রংপুর, ২৯ জুলাই (বাসস) : নীলচাষ অবলুপ্ত হবার দেড়শ’ বছর পর বৃহত্তর রংপুরে আবারো নীল চাষ শুরু হয়েছে। রংপুর-নীলফামারীর ১০টি উপজেলার শতাধিক কৃষক তাদের বাড়ির আশপাশের আঙিনা, উঁচুভিটা ও বালুমাটি মিশ্রিত অনুর্বর জমিতে এই ঐতিহাসিক নীল চাষ শুরু করেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী রংপুর-নীলফামারীর ৪টি উপজেলায় প্রায় ১শ’ হেক্টর জমিতে বিচ্ছিন্নভাবে এই নীল চাষ হচ্ছে। রংপুরে নীল চাষিরা ইতোমধ্যে তাদের উৎপাদিত নীল একটি বেসরকারী সংস্থার মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে রফতানি করছে এবং প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ সুগম করেছে।
প্রায় সোয়া ২শ’ বছর আগে ১৭৭২ সালে বৃহত্তর রংপুর জেলায় নীল চাষ শুরুর পর এটি তৎকালীন সময়ে অর্থনৈতিক ফসল হিসাবে জনপ্রিয়তা লাভ করলেও ১৮৫৯ সালে ঐতিহাসিক নীল বিদ্রোহ সংঘটিত হবার পর এই অঞ্চলের নীল চাষের অবসান ঘটে।
রংপুর সদর উপজেলার রাজেন্দ্রপুর গ্রামের নীল চাষী আবদুল মোতলব জানান, তাদের পূর্ব পুরুষেরা এসব জমিতে একসময় নীল চাষ করতো। সময়ের স্্েরাতে নীল চাষের কথা এক সময় তারা ভুলেও গিয়েছিল। এসব জমিতে এতদিন আলু, তামাক এবং আমন চাষ হতো। মোতালেব জানান, কয়েকবছর আগে থেকে নীল পাতা পচানো বর্জ্য থেকে জৈব সার উৎপাদন এবং জমির উর্বরতা বাড়ানো, নীল গাছের খড়ি জ্বালানী হিসাবে ব্যবহারের প্রয়োজনে তারা নীল চাষ শুরু করেছিল। যা এখন এ অঞ্চলের দু’শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি ক্রমেই কৃষকদের অর্থনৈতিক ফসল হিসাবে নীল চাষের চাহিদা বাড়ছে।
তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে অভ্যাসবশত স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে আলু ও তামাক ফলনের পর এবং আমন চাষের আগে যে কয়েক মাস সময় তাদের ভিটেমাটি ও বালুমাটি মিশ্রিত জমি অব্যবহৃত থাকে, সেসব জমিতেই নীল চাষে ঝুকছে চাষীরা।
নীল চাষীরা জানান, পাট চাষের প্রক্রিয়ার মতোই নীল চাষ। নীলের পাতায় জৈব সার প্রক্রিয়াজাত হয়ে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। জমির রসের অভাব বা পানির অভাবে এখন আর জমি পড়ে থাকছে না। নীল চাষ করায় জমির উর্বরতা বাড়ছে। ফলে অন্যান্য ফসলের উৎপাদনও ভালো হচ্ছে।
চাষীরা জানান, নীল গাছের উপরি অংশের পাতা বেশ কয়েকবার কেটে নীল উৎপাদনের জন্য পানিতে ভিজিয়ে মজিয়ে রাখা হয়। এর পর প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নীল উৎপাদন করা হয়। নীলের নীচের অংশ খড়ি বা লাকড়ি হিসাবে জ্বালানির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। নীলের পাতা পচানো অংশ জৈব সার হিসাবে জমির উর্বরতা বাড়াচ্ছে। এতে কৃষকদের বেশ লাভ হচ্ছে। ফলে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে নীল চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক মো. হাসানুর রহমান বলেন, প্রায় দেড়শ’ বছর আগে অবলুপ্ত নীল চাষের বিষয়টি বর্তমানে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উন্নয়ন পরিকল্পনা তালিকায় না থাকলেও নীল চাষ এখন এই অঞ্চলে পুনরায় অর্থকরী সম্ভাবনাময় ফসল হিসাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
তিনি জানান, রংপুর সদর উপজেলার হরিদেবপুর, মমিনপুর, রাজেন্দ্রপুর, গঙ্গাচড়া উপজেলার খলেয়াগঞ্জিপুর, কোলকোন্দ, আলমবিদিতর, তারাগঞ্জ উপজেলার একরচালী ইউনিয়ন নীলফামারীর জেলার কিশোরগঞ্জ এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে নীলচাষ হচ্ছে। আগামীতে এই নীল চাষ কৃষকদের অন্যতম প্রধান ফসল হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন।
রাজেন্দ্রপুর গ্রামে নীল চাষীদের সংস্থা ‘নিজেরা কটেজ এন্ড ভিলেজ ইন্ডাষ্ট্র্রিজ (এনসিভিআই) প্রাঃ লিঃ’ এর চেয়ারম্যান সুমন্ত কুমার জানান, এলাকার গরীব কৃষকেরা তাদের জমির উর্বরতা বাড়ানো এবং রান্নাবান্নার লাকড়ির চাহিদা মেটাতেই সীমিত পরিমাণ নীলচাষ করতো। এখন এটি শিল্পে রূপ নিয়েছে। নীল চাষের পাশাপাশি নীল উৎপাদনের কারখানা গড়ে উঠেছে। সংস্থার সহায়তায় রাজেন্দ্রপুর গ্রামের পঞ্চাশজন সদস্য মিলে নীলের ব্যবহারে উৎপাদন ও ডাইং করে স্কাপ, চাদর, কাঁথা তৈরি করে তা বিক্রি করছে। বৃহত্তর রংপুরে কর্মসংস্থান হয়েছে চরম দরিদ্র ৩৯৬ জন সদস্যের। এভাবে তারা দারিদ্র্য নিরসনের চেষ্টা চালাচ্ছে।
নীল উৎপাদন বিশেষজ্ঞ অপূর্ব দেব রায় জানান, রংপুরে বেসরকারী সংস্থা কেয়ারের অর্থায়নে দেশের প্রথম নীল প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত মানের নীল তৈরি করে বিদেশে রফতানির ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, প্রকৃতিগতভাবে বাংলাদেশে একমাত্র রংপুরের মাটিতেই নীল চাষ হয়ে থাকে। এই উৎপাদিত নীলের গুণগতমান বিশ্বে এল সালভেদরের পরে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।
তারা ইতোমধ্যে এই নীল ডাইং করে স্কাপ, চাদর ও কাঁথা তৈরী করে বিদেশের বাজারে রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মূদ্রা আয় করেছে। কলকাতা ও ভারতের বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও তারা রফতানি অর্ডার পাচ্ছে বলে অপূর্ব দেব জানান।