মুক্তিযুদ্ধে বরগুনা

2332

বরগুনা, ১৫ মার্চ, ২০১৯ (বাসস) : জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে বরগুনার মুক্তিকামী মানুষ।
আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। আওয়ামী লীগের সভাপতি আ. লতিফ মাষ্টার ও সাধারণ স¤পাদক অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম শিকদারকে যথাক্রমে সংগ্রাম পরিষদেরর সভাপতি ও সাধারণ স¤পাদক নির্বাচিত করা হয়। ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর কবির, সাধারণ স¤পাদক মো. আব্দুর রশিদ মিয়া, মো. দেলোয়ার হোসেন, ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ স¤পাদক আনোয়ার হোসেন মনোয়ার, দুলাল মাতুববরসহ আরও অনেকে ছিলেন পরিষদের সদস্য। এম.এন.এ আসমত আলী শিকদার, এম.পি.এ রোসমত আলী খান, ছাত্রনেতা সিদ্দিকুর রহমান ও ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা ছিলেন।
মার্চে মুক্তি সংগ্রামে উত্তাল হয়ে উঠেছিল বরগুনা। সারাদেশের ন্যায় মুক্তি সংগ্রামের সেই ঢেউ পৌঁছে গিয়েছিল উপকূলীয় জনপদের তটরেখা পর্যন্ত। একটাই প্রত্যয় ছিল, দেশকে শত্রুমুক্ত করা। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর হানাদারমুক্ত হয় বরগুনা। ৪ ডিসেম্বরে একটি নতুন সূর্য আকাশ জুড়ে স্বাধীনতার আলো ছড়াতে শুরু করে।
পাক হানাদার বাহিনী বরগুনা মহকুমা দখলে নেয় ২৬ এপ্রিল। সে সময় মুক্তিযোদ্ধারা বরগুনা শহর ছেড়ে গ্রামাঞ্চলে যাওয়ায় মুসলিম লীগ, জামায়াত ও অন্যান্য পাকিস্তানপন্থিরা বরগুনা শহরে আধিপত্য বিস্তার করে। সাবেক মুসলিম লীগ নেতা এমএনএ আবদুল আজিজ মাষ্টার ও পাথরঘাটার তাহেরউদ্দিন হাওলাদার বরগুনায় পাক সেনাদের নিয়ে আসে। এসডিও’র জেটিতে পাক বাহিনী অবস্থান নিয়ে আদালত ভবন এলাকায় কিছু লোক জড়ো করে ভাষণ দেয়। বরগুনা অভিযানে নেতৃত্ব দেয় পটুয়াখালী জেলা সামরিক আইন প্রশাসক মেজর নাদের পারভেজ। পাক বাহিনী আসার পর থেকে মানুষের মাঝে আতঙ্ক বাড়তে থাকে। ১৫ মে পাথরঘাটা থানার বেশ কয়েকজনকে ধরে এনে বিষখালী নদীর তীরে হত্যা করা হয়। বরগুনা সদর ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান পনুকে পটুয়াখালী নিয়ে হত্যা করা হয়। আয়লা পাতাকাটা ইউনিয়নের আবদুর রশিদ মাজেদ ও মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহেরকে খাদকোণ নদীর তীরে তৎকালীন এসডিও ঘাটে গুলি করে হত্যা করা হয়। আর পাথরঘাটার কাকচিড়ার মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমানকে হত্যা করা হয় বরগুনার পুরাতন খেয়াঘাটে। বিষখালী নদীর তীরে হত্যাকান্ডের সময় পাথরঘাটার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী লক্ষণ দাস ও তার ছেলে কেষ্ট দাস, অরুণ দাস ও স্বপন দাসকে বরগুনা কারাগারে এনে আটক করা হয়। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থানের কারণে সাবেক সিও আতিকুল্লাহ, এসআই আবদুল মজিদ, সিপাহী আড়ি মিয়া ও আবদুল জব্বারকে পটুয়াখালী নিয়ে হত্যা করা হয়। বরগুনা শহর তখন লোকশূন্য হতে থাকে। এক সময় পাক বাহিনীর লোকজন ঘোষণা দেয়, বর্ণ হিন্দুদের ওপর তারা আক্রমণ করবে না। এই ঘোষণা দিয়ে পাক বাহিনী বরগুনা ছেড়ে পটুয়াখালী চলে যায়। মানুষ আশ্বস্ত হয়। ঘোষণা পেয়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীসহ অনেক আওয়ামী লীগ সমর্থক ব্যক্তিবর্গ বরগুনা ফিরে আসেন। ২৬ মে পাক বাহিনীর ক্যাপ্টেন শাফায়াত চারজন সহযোগী নিয়ে গোপনে বরগুনা আসে। পরদিন সকালে ২-৩জন করে লোক ধরা শুরু হয়। তখন লোকজন আবার পালাতে শুরু করে। পাক সেনারা দোনকার ইমাম হোসেনসহ অন্যান্যদের সহযোগিতা নিয়ে নাথপাড়া, পশ্চিম বরগুনা ও শহর এলাকা ঘেরাও করে। এইসব এলাকা থেকে তারা শতাধিক নারী-পুরুষকে বেঁধে কারাগারে ঢোকায়। পাকিস্তানি বাহিনী জেলখানার নিকটে সিএন্ডবি ডাকবাংলোয় তাদের ঘাঁটি স্থাপন করে। সেখান থেকেই পরিচালিত হয় সকল কর্মকান্ড।
বরগুনা জেলখানা ছিল পাক বাহিনীর নির্যাতন, নিপীড়ণ আর গণহত্যার প্রধান কেন্দ্র। দু’দিনে পাঁচবার গুলি করার পরও অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ফারুকুল ইসলাম। তার বর্ণনা থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, ২৯ মে বরগুনা জেলখানায় গণহত্যা শুরু হয়। প্রথমদিন ৫৫ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। অনেকে সেদিন গুলিতে আধমরা আবস্থায় পড়েছিল। কিন্তু আধমরাদের ওপরও চলেছে আঘাতের পর আঘাত। পরদিন ৩০ মে আবারও ১৭ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। নিহত সকলকে একটি গর্তে মাটি চাপা দিয়ে রাখা হয়। ফারুকুল ইসলাম নিজে আলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেও তার দুই ভাই নাসির ও সানু শহীদ হন। আরও নির্মম, হৃদয় বিদারক সব ঘটনার জন্ম দেয় সেদিনের হত্যাকান্ড। সকলের কাছে কেষ্ট দাস নামে পরিচিত কৃষ্ণ দাস গুলিবিদ্ধ হয়েও সৌভাগ্যক্রমে বেঁচেছিলেন। বাঁচার আকুতি নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের রাস্তা পার হচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। দেখে ফেলে হায়েনারা। কোদালের বাঁট দিয়ে মাথা গুঁড়িয়ে সেখানেই হত্যা করা হয়। পাথরঘাটার লক্ষণ দাস ও তার ছেলে অরুণ দাসকেও এভাবে হত্যা করা হয়। অনেককে আবার পটুয়াখালী নিয়ে হত্যা করা হয়। তাদের অনেকের নাম আজও জানা সম্ভব হয়নি।
পাক হানাদারদের আস্তানা বরগুনা সিএন্ডবি’র ডাকবাংলোয় নিয়ে বহু নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। পাকসেনারা বিভিন্ন স্থান থেকে নারী, পুরুষদের ধরে এনে জেলখানায় আটকে রাখলেও নারীদের রাতে জেলখানা থেকে নিয়ে আসা হতো ডাকবাংলোয়। সারারাত গণধর্ষণের পর তাদের ছেড়ে দেয়া হতো ভোরে। পঞ্চাশোর্ধ্ব এক বীরাঙ্গনা বলেন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর। পাক সেনারা সেদিন তাকেও নির্যাতন করেছিল। তিনি দেখেছেন, তার মত ১৪-১৫জন নারী সেখানে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
একাত্তরের ১০ অক্টোবর পাথরঘাটা উপজেলার নাচনাপাড়া ইউনিয়নের সিংড়াবুনিয়া গ্রামে স্বজনদের সামনে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় ৭ মুক্তিযোদ্ধাকে। সহোদর, ভাইবোন এবং অতি আদরের শিশু সন্তানের সামনে তাদের হত্যা করা হয়। এ দিন হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজে বলেশ্বর নদী হয়ে হরের খালের ভেতর দিয়ে গানবোট যোগে সিংড়াবুনিয়া গ্রামে চলে আসে। মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করার অপরাধে গ্রামের অনেক নিরীহ মানুষও সেদিন হত্যার শিকার হন। ওই এলাকার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান মকবুল হোসেনের নির্দেশে নারী ও শিশুসহ নিরীহ গ্রামবাসীর ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালায় পাক বাহিনী। সেদিন দুপুরে শহীদ হন ক্ষিরোদচন্দ্র বেপারী (৩৩) ও তার শ্বশুর লক্ষ্মীকান্ত গয়ালী (৫৫), অশ্বিনী কুমার বালা (৬০), মনোরঞ্জন বেপারী (৪৫), চন্দ্রকান্ত হাজরা (৬৫), নিত্যানন্দ বেপারী (৪৫) এবং অনন্ত কুমার হাওলাদার (১৫)সহ আরও অনেকে। এদেরকে এক সারিতে দাঁড় করিয়ে প্রকাশে গুলি করা হয়। এরপর লাশগুলো ঝোঁপের আড়ালে মাটির গর্তে পুতে রাখা হয়।
পাক বাহিনী ২৩ নভেম্বর সুবেদার জামানের নেতৃত্বে বেতাগী যায়। সেখানে তারা বদনীখালী বন্দর লুট করে এবং আগুন দিয়ে বাজার পুড়ে ফেলে। লুটের পর লঞ্চে পাকবাহিনী বরগুনায় ফিরছিল। এসময় পথিমধ্যে মুক্তিবাহিনী প্রতিরোধ করে। মীর্জাগঞ্জ হতে কমান্ডার আলতাফ হায়দার ও মোতালেব তাদের দল নিয়ে পাক বাহিনীর লঞ্চ আক্রমণ করে। কিন্তু এলএমজির সামনে মুক্তিবাহিনী টিকতে পারেনি। তারা পিছু হটে। এক বাক্স কার্তুজসহ মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝি ধরা পড়ে। পাকবাহিনীর সদস্যরাও এ খন্ড যুদ্ধে আহত হয়। তারা বরগুনা পৌঁছে দেখে সেখানেও থাকা নিরাপদ নয়। সে কারণে রাতের অন্ধকারে পাকসেনারা সদলবলে বরগুনা ত্যাগ করে। ফলে মুক্তিবাহিনীর আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায়। চলতে থাতে তাদের প্রস্তুতি। ২৪ নভেম্বর বুকাবুনিয়ার মুক্তিবাহিনী বামনা থানা আক্রমণ করে। সারাদিন সংঘর্ষ চলে। দু’পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ চলে। বিকেলে রাজাকারেরা আত্মসমর্পণ করে। বামনা থানায় নিহত হয় ২৪ জন রাজাকার। একই দিনে আক্রমণ হয় বেতাগী থানা। মুক্তিবাহিনী থানা দখল করে। ২৫ নভেম্বর আক্রমণ করা হয় পাথরঘাটা থানা। কয়েক ঘণ্টা যুদ্ধের পর পুলিশ ও রাজাকার আত্মসমর্পণ করে। যুদ্ধ চলাকালেই পালিয়ে যাচ্ছিল শাস্তি কমিটির সদস্যরা। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের গুলি করে হত্যা করে। মুক্তিযোদ্ধারা আমতলী থানা আক্রমণ করে ১২ ডিসেম্বর। ২৭ নভেম্বর সকালে মুক্তিবাহিনী বরগুনা মহকুমা শহর দখল করে।
বরগুনা মহকুমা দখলের পর মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপদ স্থানে অবস্থান নেন। ৩ ডিসেম্বর বরগুনা পুরোপুরি মুক্ত হয় এবং ৪ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে বরগুনায় বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে। দীর্ঘ কয়েক মাস যুদ্ধের পর বরগুনার আকাশে উদিত হয় একটি নতুন সূর্য।

image_printPrint