ঢাকা, বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী ১৮, ২০১৮

সংবাদ শিরোনাম 

আন্তর্জাতিক সংবাদ : নির্ধারিত সময়ে কম্বোডিয়ার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে : কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী   |   

চট্টগ্রাম বন্দরে অপারেশন জ্যাকপট : মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তি সম্পর্কে ধারণা পেয়েছিল সারা বিশ্ব

॥ দেবদুলাল ভৌমিক ॥
চট্টগ্রাম, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৬ (বাসস) : মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম বন্দরে অপারেশন জ্যাকপট এর মাধ্যমে পাকিস্তানি অস্ত্রবাহী জাহাজসহ বিদেশী জাহাজ ধ্বংসের ঘটনা ছিল একটি বিশাল ইতিবাচক দিক। এ সাহসী অভিযানের প্রেক্ষিতে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি ও মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তি সম্পর্কে সারা বিশ্ব আগাম ধারণা পেয়ে যায়। এ অপারেশন স্বাধীনতার বিজয়কে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল চট্টগ্রাম জেলা শাখার সভাপতি মোহাম্মদ শাহাবউদ্দিন।
সেজান মাহমুদের লেখা অপারেশন জ্যাকপট থেকে ও চট্টগ্রাম জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সাহাবুদ্দিনের সাথে কথা বলে জানা যায় একাত্তরে বিশ্বকে তাক লাগানো এ গেরিলা যুদ্ধের নানা কথা আড়াই-তিন মাসের দীর্ঘ কষ্টকর প্রশিক্ষণ শেষে সুইসাইড স্কোয়াডের ৬০ জনের দলটি ৭১-র আগস্টের প্রথম দিকে ভারত সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে পৌঁছে। বড়দারোগাহাটে কিছুদিন অবস্থান করে দলটি । উদ্দেশ্যে, অপারেশন জ্যাকপট। চট্টগ্রাম বন্দরে অবস্থানরত বিদেশী জাহাজগুলো ধ্বংস করা।
২০ জন করে প্রশিক্ষিত ৩টি দলের কমান্ডার ছিলেন মজহার উল্যা (বীরউত্তম), ডা. শাহ আলম (বীর উত্তম) এবং আব্দুর রশিদ। ৩টি দলের সার্বিক কমান্ডার ছিলেন আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী। মীরসরাই থেকে কৌশলে পাক আর্মিদের চোখ এড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধারা কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে চট্টগ্রাম শহরের হাজিপাড়া সেন্টার, নাসিরাবাদ কাকলী বিল্ডিংসহ কয়েকটি শেল্টারে এসে পৌঁছে।
মীরসরাই থেকে মাইন ও অস্ত্রের চালান চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন শেল্টারে পৌঁছানো হয়। এ কাজে মুক্তিযোদ্ধা জানে আলমের বিশাল ভূমিকা ছিল। তিনি একটি গাড়িকে বরের গাড়ির মত সাজিয়ে তাতে মাইনসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র পরিবহন করেছিলেন।
অপারেশন জ্যাকপটের ঈঙ্গিত সম্পর্কিত ২টি গান চিহ্নিত করা হয়েছিল। তা শুধুমাত্র কমান্ডাররা জানতেন। কলকাতার আকাশবাণী থেকে গান দুটি প্রচারের ব্যবস্থা করা হয় আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান, তার বদলে চাইনি কোন দান এবং আমার পুতুল আজকে যাবে শ্বশুর বাড়ি। প্রথম গানটি শুনলে প্রস্তুত হতে হবে। আর ২৪ ঘন্টা পর দ্বিতীয় গান শুনলে সে রাত ১২ টায় অপারেশন। এভাবে ভারতে বসেই অপারেশন নিয়ন্ত্রন করার ব্যবস্থা করা হয়। ১৩ আগস্ট যোদ্ধারা মীরসরাই থাকতেই প্রথম গান শুনিয়ে যোদ্ধাদের প্রস্তুত করা হয়। ওইদিন রাতের মধ্যে যোদ্ধারা কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে পৌঁছে যায়। সকালে সাধারণ মানুষের মত নদীতে সাঁতার কেটে রেকি করেন কমান্ডাররা। একইসাথে নদী পথের দূরত্বও আঁচ করা হয়।
১৪ আগস্ট রাত। আব্দুল ওয়াহেদ, মজহার উল্যা, ডা. শাহ আলমের নেতৃত্বে ৩৯ জনের দলটি কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীর আনোয়ারা লাক্ষার চরে অবস্থান নেয়। সব প্রস্তুত। কিন্তু বৃষ্টির জন্য শেষ পর্যন্ত ১৪ আগস্টের অপারেশন বাতিল করা হয়। ১৫ আগস্ট সকালে ২নং জেটি থেকে ১৬ নং জেটি পর্যন্ত অবস্থানরত টার্গেট শিপগুলো পরিদর্শন করেন মজহার উল্যাসহ আরো কয়েকজন।
১৫ আগস্ট রাত । প্রত্যেক যোদ্ধার বুকে সাড়ে ৫কেজি ওজনের একাটি করে লিমপেড মাইন বেঁধে দেয়া হয়। একটি করে ছুরিও দেয়া হল জাহাজের গায়ে শেওলা পরিস্কারের জন্য। সবার পায়ে সাঁতার সহায়ক পিনস পরিয়ে দেয়া হল। রাত সাড়ে ১২টা বাজল। অন্ধকারে নিস্তব্ধ কর্ণফুলীতে ঝাঁপিয়ে পড়ল যোদ্ধারা। যেকোন সময় পাক সেনাদের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যেতে পারে শরীর। সেসময় বন্দর রক্ষার দায়িত্ব পালন করছিল বেলুচ রেজিমেন্ট এবং এয়ারপোর্ট রক্ষায় পাঞ্জাব রেজিমেন্ট। তখন পাক সেনাদের তীক্ষ নজর শত্রুপক্ষের উপর। মজহার উল্যার টার্গেট ছিলো পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সুসজ্জিত অস্ত্রবোঝাই হরমুজ জাহাজটি। একে একে সকলে যার যার টার্গেট জাহাজে মাইন বসিয়ে নিজ নিজ অবস্থানে পৌঁছায়।
৪০ থেকে ৬০ মিনিটের মধ্যে বিকট শব্দে মাইনগুলো বিস্ফোরিত হতে শুরু করলো। বিধ্বস্ত জাহাজগুলো একে একে তলিয়ে যেতে থাকে কর্ণফুলীর জলে। সেদিনের সফল অপারেশনে বিশালাকায় আল আব্বাস এবং অস্ত্র বোঝাই হরমুজসহ ১২-১৩টি ছোট বড় জাহাজ ধ্বংস হয়েছিলো। চট্টগ্রাম বন্দরে এ হামলা পাকিস্তানি বাহিনীর ভিতকে ভালোভাবেই নাড়িয়ে দেয়। বিশ্ব প্রচার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের এ দুঃসাহসী অভিযানের কথা ব্যাপকভাবে প্রচার পায়। পরবর্তীতে মজহার উল্যা, ডা.শাহ আলম, ফারুক-ই আজম, অনিল বরন রায় প্রমুখের নেতৃত্বে আরো কয়েকটি অপারেশনের মাধ্যমে গভীর সাগরে তেলের ট্যাংকারসহ পাকিস্তানিদের সহায়ক বেশকিছু জলযান ধ্বংস করা হয়।