রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান মিয়ানমারকেই করতে হবে : প্রধানমন্ত্রী

290

ঢাকা, ২ অক্টোবর, ২০১৯ (বাসস) : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও বলেছেন, মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা সংকট সৃষ্টি করেছে এবং তাদেরকেই এর সমাধান করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন ফোরামে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যখনই এবং যা-ই আলোচনা করেছি, সবাই এ ইস্যুতে সহানুভূতিশীল এবং সত্যিই মনে করেন যে, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক এবং তাদের নিজ বাসভূমিতে ফিরে যাওয়া উচিত।’
প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ (ইউএনজিএ)’র ৭৪তম অধিবেশনে যোগদান উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সফরকালে ভয়েস অব আমেরিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে একথা বলেন।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে বাংলাদেশ মিয়ানমারের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সাড়া পাচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট মিয়ানমার সরকারের সৃষ্টি। কারণ দ্বন্দ্বটা হচ্ছে মিয়ানমার সরকার ও তাদের নাগরিক রোহিঙ্গাদের মধ্যে। যেহেতু এটি মিয়ানমারের একটি অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং তারাই এ সমস্যা সৃষ্টি করেছে, সেহেতু তাদেরই এ সমস্যার সমাধান করতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিকরা যে অন্য দেশে অবস্থান করছে তা মিয়ানমারের জন্যও মর্যাদা ও সম্মানের বিষয় নয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্যাতন ও জাতিগত নিধনের মুখে রোহিঙ্গারা পালিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ার পর বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকে নজির বিহীন সাড়া পেয়েছে। তারা তহবিল, খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এসেছেন।
তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারের ওপর বিপুল চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, কিন্তু আমরা এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে তেমন একটা সাড়া পাচ্ছি না। তবে, সকল রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধানগণ চান যে মিয়ানমার এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিক এবং তারা তাদের নাগরিকদের মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে ফিরিয়ে নিক।
রোহিঙ্গা সংকট এখন তৃতীয় বছরে পা রেখেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে যখনই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে উদ্্েযাগ নেয়া হয়েছে, তখনই কোন না কোন সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে এবং রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো যায়নি।
ইউএনজিএ’তে চার দফা প্রস্তাব উত্থাপনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, মিয়ানমার ঠিক কখন তাদের নাগরিকদের ফেরত নেবে তার একটা সময়সীমা বেঁধে দেয়া তার পক্ষে সম্ভ^ব না, তবে তাদের যত দ্রুত সম্ভব ফিরিয়ে নেয়া উচিত।
দুর্নীতি ও অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, দলমত, কে তার আত্মীয়-স্বজন কিংবা তারা কে সমাজের কত উঁচু তলার সদস্য তা নির্বিশেষে এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
তিনি বলেন, ‘আমি জানি যে এটি খুব ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিক হওয়ার পর কেউ কেউ তাদের সম্পদ দেখানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতে উঠে। আমাদের সমাজকে এ থেকে রক্ষা করতে হবে। গুটি কয়েক লোক এসব করছে। যার প্রভাব গভীর। তবে বেশির ভাগ লোক এসব করছে না। আমাদের সমাজ, জনগণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এ থেকে বাঁচাতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি আগের সন্ত্রাসবাদ ও মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানের মত দুর্নীতির বিরুদ্ধে এ অভিযান অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত এ চিন্তা থেকে নিয়েছেন যে, উন্নয়ন বরাদ্ধ সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে দ্রুত আরো অনেক উন্নয়ন করা সম্ভব হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, কেবল উন্নয়ন টেকসই হলে সমাজ থেকে বৈষম্য দূরীভূত হবে, শিশু ও যুবকরা লোভ-লালসার দিকে না গেলে এবং তারা চমৎকার নৈতিকতা ও আদর্শ নিয়ে বেড়ে উঠলে তবেই সমাজ উচ্চতর নৈতিকতা ও আদর্শ সহকারে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।’ তিনি আরো বলেন, এই চিন্তা-ভাবনা থেকেই তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
দেশের স্বাধীনতা অর্জনের প্রায় ৫০ বছরও কেন কোন শক্তিশালী বিরোধীদলের সৃষ্টি হয়নি, এ প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, নির্বাচন কমিশনে প্রায় ৪৫টি রাজনৈতিক দল নিবন্ধিত হলেও বিএনপির মত দল দুর্নীতি, সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ, অর্থপাচার, গ্রেনেড হামলার সঙ্গে জড়িত এবং এ কারণেই তারা জনগণের বিশ্বাস ও আস্থা হারিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘নৈতিকতা বিহীন কোন দল জনগণকে কিছু দিতে পারে না। কিন্তু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে দেশের স্বাধীনতা আনায়নকারী দল আওয়ামী লীগ সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করেছে। এ কারণেই জনগণ তাদের ভোট দিয়ে বারংবার ক্ষমতায় এনেছে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের বারংবার ক্ষমতায় আসার কারণেই বাংলাদেশ মর্যাদা ও শ্রদ্ধা অর্জন করতে সক্ষম হয় ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হয় এবং আমরা উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে পারি।’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তৃণমূলে সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দেয়ার জন্যই তাঁর সরকার যত পরিকল্পনা ও কর্মসূচি গ্রহণ করছে।
তিনি উল্লেখ করেন যে, দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি গত অর্থবছরে ৮.১৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে এবং মাথা পিছু আয় দাঁড়িয়েছে ১৯০৯ ডলারে। জনগণের মৌলিক প্রয়োজন নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, তাঁর সরকার দারিদ্র্যের হার প্রায় ৪০ শতাংশ থেকে ২১ শতাংশে কমিয়ে এনেছি। তিনি আরো বলেন, ‘আমি এভাবে বলতে চাই যে প্রতি বছর আমরা উন্নতি করছি এবং তৃণমূলের মানুষের দিকে অগ্রসর হচ্ছি।’

image_printPrint