ভয় না পেয়ে যেকোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকতে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান

943

ঢাকা, ২৯ মার্চ ২০২০ (বাসস) : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বজুড়ে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে ভয় না পেয়ে জনগণকে যেকোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকার আহবান জানিয়েছেন।
এই দুর্যোগকালে দিনমজুর এবং শ্রমজীবী মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছে দেয়া জরুরী উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘যারা খেটে খাওয়া মানুষ, দিন আনে দিন খায়, দিন মজুর শ্রেণী, তাদের কাছে আমাদের খাদ্য পৌঁছে দেয়া একান্ত জরুরী। তাদের সুরক্ষার ব্যবস্থাও করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমি সকলবে বলবো ঘাবড়ালে চলবে না। এই অবস্থার মোকাবেলা করতে সকলকে প্রস্তুত থাকতে হবে এবং সেভাবেই সবাইকে চলতে হবে, যাতে আমরা দেশের জনগণকে সুরক্ষিত করতে পারি।’
তিনি বলেন, ‘অনেক বন্ধুপ্রতীম দেশ আমাদের কাছ থেকে সহযোগিতা চাচ্ছেন এবং আমরা সেই সহযোগিতা করতেও প্রস্তুত।’
শেখ হাসিনা আজ বিকেলে তাঁর তেজগাঁওস্থ কার্যালয়ে (পিএমও) প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে বিভিন্ন সরকারী এবং বেসরকারী প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত অনুদানের চেক গ্রহণকালে ভাষণে একথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে গণভবন প্রান্ত থেকে এই অনুষ্ঠানে যুক্ত হন। তাঁর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে পিএমওতে অনুদানের চেক গ্রহণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার ডাকে সাড়া দিয়ে আমরা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছি। আমরা বিজয়ী জাতি। যেকোন ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলার মত শক্তি ও সাহস আমাদের রয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি।
শেখ হাসিনা বলেন, অনেকেই এখন গ্রামে চলে গেছেন। তাঁরা এখন বসে না থেকে যার যেখানে যতটুকুই জমি আছে সেই জমি যাতে অনাবাদি না থাকে। তাতে ফসল ফলান।
তিনি আশংকা ব্যক্ত করে বলেন, ‘এই করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী যে অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে তাতে ব্যাপকভাবে খাদ্যাভাব দেখা দিতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের একট সন্তুষ্টির বিষয় হচ্ছে আমাদের মাটি অত্যন্ত উর্বর, মানুষগুলো কর্মঠ, আমাদের খাদ্যের কোন সমস্যা হবেনা।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘মাটি ও মানুষ মিলে যদি আমরা কাজ করি তাহলে নিজেদের খাদ্য নিজেরাই জোগাড় করতে এবং অন্যকেও আমরা সহযোগিতা করতে পারবো।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের বন্ধুপ্রতীম দেশ যারা সহযোগিতা চেয়েছেন তাঁদেরকেও সহযোগিতা করতে পারবো। সেই সক্ষমতা আমাদের রয়েছে এবং মানবিক কারণেই আমরা তা করবো। শুধু নিজেদের দেশ নয়, অন্য দেশেরও যদি কিছু প্রয়োজন হয় তাহলে সেদিকে আমরা বিশেষভাবে দৃষ্টি দেব।’
শেখ হাসিনা বলেন, বাঙালিরা কখনো হারেনি, আমরা হারবোনা, এই আত্মবিশ্বাস নিয়ে সবাইকে চলতে হবে। সেজন্য নিজেকে যেমন সুরক্ষিত রাখতে হবে তেমনি অপরকেও সুরক্ষিত রাখতে হবে।
তিনি বলেন, অন্যের প্রতিও আমাদের দায়িত্ববোধ রয়েছে। সেই দায়িত্বরোধ নিয়ে চললে ইনশাল্লাহ আমরা এই অবস্থার থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারবো।
তিনি বলেন, গত ২৪ ঘন্টায় আর কোন করোনাভাইরাস অক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়নি। গতকালকেও আমরা সেটা দেখেছি। এটা ভাল লক্ষণ। কিন্তু এই অবস্থা আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সবাই দোয়া করবেন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেন আমাদের এই মহাবিপদ থেকে উদ্ধার করেন। শুধু আমরা নয়, বিশ্বব্যাপীই যে অবস্থা সকলকেই যেন তিনি সুরক্ষিত করেন।’

প্রধানমন্ত্রী করোনাভাইরাস সম্পর্কে বলেন, ‘বিশ্বজুড়েই এটি ঘাতকের মত আবির্ভূত হয়েছে। অবশ্য সুস্থ হয়ে যাচ্ছে মানুষ, তবে অতীতে কখনো এরকম হয়নি। আর এ ধরণের পরিস্থিতি শতবছরে একবার করে আসে। যা অতীতেও দেখা গেছে।’
১৭২০ সালে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া প্লেগ, ১৮২০ সাল এবং ১৯২০ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ছড়িয়ে পরা মহামারির উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘যে কারণে সারাবিশ্বই যেন আজ স্তব্ধ হয়ে গেছে, থেমে গেছে।’
নিজে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে চেক গ্রহণ প্রসংগে শেখ হাসিনা বলেন, ‘নিয়ম করলে (সকলকে ঘরে থাকার) নিজেকেওতো তা মানতে হয়। নিজেই যদি না মনি তাহলে সকলকে মানতে বলবো কিভাবে?’
নিজের জন্য না হলেও পারিপার্শ্বিক লোকজন এবং নিরাপত্তাকর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করেই এদিন বিশেষ ব্যবস্থায় চেক গ্রহণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁর পক্ষে মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস চেক গ্রহণ করছেন।
তিনি বলেন, অতীতে যদিও এরকম কখনো করিনি, নিজেকে একজন বন্দীর মতই মনে হচ্ছে। যদি আমি অনুষ্ঠানস্থল উপস্থিত থাকতে পারতাম তাহলে ভাল হত। কারণ যারা আজকে এসেছেন অতীতে দেশের যেকোন দুর্যোগে তাঁরা সবসময়ই আমাদের পাশে দাাঁড়িয়েছেন, জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং আমি নিজে উপস্থিত থেকেই গ্রহণ (অনুদান) করেছি।
২৫ মার্চ সন্ধ্যায় স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে করোনাভাইরাস দুর্যোগ মোকাবেলায় সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসর যে আহবান জানান তাতে সাড়া দিয়ে আজ যে সমস্ত প্রতিষ্ঠান সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তাঁদের ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনার বিস্তার যাতে না হয় সেজন্যই আমরা বাংলাদেশে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি এবং সেটা অব্যাহত রাখছি।
তিনি বলেন, তাঁর সরকার এই রোগ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করাসহ একটার পর একটা পদক্ষেপ নিয়েছে এবং দেশের উৎপাদন যেন ব্যাহত না হয় ও দেশের মানুষ যাতে আর্থিকভাবে কষ্ট না পায় সে ব্যবস্থাও করেছে।
তিনি সরকারী ছুটি ঘোষণার প্রসঙ্গে বলেন, সকলে ঘরে থাকবে এবং কোন কাজ থাকলে ঘরে বসে করবে। কিন্তু মানুষের সঙ্গে একটু দুরত্ব বজায় রাখবে, যাতে মানুষে মানুষে সংক্রামিত হতে না পারে।
কিছু প্রবাসীরা হঠাৎ দেশে চলে আসায় যেসব জায়গায় এই রোগের লক্ষণ দেখা গেছে তার বিস্তার রোধে তাঁর সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটার বিস্তার যাতে না হয় সে জন্য যথাযথ ব্যবস্থা আমরা বাংলাদেশে নিতে সক্ষম হয়েছি এবং প্রথমে সচেতনতা সৃষ্টির পর ধাপে ধাপে পরিকল্পিতভাবে আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ করে দিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘বলতে গেলে সেই জানুয়ারি মাস থেকেই আমাদের এই পদক্ষেপগুলো চলছে।’
তিনি বলেন, ‘পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্প কারখানায় মালিক-শ্রমিক একযোগে বসে অনেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন-তারা চালাতে (শিল্প কারখানা) পারবেন, তবে, তাঁদের সুরক্ষা ব্যবস্থা নিতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী নি¤œবিত্ত এবং খেটে খাওয়া মানুষদের খাদ্যভাবের আশংকা ব্যক্ত করে বলেন, অনেকেই আছেন যারা দিন এনে দিন খেয়ে চলতে পারেন। কিন্তু তাঁদের আর্থিক অবস্থা এত ভাল নয় যে, তাঁরা জিনিষ পত্র জমা করে রাখবে এবং দিনের পর দিন চলতে পারবে। কাজ না করে বসে থাকলে তারাতো চলতে পারবেন না। কাজেই দীর্ঘদিন এই অবস্থা চলার ফলে তাঁরা ইতোমধ্যেই খুব কষ্টে আছেন।
এসব দুর্গত মানুষদের সহযোগিতার জন্য তাঁর সরকারের ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই খাদ্য সাহায্য পাঠিয়েছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভিজিডি, ভিজিএফ, সরকারের বৃত্তি এবং উপবৃত্তি সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর কর্মসূচিগুলো অব্যাহত থাকবে।
এসব কর্মসূচি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত মুখ্য সচিব সহ সংশ্লিষ্ট মহলকে দিন মজুর ও খেটে খাওয়া শ্রেণীর জনগণের একটি তালিকা প্রণয়নেরও নির্দেশ দেন।
তিনি বলেন, ‘দিন মজুরদেরও একটি তালিকা করতে হবে এবং তাঁদের মাঝেও আমাদের খাদ্য পৌঁছে দিতে হবে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘এজন্য তালিকা প্রণয়ন করা হযেছে, এ ধরনের আরো তালিকা করার দরকার। যারা তালিকার বাইরে রয়েছেন তাঁদের জন্যও ব্যবস্থা করার দরকার রয়েছে।’
ডাক্তারদের পাশাপাশি নার্সদের সুরক্ষার জন্য পোষাক এবং পিপিই সামগ্রী প্রদানের প্রতি বিশেষভাবে নজর দেয়ার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, তারাই মূলত রোগী নাড়াচাড়া করেন। এছাড়া হাসপাতালের অন্য যারা কাজকর্মে যুক্ত থাকেন তাঁদেরও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘সেজন্য আমরা নিজেরাও ব্যবস্থা নিচ্ছি এবং প্রত্যেকটি জেলা-উপজেলা এবং ইউনিয়ন-ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত হাত ধোয়ার সাবান থেকে শুরু করে খাদ্য দ্রব্য এবং যা যা প্রয়োজন তা আমরা পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা নিচ্ছি এবং পৌঁছে দেব।’
সরকার প্রধান বলেন, ‘কারণ মানুষকে কেবল ঘরে আটকে রাখলে হবে না তাদের খাদ্য এবং জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। কাজেই সেইদিকে আপনাদের বিশেষভাবে নজর দেয়া দরকার।’
এদিন বিভিন্ন সরকারী এ বেসরকারী প্রতিষ্ঠান এবং সংস্থা তাঁদের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের একদিনের বেতন এবং বৈশাখী উৎসব ভাতার অর্থ সহ পিপিই সামগ্রী প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে প্রদান করেন।
প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে- বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী, বাংলাদেশ এ্যাডমিনিষ্ট্রেটিভ সার্ভিস এ্যাসোসিয়েশন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি, বসুন্ধরা গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, নাভানা গ্রুপ, হোসাফ গ্রুপ, কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্স লিমিটেড, আবুল খায়ের গ্রুপ, সামিট পাওয়ার লিমিটেড, কনফিডেন্স পাওয়ার কোম্পানী লিমিটেড, দি ওয়েস্টিন হোটেল, সিএমসি চায়না এবং লা মেরিডিয়ান।

image_printPrint