ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারী ২২, ২০১৮

সংবাদ শিরোনাম 

বিভাগীয় সংবাদ : নড়াইলে লাখো মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করে ব্যতিক্রমী আয়োজনে ভাষা শহীদদের স্মরণ   |   

নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে মিরাশার চাষিবাজার

শরীয়তপুর, ২৪ জানুয়ারি, ২০১৮ (বাসস) : দেশের প্রচলিত কৃষি পণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনাকে ছাপিয়ে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করছে জাজিরার মিরাশার চাষি বাজার। শরীয়তপুর-ঢাকা মহাসড়কের পাশে জেলার জাজিরা উপজেলার মুলনা ইউনিয়নের মিরাশার গ্রামের কাজিরহাট সংলগ্ন স্থানে অস্থায়ীভাবে স্থাপিত মাত্র ৩২ শতক জমির উপর স্থাপিত বাজারটি ৯ বছরের ব্যবধানে সম্প্রসারিত হয়েছে এক একর জমিতে। এখানে এখন বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকার কৃষি পণ্যের বেচাকেনা হয়। কোন মধ্য সুবিধাভোগী না থাকায় প্রতি বছরই বাজারটিতে বাড়ছে ক্রেতা বিক্রেতার সমাগম। কৃষি বিভাগ বলছেন এ প্রকৃতির কৃষি বাজার ব্যবস্থা দেশব্যাপী নিশ্চিত করা গেলে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাবে কৃষি, এগিয়ে যাবে দেশ।
২০০৮ সালে বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর সহযোগিতায় ও স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে স্থাপিত হয় মিরাশার চাষি বাজার বহুমুখী সমবায় সমিতি। বছরের ছয় মাস কিছু কিছু বেচা-কেনা হলেও নভেম্বর থেকে মার্চ/এপ্রিল পর্যন্ত বাজারের বেচাকেনা থাকে জমজমাট। প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত কৃষক, স্থানীয় পাইকার ও দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারের পদচারণায় মুখর থাকে। নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এখানে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি টাকার কৃষিপণ্য বেচা কেনা হয়। এখানে কোন মধ্য সুবিধাভোগী না থাকায় কৃষকরা বেশি লাভবান হওয়ার পাশাপাশি পাইকাররাও বেশ লাভবান হচ্ছেন। এ বাজারের সবজিসহ কৃষি পণ্য জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের অন্যান্য জেলাসহ রফতানি হয় বিদেশেও। তাই মিরাশার চাষি বাজারের সুনাম এখন দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে।
মিরাশার চাষি বাজার সমবায় সমিতির নিয়মিত পাইকার মো. মুরাদ হোসেন চুন্নু বলেন, এ বাজারের করলা নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিনি প্রায় ৩০-৩৫ মণ রফতানি হয় ইটালী, দুবাই, ও বাহরাইনসহ বিভিন্ন দেশে। এ বাজারে কৃষক ও পাইকারদের কাছ থেকে কোন খাজনা না তোলায় এখন জেলার বাইরের অনেক পাইকার এখানে আসছেন।
জাজিরা উপজেলার মুলনা ইউনিয়নের কৃষক মো. আলাউদ্দিন মোল্লা বলেন, মিরাশার চাষি বাজারটি প্রতিষ্ঠার আগে আমাদের সবজি দালালদের (মধ্য সুবিধাভোগী) দৌরাত্বের কারণে অনেক কম দামে বিক্রি করতে হতো। আবার দূরের বাজারে গেলে অনেক খাজনাও দিতে হতো। কিন্তু মিরাশার চাষি বাজার বহুমুখী সমবায় সমিতি চালু হওয়ার পর থেকে এখন আমাদের সবজি বিক্রি করতে কোন কষ্ট হয় না। এখন আমরা সবজিসহ বিভিন্ন ফসলের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছি। এছাড়া আমাদের দিনের নির্দিষ্ট কাজ শেষ করে বিকেলে যখন কাজ থাকেনা তখন অতি সহজেই এখানে নিয়ে আসতে পারি। এবং আমাদের দিনের নির্দিষ্ট শ্রমেরও কোন অপচয় হয় না।
বরিশালের সবজি পাইকার আফসার উদ্দিন বলেন, নভেম্বর মাস থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত প্রতিদিনই আমি এ বাজার থেকে মৌসুম অনুযায়ী কালা বেগুন, করলা, পেঁয়াজ, রসুন, কাচা মরিচ, ধনে পাতা, টমেটো সহ নানা সবজি কিনে নিয়ে যাই। এসকল সবজি ভাঙ্গা, ফরিদপুর, মাদারীপুর, বরিশাল, ভোলাসহ বিভিন্ন পাইকারী বাজারে নিয়ে বিক্রি করি।
ঢাকা কারওয়ান বাজারের পাইকার মো. আলাওল মিয়া বলেন, নভেম্বর থেকে জানুয়ারি/ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ৬০-৬৫ মণ করলা এখান থেকে কিনে নিয়ে যাই। তার পরে ঢাকায় যেয়ে এর মধ্য থেকে বাছাই করে ৩০ মণ করলা অন্য বড় পাইকারের মাধ্যমে বাহরাইন, দুবাই ও ইটালীসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি হয়। এ বাজারে টাটকা সবজি পাওয়া যায় বলে এটার একটু চাহিদাও অনেক বেশি। ফলে আমরাও কৃষকদের একটু বেশি দাম দিতে পারি। এতে আমাদেরও অনেক লাভ থাকে।
বাজার কমিটির সভাপতি মো: সিরাজুল হক খান বলেন, কৃষক ও পাইকারদের হয়রানি বন্ধে কমিটির লোকজন সার্বক্ষণিক মনিটরিং করে। কোন অভিযোগ থাকলে আমরা তাৎক্ষণিক তা সমাধান করি। প্রতি বছর, প্রতি মাসে ও প্রতি দিনই এ বাজারে ক্রেতা বিক্রেতার সমাগম বৃদ্ধি পাচ্ছে। ৩২ শতক জমির প্রথম প্রতিষ্ঠা হলেও সময়ের চাহিদা অনুযায়ী এখন এ বাজারের পরিধি ১০০ শতক ছাড়িয়ে গেছে। এ বাজারটির সুনাম এখন দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। বছরে গড়ে ৯৫ কোটি টাকা থেকে ১০০ কোটি টাকারও বেশি বেচা-কেনা হয় এ বাজারে।
শরীয়তপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধি দপ্তরের উপ-পরিচালক মো: রিফাতুল হোসাইন বলেন, মিরাশার চাষিবাজারটি জাজিরাসহ জেলার কৃষকদের কল্যাণে পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাগণকে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় নিয়মিত নজরদারি করার পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে। কোন মধ্য সুবিধাভোগী না থাকায় এখানে কৃষকরা অন্য বাজারের চেয়ে একটু বেশি দাম পায়। তাই এখানে দিন দিন কৃষক, ক্রেতার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এ বাজারটি এখন শরীয়তপুরের কৃষকদের স্বপ্ন পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এচাড়াও এ বাজারটি সারা দেশের প্রচলিত কৃষি পণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনাকে ছাপিয়ে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করবে। যা দেশের কৃষিকে নিয়ে যাবে এক অন্য উচ্চতায়।