময়ে বঙ্গবন্ধুকে তাদের মতামত ও বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুকে বলেন, “তুমি তোমার সারাটা জীবন এ দেশের মানুষের জন্য লড়াই করেছ। ভাষণে কি বলতে হবে- সেটা তুমিই সবচেয়ে ভাল জান। তুমি তোমার হৃদয়ের কথা শুনো।” এবং বঙ্গবন্ধু ঠিক তাই করেন। আর এখন সেটাই বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর অন্যতম।’
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শত-বার্ষিকীর জাতীয় উদ্যাপন কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, বঙ্গমাতা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রেরণা ও আত্মবিশ্বাসের উৎস। বঙ্গমাতাকে ছাড়া বঙ্গবন্ধুর পক্ষে তার গোটা জীবনে এতো সব সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হতো না। দেশের মানুষের জন্য বঙ্গবন্ধুর সাহসী ভূমিকা রাখার প্রেরণা ছিলেন বঙ্গমাতা।
তিনি আরো বলেন, ‘বঙ্গমাতাকে ছাড়া বঙ্গবন্ধু অসম্পূর্ণ। বঙ্গমাতাকে পাশে পেয়েই বঙ্গবন্ধু পূর্ণতা পেয়েছেন। কিন্তু বাইরে থেকে আমরা বঙ্গমাতার এই অনন্য ভূমিকার কথা পূর্বে বুঝতে পারিনি। এখন আমরা ধীরে ধীরে তাঁর অবদানের কথা জানতে পারছি। আর যতই আমরা বঙ্গমাতার এই সব অবদান সম্পর্কে জানছি, তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
বঙ্গমাতার দূরদর্শীতার একটি উদাহরণ দিতে গিয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক ইসলাম বলেন, যখন বঙ্গবন্ধু ও আরো ৩৪ জন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেফতার হলেন- তখন আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তির পরামর্শ দিলে বঙ্গমাতা সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেন।
এ ব্যাপারে তিনি আরো বলেন, ‘বঙ্গমাতা চাননি যে, প্যারোলে বঙ্গবন্ধু মুক্তি পেয়ে দেশ ও দেশের মানুষের জন্য তাঁর আজীবনের অসামান্য আত্মত্যাগকে ধ্বংস করে দিবেন । আর মূলত এ জন্যই বঙ্গবন্ধু প্যারোলে মুক্তি নেননি - বরং পাকিস্তানী শাসকরা তাঁকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল।’  
অধ্যাপক ইসলামের মন্তব্যের সাথে একমত পোষণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুর প্যারোলে মুক্তি পাওয়ার বিষয়টি নাকচের ক্ষেত্রে বঙ্গমাতার সিদ্ধান্তটি দেশের রাজনীতির ইতিহাসকে বদলে দিয়েছে।
তিনি আরো বলেন, বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুর প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তৎকালিন পশ্চিম পাকিস্তানে একটি গোলটেবিল বৈঠকের জন্যই বঙ্গবন্ধুর প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি আসে।
আরেফিন আরো বলেন, এই সঠিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহনের ফলে পাকিস্তানী শাসকরা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধুকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। আর এই সিদ্ধান্তটিই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করে দেয়।
বঙ্গমাতাকে অত্যন্ত রাজনৈতিক সচেতন হিসেবে আখ্যায়িত করে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, ওই সময়ে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাসভবনটি ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু এবং বঙ্গমাতা এই বাসভবন থেকেই সবকিছু দেখাশুনা করতেন ও সিদ্ধান্ত দিতেন। তিনি এই বাড়ি থেকেই আওয়ামী লীগ কর্মীদের খাবার বেড়ে দেয়া থেকে শুরু করে সবকিছুর ব্যবস্থা করতেন।  অধ্যাপক আরো বলেন, এ সময় বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুর ছায়ার ভূমিকা পালন করতেন এবং সব সময় আড়াল থেকেই আওয়ামী লীগ কর্মীদের সব ধরনের সহযোগিতা করতেন। কিন্তু তিনি প্রকাশ্যে কোন বক্তব্য বা বিবৃতি দিতেন না। কারণ তিনি ছিলেন প্রচার-বিমুখ।
রফিকুল বলেন, ‘একজন যোগ্য স্ত্রী হিসেবে বঙ্গমাতা বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকটের সময়ে বঙ্গবন্ধুকে মূল্যবান পরমার্শ দিতেন। তাঁর এই গঠনমূলক পরামর্শগুলো আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন সংকটকালীন পরিস্থিতিতে বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও সুরক্ষা প্রদান করেন।’
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার বোর্ড অব ডিরেক্টর্স- এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক সিদ্দিক বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী ও একজন বন্ধু হিসেবে বঙ্গমাতা তাঁর গোটা জীবনে এক অনন্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর পাশেই ছিলেন।
আরেফিন বলেন, বঙ্গবন্ধু তাঁর  ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে বারংবার লিখেছেন কিভাবে বঙ্গমাতা সব সময় তাঁর পাশে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু যখন ছাত্র ছিলেন- তখন থেকেই বঙ্গমাতা তাঁর স্বামীর জন্য সব সময়ই কিছু টাকা বাঁচিয়ে রাখতেন এবং বঙ্গবন্ধু যখন ঢাকা বা কোলকাতা থেকে গোপালগঞ্জ যেতেন তখন বঙ্গমাতা তাঁকে সেই টাকা দিতেন।
বঙ্গমাতার ধৈর্য্যের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে অধ্যাপক আরেফিন তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ১৯৪৬ সালে কোলকাতায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সময় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু দাঙ্গা থামানোর জন্য কাজ করছিলেন। ওই সময় বেগম মুজিব অন্তঃসত্ত্বা ও অসুস্থ্য ছিলেন। তাই বঙ্গবন্ধু গোপালগঞ্জে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন। কিন্তু ওই অবস্থাতেও বঙ্গমাতা তাঁকে কোলকাতাতেই থাকতে বলে চিঠিতে লিখেন, ‘এখন তোমার ওপর অনেক বড় দায়িত্ব রয়েছে। এই সমাজের তোমাকে প্রয়োজন রয়েছে, সমাজ তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। এখন তোমাকে সমাজের জন্য কাজ করতে হবে। আমাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ো না। আমি নিজের খেয়াল রাখতে পারব।’
তিনি বলেন, ‘তখন বঙ্গবন্ধু সোহরাওয়ার্দীকে বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত করলে সোহ্রাওয়ার্দী বলেন, “তুমি খুব ভাগ্যবান যে- সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাকে তোমার জীবন-সঙ্গিনী বানিয়েছেন।’   
তিনি বলেন, ‘একজন রাজনীতিবিদের স্ত্রী সম্পর্কে অপর রাজনীতিবিদের এই মন্তব্য থেকেই আমরা বুঝতে পারি যে- বেগম মুজিব কতটা ধৈর্য্যশীল ছিলেন এবং মানুষের জন্য তাঁর হৃদয়ে কত ভালবাসা ছিল। এমনকি যখন তাঁর পাশে তাঁর স্বামীকে খুব প্রয়োজন ছিল, তখনও তিনি নিজের কথা না ভেবে স্বামীকে সমাজের জন্য কাজ করতে বলেন।’  

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন