গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য মাছ ধরার বাওয়া উৎসব

103

টাঙ্গাইল, ১৫ নভেম্বর ২০১৮ (বাসস) : গ্রাম বাংলার প্রাচীন চিরায়ত ঐতিহ্য মাছ ধরার বাওয়া উৎসব এখনও প্রচলিত রয়েছে। শীতের আগমনে আশ্বিনের শেষ থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত সাধারণত এ বাওয়া হয়ে থাকে। এ সময় চারদিকে নদী-নালা, খাল-বিল, ডোবা ও জলাশয়ে যখন পানি কমতে থাকে। তখন এ বাওয়া হয়ে থাকে। পানি কমার ফলে মাছ আর উজাতে ও নামতে পারে না। তখনই মাছ ধরার উত্তম সময়। এ সময়ে উত্তর টাঙ্গাইলে সাধারণত এ বাওয়া বেশি হয়। মাছ ধরা যাদের নেশা ও পেশা তারা হাটে-বাজারে গিয়ে ঢাক-ঢোল ও মাইকিং করে দিন তারিখ মতো হাজার-হাজার মানুষ একসাথে একযুগে উৎসব মুখর পরিবেশে মাছ ধরে। যার যা আছে পলো, জাল, জালি, শিপজাল, কারেন্ট জাল, ফারাংগি জাল, চাক প্রভৃতি মাছ ধরার উপকরণ নিয়ে কোমরে গামছা বেঁধে নদী-নালা, খাল-বিলে নেমে পড়ে। এভাবে উৎসবমুখর পরিবেশে সবাই সারিবদ্ধভাবে একসাথে একযোগে মাছ ধরাকে স্থানীয়ভাবে বাওয়া বলে থাকে।
টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়াঞ্চলের পিরোজপুর, বৃত্তিবাড়ি, কাকরাইদ, জলছত্র, পচিশ মাইল, গাছাবাড়ী, কামারচালা, ঘুঘুরবাজার, অরণখোলা, কুড়াগাছা ও ধনবাড়ী গ্রামের স্থানীয়রা জানান, বাওয়ার প্রচারণা শোনে আগের দিন জাল, চাকসহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে মাছ ধরার প্রস্তুত রাখে। পরদিন নির্ধারিত বিলে বা নদীতে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সবাই মিলেমিশে মাছ ধরে। সাথীদের মধ্যে যদি কারো মাছ ধরা পড়ে সবাই তখন হৈ-চৈ করে সমসুরে ডাক ধরে। চারদিকে মানুষ আর মানুষ। মাছ ধরা দেখতে আসা আশেপাশের উৎসুক জনতার ভিড় জমে যায়। মাছ ধরার পর রশি দিয়ে কোমরে বেঁধে আবার সবার সাথে বেয়ে যায় জাল। এভাবে উৎসব মুখর পরিবেশে মাছ ধরে বাওয়াইতরা। বিলে বা নদীতে যেদিন বাওয়া হয় সেদিন স্থানীয়রা ও মাছ ধরতে আসা (বাওয়াইতারা) লোকেরা হৈ-চৈ করে ব্যাপক আনন্দ পায়। কেউ যদি বড় মাছ বোয়াল, কাতল, চিতল, রুইসহ অন্যান্য মাছ পায় পরিবার পরিজন, আতœীয়-স্বজন নিয়ে আনন্দ করে খায়। গ্রাম জুড়ে আলোচনায় থাকে যে মাছ ধরতে পারে তার নাম। কেউ বা আবার মাছের তরকারি রান্না করে আতœীয়-স্বজনের বাড়িতে পাঠায়। অনেকে আবার মাছ কেটে টুকরো টুকরো করেও দেয়। সবার সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করতে এটা করা হয়।
হাওদা বিলে মাছ ধরতে আসা আলম মিয়া (৩৯) বাওয়াইতে মাছ ধরতে এসে তার চাক জালে বড় একটি বোয়াল মাছ আটকে পড়ে। বোওয়ালটি জালে প্যাচিয়ে কাঁধে নিয়ে বাড়ি ফিরে। বোয়াল মাছটি পেয়ে তিনি বেজায় খুুশি। শুধু আলমই নয় তার মতো আরো অনেকেই বোয়াল, রুই, কাতল মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরেন। আলমের আরেক সাথী জয়নাল আবেদীন বাড়ি ফিরছেন খালি হাতে। তার জালে কোন মাছ আটকেনি। তিনি জানালেন, এবার আটকেনি তাতে কি হয়েছে আবার আটকে পড়তে পারে। এতে হতাশ হবার কিছু নেই। মাছ পাওয়া অনেকটাই ভাগ্যের ব্যাপার বলে জানালেন তিনি। মাছ যারা ধরে ও বাওয়া বহে তাদের প্রচুর নেশা। বাওয়ার দিন তারা বাড়িতে থাকতে পারবে না। নেশায় তারা ছুটে যাবে বাওয়ায়। এ বাওয়ায় তাদের নেই কোন আক্ষেপ, অনুশোচনা। আছে শুধু বড়-বড় মাছ পাওয়ার নিরন্তর আশা।

image_printPrint