ঢাকা, মঙ্গলবার, জানুয়ারী ১৬, ২০১৮

সংবাদ শিরোনাম 

আবহাওয়া : আগামীকাল থেকে দক্ষিণাঞ্চলের শৈতপ্রবাহ কেটে যেতে পারে   |    আন্তর্জাতিক সংবাদ : জাপানের জলসীমায় ভেসে আসা নৌকা থেকে ৮ জনের লাশ উদ্ধার * লিবিয়ার পশ্চিম উপকূল থেকে অবৈধ ৩৬০ শরণার্থী উদ্ধার   |   

প্রচন্ড যুদ্ধ শেষে জয়দেবপুর পাক হানাদার মুক্ত হয় একাত্তরের ১৫ ডিসেম্বর

॥ আতাউর রহমান ॥
ঢাকা, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৫ (বাসস) : একাত্তরের ১৫ ডিসেম্বর প্রচন্ড যুদ্ধ শেষে পাক হানাদার মুক্ত হয় রাজধানী শহর ঢাকা থেকে ত্রিশ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত জয়দেবপুর। যার বর্তমান নাম গাজীপুর।
প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধের আহবায়ক ও বর্তমান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক এ ব্যাপারে বাসসকে বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসেও জয়দেবপুরের স্মৃতি গাঁথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে এবং থাকবে চিরকাল।
প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে মন্ত্রী আরো বলেন, ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চে মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে গাজীপুরের লাল মাটি হতে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়েছিল। আবার ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের একদিন আগে ১৪ ডিসেম্বর রাতভর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সাথে সর্বশেষ প্রচন্ড সমুখ যুদ্ধ শেষে গাজীপুর পাক হানাদার বাহিনীর কবল হতে মুক্ত হয়।
আকম মোজাম্মেল হক বলেন, ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ তৎকালীন গাজীপুর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে জকী স্মৃতি প্রাইমারী স্কুলের সামনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এক সভা আহবান করা হয়। উক্ত সভায় সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন জয়দেবপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ডাঃ সাঈদ বক্স ভূইঁয়া। এ সময় দেশ জুড়ে একটি শ্লোগান ওঠে জয়দেবপুরের পথ ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর, বীর বাঙ্গালী অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর এ শ্লোগান দিয়ে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। এ সময় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মোঃ শহীদল্লাহ বাচ্চু, হারুনুর রশীদ, কাজী আলিম উদ্দিন বুদ্দিন প্রমুখ মুখ্য ভুমিকা পালন করেন।
১৪ ডিসেম্বর জয়দেবপুর রাজবাড়ীতে অবস্থানরত পাক হানাদার বাহিনীকে হটিয়ে জয়দেবপুরকে মুক্ত করার লক্ষ্যে মোঃ শহীদুল্লাহ বাচ্চু, প্রয়াত শহীদুল ইসলাম পাঠান, ভুলু ও কাজী আলিম উদ্দিন বুদ্দিন এর নেতৃত্বে অভিযান পরিচালিত হয়। ভুলুর গ্রুপে খোকনও অংশ নেয়। এক পর্যায়ে খোকন বর্তমান কেবির মার্কেটের পিছনে অবস্থানরত অবস্থায় তার গ্রুপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
১৬ই ডিসেম্বর জয়দেবপুর ফুড গোডাউনের একটি কবরে বদিউজ্জামান ভূইঁয়া ওরফে খোকনের লাশ পাওয়া যায়। ১৪-১৫ ডিসেম্বর জয়দেবপুর রেল ষ্টেশনের নিকট গোলাগুলির সময় কানাইয়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা বদরুজ্জামান খোকন শহীদ হন। ১৫ ডিসেম্বর সকালে জয়দেবপুরসহ আশেপাশের এলাকা দখলদার মুক্ত হয়। তবে ছয়দানায় দেশের সর্ববৃহৎ এবং সর্বশেষ যুদ্ধ শুরু হয় যা ১৬ ডিসেম্বর সকাল পর্যন্ত চলে যুদ্ধে পাকহানাদার বাহিনীর সকলেই নিহত হয়।
গাজীপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও সাবেক এমপি কাজী মোজাম্মেল হক বাসসকে বলেন ১৯ মার্র্চের আগে ৫ ও ৬ মার্চ , ১৭ ও ১৮ মার্চ ১৯৭১ সালে টঙ্গির বিভিন্ন স্থানে পাক হানাদার বাহিনী শ্রমিক জনতার ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল নিষ্ঠুরভাবে। ৫ মার্চ ১৯৭১ সালে টংগীস্থ মেঘনা টেক্সটাইল মিলের শ্রমিক জনতার সাথে পাক হানাদার বাহিনীর সম্মুখ সংঘর্ষে চারজন শাহাদাত বরণ করেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন মোতালেব, রইছ উদ্দিন, ইস্রাফিল অন্যতম। ১৫ ডিসেম্বরের আগে ১৪ ডিসেম্বর এই এলাকার বিভিন্ন স্থানে প্রচন্ড যুদ্ধ শেষে ভোরে টঙ্গি ও গাজীপুর পাক হানাদার মুক্ত হয়। এর আগে ১৪ অক্টোবর রাতে ধীরাশ্রমে মুক্তিযোদ্ধারা রেললাইন উপড়ে ফেলে এবং ভোররাতে জয়দেবপুর দক্ষিণ সিগন্যাল সংলগ্ন সেতু মাইন বিষ্ফোরণে উড়িয়ে দিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
কাজী মোজাম্মেল আরো জানান , ১৪ ডিসেম্বর বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের গ্রাম হায়দরাবাদে পাক হানাদার বাহিনীর সাথে প্রচন্ড যুদ্ধ হয় মিত্রবাহিনীর সাথে। এ সময় পাক বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন বেশ কয়েকজন। এর আগে ১০-১১ ডিসেম্বর গ্রুপ কমান্ডার মোঃ আব্দুল গণির নেতৃত্বে পূবাইলে পাকহানাদারদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধ হয়। এতে ১০ জন পাকসেনা নিহত ও ৩ জন বীর মুক্তি যোদ্ধা শহীদ হন। এর আগে ১৩ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা এবং নরসিংদী হতে মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট পরাজিত পাকবাহিনী ট্রেনে পূবাইল পৌঁছলে মুক্তিবাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গাজীপুরে বেশ কয়েকটি গণহত্যা সংঘটিত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল কালিগঞ্জ কটনমিল, জয়দেবপুর গণহত্যা, ইছরকান্দি গণহত্যা, শ্রীপুর গণহত্যা, শ্রীপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ক্যাম্পাস গণহত্যা, সমরাস্ত্র কারখানায় নির্যাতন ও গণহত্যা এবং বাড়িয়া গণহত্যা। মুক্তিযুদ্ধে গাজীপুরে শহীদ হন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন আবদুল বাতেন আকন্দ, আব্দুস সামাদ, মোঃ বাচ্ছু মিয়া, সুনীল, বাদশা, মাজেদ মিয়া, আবুল হোসেন প্রমুখ।
গাজীপুরের জয়দেবপুরে ভাওয়াল রাজ প্রাসাদে স্থাপন করা হয় তৎকালীন পাকিস্তানের ২য় ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সদর দপ্তর।