ঢাকা, মঙ্গলবার, জানুয়ারী ১৬, ২০১৮

সংবাদ শিরোনাম 

আবহাওয়া : আগামীকাল থেকে দক্ষিণাঞ্চলের শৈতপ্রবাহ কেটে যেতে পারে   |    আন্তর্জাতিক সংবাদ : জাপানের জলসীমায় ভেসে আসা নৌকা থেকে ৮ জনের লাশ উদ্ধার * লিবিয়ার পশ্চিম উপকূল থেকে অবৈধ ৩৬০ শরণার্থী উদ্ধার   |   

নিভৃত পল্লীর সাধারণ গৃহবধূ ভাগিরথীর মুক্তিযুদ্ধে বীর সেনানী হবার ইতিবৃত্ত

।। গৌতম চৌধুরী ।।
পিরোজপুর, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৪ (বাসস) : মহান মুক্তিযুদ্ধের ১৩ সেপ্টেম্বর, পিরোজপুরের পল্লীবধু ভাগিরথীকে শহরের সড়ক দিয়ে মোটর সাইকেলের সঙ্গে রশি বেঁধে টেনে হিঁচড়ে বলেশ্বর নদের বধ্যভূমিতে হত্যা করেছিল পাকবাহিনী। তার অপরাধ দখলদার সৈন্যদের মরণফাঁদ সৃষ্টির জন্য প্রচ্ছন্ন ভাবে বিভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নিয়ে মুক্তিযোদ্ধদের সাথে একাত্ম হয়েছে, তাদের সাহায্য সহযোগিতা করেছে।
পরাধীন এ প্রিয় মাতৃভূমি শত্রুমুক্ত করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেসব নারী অকাতরে প্রান বিসর্জন দিয়েছে তাদেরই একজন নিভৃত পল্লীর গৃহবধু ভাগিরথী।
পাকবাহিনীর সুবেদার সেলিমের নেতৃত্বে সেদিন পাক হানদারবাহিনীর এই বর্বরতা দেখে অনেকেই জ্ঞান হারায়, ডুকরে কেঁদে ওঠে,চরমভাবে লাঞ্ছিত হয় মানবতা। ১৩ ডিসেম্বর, মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির চুড়ান্ত বিজয় অর্জনের মাত্র কয়েক দিন আগে, এই মমুদ ঘটনার নজীর রেখে যায় পলায়নপর পাক হানাদারবাহিনী।
১৩ আগষ্ট কমান্ডার সরোয়ার হোসেন এর নেতৃত্বে ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা একপাই জুজখোলা গ্রামে অবস্থান নেয়। এদের সাথে যোগাযোগ হয় ভাগিরথীর। এর কয়েকদিন পর মতিউর রহমান সরদারের নেতৃত্বাধীন আর একটি দল সরোয়ারের সঙ্গে মিলিত হয়ে পাকিস্তানীদের দোসর স্থানীয় রাজাকার কমান্ডারকে কঠিন শাস্তি দেয়। এই মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে দেখা করে ভাগিরথী যুদ্ধে অংশ নেয়ার আগ্রহ দেখালে তাকে হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার-আলবদরদের গতিবিধির খোঁজ খবর নেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়। ভিক্ষুকের বেশ ধরে ভাগিরথী শহরে এসে সরকারি বালক বিদ্যালয় অবস্থিত পাক-সেনা ক্যাম্পে ভিক্ষা চায়। এমনি ভাবে কয়েকদিন যাতায়াতের পরেই সুবেদার সেলিম তাকে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান সম্পর্কে গোপনে তথ্য দেয়ার প্রস্তাব দিলে ভাগিরথী সাথে সাথে সেই প্রস্তাবে সম্মত হয়। এরপর থেকে ভাগিরথী পাকিস্তানী হানাদারদের বিভ্রান্ত করার জন্য বিভিন্ন তথ্য দেয়। ২৯ আগষ্ট পোরগোলায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রস্তুত রেখে সেখানে পাক-হানাদারদের নিয়ে গেলে মুক্তিযোদ্ধাদের হঠাৎ আক্রমণে কয়েকজন পাক-সেনা ও রাজাকার হতাহত হয়। ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর একই ভাবে ভাগিরথীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী পাকিরা কদমতলা ও বাঘমারায় গেলে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে কয়েকজন আহত হলে তারা পালিয়ে শহরে চলে আসে। এরপরই আত্মগোপনে চলে যাওয়া ভাগীরথীকে ধরিয়ে দেয় রাজাকার-আল বদররা।
শহরের পিচ ঢালা পথ রক্তে রঞ্জিত করে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করে পাকবাহিনী। তাতেও তারা ক্ষ্যান্ত হয়নি,তাঁর নিথর দেহটিকে বধ্যভূমিতে নিয়ে গুলী করে বলেশ্বর নদীর উত্তাল তরঙ্গে নিক্ষেপ করে। যার আর সন্ধান মেলেনি।
ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর মহিলা আর্মি রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার ক্যাপ্টেন লক্ষি সায়গাল, আলজেরিয়ায় দখলদার ফরাসিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বীরত্ব অর্জন করা বীর নারী জমিলা বুহায়েত, মাস্টার দা সূর্যসেনের অনুগামী ব্রিটিশ বিরোধী সশ্র সংগ্রামে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুট করে যুদ্ধরত অবস্থায় পুলিশের গ্রেফতার এড়াতে আত্মাহুতি দানকারী শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদেদ্দার, ফরাসী বীর সেনানী জোয়ান অব আর্ক সহ বিশ্ববরেন্য নারীদের নামের সাথে সেদিন যে নামটি যোগ হয়েছিল,তিনি ভাগিরথী।
১৩ ডিসেম্বর দিনটি, আন লাকী থার্টিন বা দূর্ভাগ্যের তের হলো স্বদেশের জন্য আত্মোৎসর্গকারী জীবন যুদ্ধে আজীবন সংগ্রামী অকুতোভয় এই বীর সেনানীর ।