ঢাকা, সোমবার, এপ্রিল ২৩, ২০১৮

সংবাদ শিরোনাম 

আন্তর্জাতিক সংবাদ : প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রক্ষণশীলদের জয়   |   

ফরিদপুরের চাঁদহাটে একটি স্মরণীয় মুক্তিযুদ্ধ

ফরিদপুর, ১ ডিসেম্বর, ২০১৪ (বাসস) : ১৯৭১ সালে ফরিদপুরের নগরকান্দা থানার চাঁদহাট যুদ্ধ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ঘটনা।
ঐতিহাসিক এই যুদ্ধ হয় ১৯৭১ সালের ২৯ মে। এই যুদ্ধে শক্তিশালী পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয় মুক্তিযোদ্ধা ও এলাকার স্বাধীনতাকামী মানুষের নৈতিক মনোবলকে আরো জোরদার করে।
চাঁদহাট যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একদল গর্বিত মুক্তিযোদ্ধা আলতাফ হোসেন খান। এখন বয়স ৬৩ বছর। সম্প্রতি বাসসকে তিনি বলেন, ২৫ মার্চ রাতে পাকবাহিনীর দমন অভিযানের পর সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য, পুলিশ ও ইপিআর স্বপক্ষ ত্যাগ করেন। আবার অনেকেই এ সময় ছুটিতে ছিলেন। সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত হাবিলদার আব্দুল আজিজ মোল্লার নেতৃত্বে এসব সেনা সদস্য, ইপিআর ও পুলিশ সংগঠিত হয়। ভাঙ্গা ও নগরকান্দা থেকে তারা কিছু অস্ত্র সংগ্রহ করেন। বিশেষ করে ৩০৩ রাইফেল ও গুলি। চাঁদহাট ও এর আশেপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করে।
১৯৭১ সালের ২৯ মে সকাল ১০টার দিকে মুক্তিবাহিনী জানতে পারে ফরিদপুর সদর থেকে এক প্লাটুন পাকসেনা চাঁদহাটের দিকে আসছে। এ সময় মুক্তিবাহিনীর হাতে ছিল ১৩টি পুরনো ৩০৩ রাইফেল একটি স্টেনগান। এ নিয়েই তারা পাক সেনাদের মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নেয়।
ইতোমধ্যে দেশী অস্ত্র নিয়ে শত শত গ্রামবাসী মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়। এসব অস্ত্রের মধ্যে ছিল সর্কি, বল্লম, ঢাল ইত্যাদি। চাঁদহাটের যুদ্ধ একটি গণযুদ্ধে রূপ নেয়। যুদ্ধের সময় গ্রামবাসী শুকনো খাবার, যেমন মুড়ি, চিড়া, গুড়, মুক্তিযোদ্ধাদের সরবরাহ করে।
অভিজ্ঞ রণকৌশলী কমান্ডার আজিজ মোল্লা তিনদিক থেকে শত্রুদের ওপর আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। সে অনুযায়ী শত্রুরা রাইফেলের রেঞ্জের মধ্যে আসামাত্র গুলিবর্ষণ শুরু হয়।
আলতাফ হোসেন বলেন, মুক্তিবাহিনী একটু উঁচু জায়গায় বাংকারে অবস্থান নেয়। আর পাক সেনারা ছিল অপেক্ষাকৃত নিচু ও ঢালু এলাকায়। প্রাকৃতিক এই সুবিধার কারণে পাক সেনাদের ছোঁড়া গোলা আমাদের মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছিল। আর আমাদের গুলি সরাসরি তাদের গায়ে লাগছিল। মাত্র ১৫/২০ মিনিটের মধ্যেই কয়েকজন পাকসেনা নিহত হয়। যুদ্ধ চলে প্রায় ৫ ঘণ্টা। এতে একজন ক্যাপ্টেন ও ২ জন লেফটেন্যান্টসহ ২৮ জন পাক সেনা নিহত হয়।
যুদ্ধে তিন মুক্তিযোদ্ধা নিহত হন। এরা হলেন, নগরদিয়া গ্রামের আবু বকর সর্দার, ঈশ্বরদী গ্রামের নুরু মিয়া ও মনোয়ারা বেগম। মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করতে গিয়ে আহত হন মনোয়ারা। পরে তিনি শহীদ হন।
আলতাফ বলেন, কমান্ডার আজিজ মোল্লা ছাড়া আরো যেসব মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তারা হলেন- রাশেদ ফকির, বারেক হাবিলদার (পাকবাহিনীর সঙ্গে আরেক যুদ্ধে শহীন হন), মোফাজ্জল হোসেন খসরু, ইসরাইল, ইসাহাক, দেলোয়ার হোসেন, আওয়াল, সোলায়মান মোল্লা ও আমি নিজে। এ যুদ্ধে তারা তিনটি মাঝারি মেশিন গান, ৪টি চায়নিজ রাইফেল ও বিপুল পরিমাণ গুলি আটক করেন।
প্রতিশোধ নেয়ার জন্য বেশী সংখ্যক সৈন্য ও বিপুল অস্ত্র নিয়ে পাকবাহিনী সেখানে আসে। কিন্তু কৌশলগত কারণে আজিজ মোল্লা তাদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ না হয়ে পিছু হটে অন্যত্র অবস্থান নেন।
হানাদাররা আশেপাশের বহু নির্দোষ মানুষকে হত্যা করে, গ্রামবাসীর বাড়ি-ঘরে আগুন দেয় এবং আগের দিন নিহত পাক সেনাদের কয়েকটি লাশ নিয়ে যায়।
চাঁদহাটের বিজয়ী কমান্ডার আজিজ মোল্লা ১৯৭১ সালে আরো কয়েকটি সফল যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য ১৯৭৮ সালে ডাকাতরা এই সাহসী মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করে।
এই বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের স্মৃতি রক্ষায় সেখানে এখনও কোন স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ হয়নি। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এ যুদ্ধ স্মরণীয় করে রাখার জন্য এখানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানান আলতাফ হোসেন খান।

সম্পর্কিত সংবাদ