’৭১-এর গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে সকলকে একযোগে কাজ করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

662

ঢাকা, ২৫ মার্চ, ২০১৯ (বাসস): প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ’৭১-এর গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে সকলকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আজ ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস। ইতোমধ্যে আমরা কিছু উদ্যোগ নিয়েছি-যেন এই দিনটা গণহত্যা দিবস হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায় সেজন্য আমাদের প্রচেষ্টা চালাতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ সকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে স্বাধীনতা পুরস্কার ২০১৯ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে একথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার সুফলটা যেন বাংলার জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারি, সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারি এবং আর্থসামাজিক ভাবে যেন আমরা উন্নত হতে পারি, উন্নত জাতি হিসেবে বিশ্বে যেন একটা মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারি সেটাই আমাদের লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। যার সুফল দেশবাসী পেয়েছে।’
এক সময় বাংলাদেশকে ঘুর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর দুর্যোগের দেশ হিসেবে বহিঃবিশ্বে অবমাননা করার কথা স্মরণ করে এজন্য দেশবাসীর মত তাঁর নিজেরও মনোকষ্ট ছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সে কারণেই আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় এসেছে চেষ্টা করেছে কত দ্রুত দেশটার আর্থসামাজিক উন্নয়ন করা যায় এবং উন্নত দেশ হিসেবে বিশ্বে একটি মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করা যায়।
প্রধানমন্ত্রী দেশের ১৩ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠানকে তাদের স্ব-স্ব ক্ষেত্রে গৌরবময় ও অসামান্য অবদান রাখার স্বীকৃতি স্বরূপ অনুষ্ঠানে স্বাধীনতা পুরস্কার-২০১৯ এ ভূষিত করেন।
গত ১০ মার্চ এ বছরের স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য ১৩ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠানের নাম ঘোষণা করে সরকার।
পুরস্কারের জন্য মনোনীত ব্যক্তিগণ হচ্ছেন-স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবী মোফাজ্জ্বল হায়দার চৌধুরী (মরণোত্তর), শহীদ এটিএম জাফর আলম (মরণোত্তর), এ কে এম মোজাম্মেল হক, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, ড. কাজী মিসবাহুন নাহার, আব্দুল খালেক (মরণোত্তর) ও অধ্যাপক মোহাম্মাদ খালেদ (মরণোত্তর), শওকত আলী খান (মরণোত্তর), চিকিৎসা বিজ্ঞানে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নুরুন্নাহার ফাতেমা বেগম, সমাজ সেবায় ড. কাজী খলীকুজ্জামান আহমেদ, সংস্কৃতিতে মুর্তজা বশীর, সাহিত্যে হাসান আজিজুল হক, গবেষণা ও প্রশিক্ষণে অধ্যাপক ড. হাসিনা খাঁন।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিআইএনএ) এ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
পুরস্কার হিসেবে ৩ লাখ টাকার চেক, ১৮ ক্যারেট স্বর্ণের ৫০ গ্রাম ওজনের একটি পদক এবং সনদপত্র প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাধীনতা পুস্কার প্রাপ্তদের পক্ষে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন অনুভূতি ব্যক্ত করে বক্তৃতা করেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহম্মদ শফিউল আলম অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন এবং পদক বিজয়ীদের পরিচিতি তুলে ধরেন।
প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়া, মন্ত্রিপরিষদ সদস্যগণ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, বিচারপতিগণ, সংসদের সদসগণ, তিন বাহিনী প্রধানগণ, বিদেশী কূটনিতিকবৃন্দ, সরকারের পদস্থ সামরিক এবং বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিবিদ কবি-সাহিত্যক-বুদ্ধিজীবী এবং দেশবরেণ্য ব্যক্তিবর্গসহ আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের এক দশকের প্রচেষ্টার ফলে এই অর্থবছরের শেষ নাগাদ জাতীয় প্রবৃদ্ধি আমরা ৮ ভাগে নিয়ে যেতে সক্ষম হব। আমাদের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৭শ ৫১ ডলার থেকে বেড়ে ১ হাজার ৯শ’ নয় মার্কিন ডলার হতে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, আজকের বাংলাদেশ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। বাংলাদেশকে আজকে বাংলাদেশকে মানুষ সম্মানের চোখে দেখে। এটটুকুই আমাদের তৃপ্তি। বিশ্বে বাংলাদেশকে আমরা এমন একটি মর্যাদাপূর্ণ জায়গায় নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় বিপুল ভোটে তাঁর দল আওয়ামী লীগকে নির্বাচিত করে ক্ষমতায় নিয়ে আসায় বাংলাদেশের জনগণের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা জানাই। কারণ, তাঁরা আমাদেরকে আস্থায় নিয়েছেন, বিশ্বাস রেখেছেন, আমাদের ভোট দিয়ে আবার তাঁদের সেবা করার সুযোগ দিয়েছেন এবং সামনে আরো কিছুদিন আমরা সময় পাচ্ছি, এদেশটাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার।
তাঁর এবং দলের চলার পথ সবসময়ই কন্টকাকীর্ণ ছিল উল্লেখ কওে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের চলার পথ কখনই সহজ ছিল না।’
তিনি উদাহারণ টেনে বলেন, একটা দৃষ্টান্ত দিতে পারি যথন পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে আমার বা আমার পরিবারের ওপর দুর্নীতির অভিযোগ আনা হলো তখন আমরা সেটাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম যে, দুর্নীতি কোথায় হয়েছে সেটা প্রমাণ করতে হবে। বিশ্বব্যাংক সেটা প্রমাণ করতে পারেনি। তাঁরা ব্যর্থ হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যদি সততার সাথে, নিষ্ঠার সাথে রাষ্ট্র পরিচালনা না করতাম তাহলে কখনই এই চ্যালেঞ্জ নিতে পরতাম না।
তিনি বলেন,‘ সততাই হলো সবথেকে বড় শক্তি। আর সেই শক্তি ছিল বলেই সকল ষড়যন্ত্র আমরা মোকাবেলা করতে পেরেছিলাম।’
নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণর সিদ্ধান্তে বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদানের উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজকে আমাদের সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মহান মুৃক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য আমরা স্বাধীনতা পুরস্কার দিতে পেরেছি, সেজন্য আমরা নিজেরেকে ধন্য মনে করি। আমরা গুণীজনকে সম্মান জানাতে পেরেছি। তবে, আমাদের দেশ ও সমাজের আনাচে-কানাচে আরো এমনি বহু গুণীজন ছড়িয়ে রয়েছেন।

’৭৫ এর পরে নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বসে পড়া এবং শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস ও অপরাজনীতির অনুপ্রবেশের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী এর প্রেক্ষিতে জাতির পিতার কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ তথা বাকশাল প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য আলোচনায় তুলে ধরেন।
’৭৩ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বাইরে থাকা দলগুলো ৯টি আসনে জয়লাভ করেছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা কখনও নির্বাচনে জয়ী হতে পারে না সেসব রাজনৈতিক দলের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে জাতির পিতা বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়াম লীগ গড়েছিলেন। এটি একটি জাতীয় ঐক্যভিত্তিক প্লাটফর্ম ছিল। যেখানে ঐক্যের মধ্যদিয়ে সকলেই দেশের কাজ করবে এবং সেখানে সমাজের সর্বস্তরের জনগণকে সম্পৃক্ত করে তিনি উন্নয়নের ব্যবস্থা নিয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা যেই ব্যবস্থাটা নিয়েছিলেন সেটা কার্যকর করা গেলে বাংলাদেশে জনগণের ভোটের অধিকার নিয়ে আর কেউ খেলতে পারতো না। নিজের মনের মতো প্রার্থীকে ভোট দিয়ে জনগণ নির্বাচিত করতে পারতো।
সরকার প্রধান বলেন, জাতির পিতা সেময় নির্বাচনের যে পদ্ধতি করেছিলেন সে অনুযায়ী যার যার নির্বাচন সে সে করতে পারবে। নির্বাচনের খরচ প্রতিটি প্রার্থীকে দিয়ে দেওয়া হবে রাষ্ট্রের তরফ থেকে। প্রতি আসনের জন্য পৃথক একটি করে পোষ্টারে সকল প্রার্থীর নাম ছাপিয়ে দেওয়া হবে কাজেই জনগণের সাথে যার যোগাযোগ আছে, সম্পৃক্ততা আছে তারা নির্বাচিত হবেন। অর্থাৎ ভোটের অধিকার তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের কাছে যাতে পৌঁছায়, তাঁরা যেন স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারে সেই সুযোগ তিনি করে দিয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দু’টি নির্বাচন হয়েছিল সেসময়। এর একটি কিশোরগঞ্জে অপরটি পটুয়াখালীতে। সেখানে বড় কোন দলের কেউ নয়, সাধারণ একজন স্কুল মাস্টার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিল। অর্থাৎ অর্থ-বিত্ত দিয়ে কেউ নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে নি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার একটা কথা ছিল একটা বিপ্লবের পর সমাজে একটা বিবর্তন আসে। যেসব দেশ মুক্তিযুদ্ধ করেছে সেসব দেশেই এমনটি হয়, পরিবর্তন বা বিবর্তনের পরে কিছু লোক আর্থিকভাবে শক্তিশালী হয়ে যায়। সেটা যেন সমাজে স্থান না পায় সেদিকে লক্ষ্য রেখেই তিনি এই বাকশাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
সেইসাথে আমাদের জনসংখ্যা বেশি এবং চাষের জমি কম থাকায় সেখানে তিনি ব্যবস্থা নিয়েছিলেন সমবায়ের মাধ্যমে আমাদের দেশে উৎপাদন হবে, বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, জমির মালিকানা মালিকের কাছেই থাকবে। কোন মালিকানা নেওয়া হবে না। কিন্তু জমিটি সমবায়ের মাধ্যমেই চাষাবাদ হবে। উৎপাদিত ফসলের একটা অংশ যারা শ্রম দেবে তারা পাবে, একটা অংশ মালিক পাবে আর একটা অংশ পাবে সমবায় এবং আধুনিক প্রযুক্তি কৃষিতে ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ানো হবে।
ড. কুদরত-ই-খুদাকে প্রধান করে শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাস্তবায়নকালেই ’৭৫ এর ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করায় সে রিপোর্ট আর বাস্তবায়িত হতে পারেনি উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ‘তিনি বেঁচে থাকলে আর ৫-৭ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ উন্নত এবং সমৃদ্ধশালী হয়ে গড়ে উঠতে পারতো।’

image_printPrint