ঢাকা, বুধবার, জানুয়ারী ১৭, ২০১৮

সংবাদ শিরোনাম 

প্রধানমন্ত্রী : উন্নত দেশগুলোকে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর আহবান প্রধানমন্ত্রীর   |   আবহাওয়া : দেশের কিছু স্থানে শৈত্যপ্রবাহ কমবে   |   খেলাধুলার সংবাদ : জুনে ব্যাঙ্গালুরুতে ইতিহাসের প্রথম টেস্ট খেলবে আফগানিস্তান * মিরপুর স্টেডিয়ামের শততম ওয়ানডে ম্যাচে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টস জিতে ফিল্ডিং-এ শ্রীলংকা   |    জাতীয় সংবাদ : ঢাকা উত্তর সিটির উপ-নির্বাচন স্থগিত * নবম ওয়েজ বোর্ডে সাংবাদিকদের স্বার্থ গুরুত্ব পাবে: তারানা হালিম * আপিল শুনানির কার্যতালিকায় যুদ্ধাপরাধী আজহার-কায়সার-সুবহানের মামলা   |    আন্তর্জাতিক সংবাদ : ফিলিস্তিনের জন্য জাতিসংঘ সংস্থা থেকে বরাদ্দকৃত অর্থ প্রত্যাহার যুক্তরাষ্ট্রের * মিয়ানমারে রাখাইন বৌদ্ধদের ওপর পুলিশের হামলা ॥ নিহত ৭ * পেরুর সাবেক প্রেসিডেন্টের হাসপাতাল ত্যাগ * মেক্সিকোয় গণকবর থেকে ৩২টি লাশ উদ্ধার    |   

হবিগঞ্জের গর্বিত বীরাঙ্গনারা

হবিগঞ্জ, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৫ (বাসস) : হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের মালতি রাণী শুল্কবৈদ্য, পুষ্প রাণী শুল্কবৈদ্য, রাজিয়া খাতুন, চান্দপুর চা বাগানের চা শ্রমিক হিরামনি সাওতাল ও সাবিত্রী নায়েক তারা কোনোদিন ভাবেননি যে একদিন এই দেশে মুক্তিযোদ্ধার পরিচয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেন। কিন্তু সেই অসম্ভবটাই যখন সম্ভব হয়ে উঠে তখন তাদের কাছে একাত্তরের প্রিয়জন হারানোর বেদনা, সেনা ক্যাম্পের দুঃসহ স্মৃতি অনেকটাই অর্থবহ হয়ে উঠেছে।
পাকসেনাদের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হওয়ার পর গ্রামের মানুষ ও স্বজনরা আমাদের ভাল চোখে দেখতো না। মনে হয়েছিল কেন ওই সময় আমাদের মৃত্যু হলো না। বর্তমান সরকার আমাদেরকে বীরাঙ্গনা হিসেবে স্মীকৃতি দেয়ায় খুব গর্ব হচ্ছে। আমরা প্রাণ ফিরে পেয়েছি, । বাসস সংবাদদাতার সাথে আলাপকালে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের বীর নারী পুষ্প রাণী শুল্কবৈদ্য একথা বলেন।
ব্যবসায়ী রাখাল চন্দ্র শুল্ক বৈদ্যের সংসারে স্ত্রী পুষ্প রানীর ২ সন্তান নিয়ে ভালই দিন কাটছিলো। এলাকায় তাদের বেশ প্রভাব প্রতিপত্তিও ছিলো। তাই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথে প্রতিবেশীদের অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ে ভারত পাড়ি জমালেও রাখাল চন্দ্রের মা সুখীময় শুল্ক বৈদ্য বাদ সাধেন। তিনি বলেন, মরতে হলে নিজের ভূমিতেই প্রাণ দেবো। তাই আর তাদের কারোর ভারতে যাওয়া হয়নি।
মে মাসের শেষদিকে গভীর রাতে হানাদার বাহিনী তাদের বাড়িতে হানা দেয়। রাখালের ভাই অক্ষয় চন্দ্র শুক্ল বৈদ্য ঘুম থেকে উঠে গোয়ালঘরে গরু-বাছুরের খাবার দিতে যান। নিজ বাড়ির উঠোনেই হানাদারদের হাতে আটক হন। এরপর ঘরের দরজা ভেঙে ভাই রাখাল চন্দ্রকে টেনেহিঁচড়ে বের করে পাক আর্মিরা। তাদেরকে বেঁধে রাস্তার পাশে দাঁড় করানো জিপের কাছে নিয়ে যায়। জিপের রডের সঙ্গে বেঁধে গাড়ি চালিয়ে পার্শ্ববর্তী পাল বাড়ির সামনে নিয়ে দাঁড় করিয়ে তাদের সাথে অক্ষয় চন্দ্র শুক্ল বৈদ্য ও যতীন্দ্র রাম শুক্ল বৈদ্যকে হত্যা করে। গুলির শব্দ শুনে বাড়ি থেকে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় অক্ষয় চন্দ্রের ১৬ বছর বয়সী বড় ছেলে টেনু শুক্ল বৈদ্য। তাকেও নির্মমভাবে হত্যা করে হানাদাররা। একই সময়ে পালবাড়ির বিপিন পাল, হরেন্দ্র পাল, ব্রজেন্দ্র পাল ও একজন পুরোহিতকেও হত্যা করে পাক আর্মিরা। এরপর তাদেরকে খড়ের গাদার সাথে বেঁধে আগুন দেয়। মৃত্যু নিশ্চিত করতেই আগুনে পুড়িয়ে অঙ্গার করে তাদেরকে।
এরপর পাকবাহিনী পার্শ্ববর্তী মীর বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেয়া পরিবারের অন্য সদস্যদের আটক করে সুখদেবপুরে নিয়ে যায়। ওই গ্রামে পাকবাহিনীর অনুসারী রশিদ মিয়ার বাড়িতে সবাইকে জিম্মায় রাখে। সেখানে আরো অনেকের সাথে দুর্বিষহ দুটি দিন কেটে যায়।
তৃতীয় দিন দুপুরে একটি জিপে করে চার পাকসেনা আসে রশিদ মিয়ার বাড়িতে। তারা আটককৃতদের মধ্যে পুষ্প ও মালতি ছাড়া অন্য সবাইকে উঠানে এনে দাঁড় করিয়ে হত্যা করে। এ সময় পুষ্প ও মালতিকে নিয়ে যায় সেনা ক্যাম্পে। ডিসেম্বরে দেশ স্বাধীন হলে মুক্তি পান দুই জা। মুক্তি পেয়ে দুজনই চলে যান বাপের বাড়িতে। সেখান ঠাঁই না পেয়ে ফিরে আসেন স্বামীর ভিটায়। মুক্তিযুদ্ধের বেদনা ভুলে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন পুষ্প রানী। তার দুই ছেলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকেন। দুই ছেলেই বিয়ে করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণকরে পুষ্প রাণী আবেগাপ্লুত কন্ঠে প্রতিবেদককে বলেন, পাকসেনাদের অত্যাচার ও নির্যাতনের মধ্যে দিয়ে দু:সহ দিনগুলো চলে গেছে। আমরা কোনদিন স্বাধীন বাংলাদেশের সূর্য দেখবো তা ভাবতে পারিনি। কিন্তু আজ আমরাও মুক্তিযোদ্ধা এটা আমাদের কাছে কত যে আনন্দের! কত যে গৌরবের!
চাঁনপুর চা বাগানের বাসিন্দা সাবিত্রী নায়েক নিজের জীবনকে উপেক্ষা করে চা বাগানের শত নারীর সম্ভ্রম বাঁচিয়েছিলেন। তার উপর নেমে এসেছিলো হানাদার বাহিনীর নিষ্ঠুর অত্যাচার ও নির্যাতন। সেকথা স্মরণ করে আজো শিউরে উঠেন তিনি। কিন্তু একাত্তরে তার বীরত্বগাঁথা আজো চান্দপুর চা বাগানের নারী শ্রমিকদের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায়।
হিরামনি সাওতাল চোখের পানি সামলাতে সামলাতে বলেন, আমার মনে হচ্ছে আমিও একজন মুক্তিযোদ্ধা। এটা একটা গৌরবের ডাক। সম্মানের ডাক!
একই চা বাগানের পুর্ব চান্দপুরের আরেক বীরাঙ্গনা সাবিত্রী নায়েক। একাত্তরে পাক হায়েনারা তাকে ধরে নিয়ে যায়। দেশ স্বাধীনের পর এলাকায় আসলে কেউ তাকে গ্রহণ করেনি। পরে মুক্তিযোদ্ধা কেরামত আলী তাকে বিয়ে করেন। বর্তমানে কেরামত আলী বেঁচে নেই। তার ঘরে দুই ছেলে বিয়ে করে সংসারি হয়েছে। জীবনের শেষ সময়ে এসে জীবিকার তাগিদে কাজের সন্ধানে ঘুরতে হয় সাবিত্রীকে। তবুও জীবনের শেষ লগ্নে এসে মুক্তিযোদ্ধার সম্মান তাঁকে আনন্দে আপ্লুত করে।