ঢাকা, বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী ১৮, ২০১৮

সংবাদ শিরোনাম 

আন্তর্জাতিক সংবাদ : নির্ধারিত সময়ে কম্বোডিয়ার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে : কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী   |   

শর্ষিনার পীর আবু জাফর মোঃ ছালেহকে দেয়া স্বাধীনতা পদক প্রত্যাহারের দাবি

॥ গৌতম চৌধুরী ॥
পিরোজপুর, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৪ (বাসস) : পিরোজপুরের শর্ষিনার শীর্ষস্থানীয় স্বাধীনতা বিরোধী আবু জাফর মোঃ ছালেহকে দেয়া স্বাধীনতা পদক প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন এলাকার মুক্তিযোদ্ধাসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
১৯৮০ সালের মহান স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী ছালেহকে স্বাধীনতা পদক তুলে দিয়েছিলেন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান।
পিরোজপুরের দুই শীর্ষ মানবতা বিরোধীদের একজন মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের আদেশ দিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত, অপরজন রাজাকার কমান্ডার আব্দুল জব্বার ইঞ্জিনিয়ার এর মানবতা বিরোধী অপরাধের রায় ট্রাইব্যুনাল -১ এ ঘোষিত হবে যেকোন দিন। মুক্তিযুদ্ধের ৪৩ বছর পর প্রিয়জন হারানো হাজার হাজার মানুষের মধ্যে স্বস্তির সুবাতাস বইলেও শর্ষিনার পীরের স্বাধীনতার পদক বহাল থাকার বিষয়টি তারা কোন ভাবে মেনে নিতে পারছেননা।
তারা মনে করেন,স্বাধীনতা যুদ্ধের এই প্রত্যক্ষ বিরোধিতাকারী শর্ষিনার পীরকে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে জিয়াউর রহমান শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আর মুক্তিযোদ্ধাদের অপমানিত করেছেন।
বঙ্গবন্ধু তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে ২৫৬ পৃষ্ঠার ২য় প্যারায় লিখেছেন ৭০ এর নির্বাচনের প্রাক্কালে যে কজন ব্যক্তি বলে বেড়াতেন যে, আমাকে ভোট দিলে ইসলাম বিপন্ন হবে এবং ধর্ম থাকবেনা তাদের মধ্যে শর্ষিনার এই পীর ছিলেন অন্যতম।
স্বরুপকাঠীর যুদ্ধকালীন কমান্ডার মোঃ মজিবুর রহমান বলেন, ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করলে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ আর এই মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিরোধীতা করে পাকিস্তানের সেনা বাহিনীকে সব ধরনের সহযোগিতা করেছিলেন এই শাহ আবু জাফর মোঃ ছালেহ। শর্ষিনার মাদ্রাসার আইয়ুব হলে অবস্থান করতে দেয়া হয়েছিল রাজাকার আলবদর বাহিনীর খুনীদের। এখানে এনে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হতো মুক্তিযোদ্ধা এবং অসংখ্য মুক্তিকামী মানুষকে।
মুক্তিযুদ্ধের দুই কিংবদন্তি মেজর জেনারেল খালেদ মোশারফ ও মেজর হায়দার এর ঘনিষ্ট সহযোদ্ধা মেজর কামরুল হাসান ভূইয়া তার জনযুদ্ধের গনযোদ্ধা বইয়ের ৪২ পৃষ্ঠায় লিখেছেন স্বরূপকাঠীর শর্ষিনার পীরের বাড়িতে শত্রুর আস্তানা এবং স্থানীয় নিয়ন্ত্রন কেন্দ্র। এদের সাথে আছে পাকিস্তানী মিলিশিয়া এবং রাজাকার। রাজাকাররা স্থানীয় এবং সেই সুবাদে শত্রুর পথ প্রদর্শক এবং সংবাদদাতা হিসেবেও কাজ করে।
তিনি লিখেন , শত্রু লঞ্চে ও নৌকায় স্বরুপকাঠী, ইন্দুরহাট সহ অন্যান্য এলাকায় টহল দেয়। এই পশুদের অত্যাচার আর নিষ্ঠুরতা এদেশের মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। ইসলাম রক্ষার নাম করে কি অবিশ্বাস্য পাশবিকতা। মানুষকে এরা নির্দ্বিধায় কাক-শকুনের আহার বানিয়ে ফেলে। এদের কি বিবেচনায় ক্ষমা করা যায়? আকাশের নিচে কোন মানুষের পক্ষে তা অসম্ভব।
এদিকে গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর আন্তজার্তিক অপরাধ তদন্ত সংস্থার একটি তদন্ত দল এ,এস,পি মোঃ আব্দুল হান্নান এর নেতৃত্বে স্বরূপকাঠীতে গেলে স্বরূপকাঠীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শর্ষিনার পীর এর স্বাধীনতা বিরোধী কর্মকান্ডের বিস্তারিত বিবরণ দেন। তারা জানান দরবার শরীফের মধ্যে অবস্থিত মাদ্রাসার পাঁচ শতাধিক ছাত্রকে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরী করা হয় রাজাকার ও আলবদর বাহিনী। এই বাহিনী প্রায় পঞ্চাশটি গ্রামে হামলা চালিয়ে বাড়িঘর, বাজার ও সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকয় লুটপাট করে কোটি কোটি টাকার স্বর্ণালংকার এবং অন্যান্য মূল্যমান মালামাল নিয়ে আসত। ২৫ নভেম্বর মালেক কমান্ডারের নেতৃত্বে এই পীরের বাড়ি আক্রমণ করেন মুক্তিযোদ্ধারা, সেখানে টানা দুইদিন যুদ্ধ চলে। এই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা কাজী মতিউর রহমান, আবু জাফর, হারুন-অর- রশিদ সহ ৫ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
স্বরূপকাঠী মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার মোঃ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ১৬ ডিসেম্বর সারা দেশে বাংলাদেশের পতাকা উড়লেও এই দরবার শরীফে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানী পতাকা টানানো ছিল। শর্ষিনার এই পীরকে ২৩ ডিসেম্বর গ্রেফতার করা হয় এবং দালাল আইনের মামলায় ২৬ মাস বরিশাল কারাগারে আটক রাখা হয়। জামিনে মুক্তি পেয়ে তিনি শর্ষিনায় ফিরে আসেন এবং ১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমানের হাত থেকে স্বাধীনতার পদক গ্রহন করেন। ১৯৯০ সালে তিনি মারা যান।