ক্যান্সার প্রতিরোধে সচেতনতা ও কাউন্সিলিংয়ের প্রয়োজন

375

ঢাকা, ২০ মার্চ, ২০১৯ (বাসস) : ‘আমার মা জরায়ুমুখ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। চতুর্থ স্টেজে ছিলেন। উনি বুঝতেই পারেনি তার শরীরে নীরবে দানা বেঁধেছে মরণব্যাধী। মধ্যবিত্তের সংসার, ক্যান্সারের বিরুদ্ধে শক্ত হাতে লড়াই করা সহজ ছিল না। আর্থিক ও মানসিকভাবে তাকে ভরসা দিতে পারিনি, কারণ উনি এই বিষয়টা শুনলে ভেঙ্গে পড়বেন, জানানো হয়নি তাই। সাড়ে তিনবছর লড়াই করেছেন এর বিরুদ্ধে। সাতবছর হলো মা চলে গেছেন। এখন মনে হয় তিনি অভিমান নিয়ে চলে গেছেন। হয়তো আর্থিক ও মানসিকভাবে তাকে সহায়তা করা গেলে তিনি আরো কিছুদিন আমাদের মাঝে থাকতে পারতেন।’ এমন মর্মস্পর্শী কথা বলছিলেন বাগেরহাটের সাবেরা।
কুমিল্লার লাকি জানান, ‘আমার মা স্তন ক্যান্সারে মারা গেছেন। তার স্তনে টিউমার হয়েছিল। সার্জারির মাধ্যমে তা অপসারণ করা হয়। পরবর্তীতে কেমোথেরাপি চললেও তা শেষ করা যায়নি। ব্যায়বহুল চিকিৎসায় আমরা সর্বশান্ত হয়েছি। ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। জানিনা আমাদের পরিবার কতদিনে আর্থিক ও মানসিক সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবো।’
শুধু সাবেরা কিংবা লাকিই নয়, ক্যান্সার রোগে প্রিয়জনকে হারিয়েছেন অনেকে। ক্যান্সারের চিকিৎসায় আর্থিকভাবে সর্বশান্ত হয়েছেন অনেক পরিবার। বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও নানা কারণে এই ব্যাধি ক্রমশ বাড়ছে।
ক্যান্সার বিশেজ্ঞদের মতে, দেশে প্রায় ১২ লাখ ক্যান্সার রোগী রয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ৩ লাখ মানুষ নতুন করে কোন না কোন ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। মারা যাচ্ছে বছরে প্রায় দেড় লাখ রোগী। যে কোন বয়সেই ক্যান্সার হতে পারে। কিছু-কিছু ক্যান্সারে খুব অল্প বয়সে মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। তবে সাধারণত অপেক্ষাকৃত মধ্যবয়সী মানুষের মধ্যে ক্যান্সারের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।
বাংলাদেশে পুরুষদের মাঝে কোলন ও ফুসফুসের ক্যান্সারের প্রবণতা দেখা যায়। নারীদের জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বেশি থাকে। কি কারণে ক্যান্সার হয় এর পুরোপুরি কারণ জানা না গেলেও পারিবারিক ক্যান্সারের ইতিহাস, জীবনযাত্রার মান, খাদ্যাভাস বিবিধ কারণে ক্যান্সার হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ক্যান্সার ছোঁয়াচে নয়। শব্দটি শুনলে আঁতকে ওঠেন অনেকে। কিন্তু সঠিক সময়ে সনাক্ত করা সম্ভব হলে এর নিরাময় সম্ভব। মানবদেহের কিছু কোষের স্ফিত হওয়ার মধ্যেই এর বীজ লুকিয়ে থাকে। এঘুলো কখনো চাকা, পিন্ড আকারে দেখা যায়। পরবর্তীতে তা নীরবেই ছড়িয়ে পড়ে শরীরের বিভিন্নস্থানে। ধীরে-ধীরে শরীরের প্রয়োজনীয় অঙ্গগুলো অকেজো হয়ে যায়।
দেশে যেভাবে ক্যান্সারের আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে তার তুলনায় হাসপাতাল, চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ানের অপ্রতুলতা রয়েছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা(হু)এর মতে দেশে চিকিৎসা কেন্দ্র থাকা প্রয়োজন ১৬০ টি। রয়েছে মাত্র ১৫ টি। ক্যান্সার চিকিৎসায় বিশেষায়িত জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল ৫০টি শয্যা নিয়ে চালু হলেও এ ধরনের রোগীর চাপে বর্তমানে ১৫০ টিতে উন্নীত করা হয়েছে। শুধু হাসপাতালের চিকিৎসাই নয়, আক্রান্ত রোগীর প্রয়োজন হয় সহযোগিতা ও সহমর্মীতার। ক্যান্সারেরই যে রোগীর মৃত্যু হয় এমন নয়, কখনো কখনো স্ট্রোক বা যে কোন দুর্ঘটনায় মৃত্যু হতে পারে। তবে এ ধরনের রোগীর এই মরণব্যাধি হলে নানা মানসিক চাপে থাকেন। অনেক সময় রোগীর চারপাশের স্বজনেরা নানা নেতিবাচক কথা বলে তাকে ভীত করে তোলেন। অনেকে আত্মহত্যা করার কথাও ভেবে বসেন। নিজেকে গুটিয়ে নেন অপরাধবোধে। সেজন্য চিকিৎসকের রোগ নির্দেশনার পাশাপাশি, পরিবারের ও কাছের মানুষরা রোগীকে একান্তে নিবিড়ভাবে সময় দিতে হবে। যেন রোগের কারণে ভীতির সঞ্চার না হয়, তাকে সাহস দিয়ে মানসিক লড়াইয়ে সামিল হবার কাজটাও করতে হবে।
জাতীয় ক্যান্সার ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোশারফ হোসেন বলেন, বর্তমানে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তা সামাল দেয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকারিÑবেসরকারিসহ দেশের সর্বস্তরের জনসাধারণের সচেতনতা প্রয়োজন। বর্তমান সরকার সারাদেশে প্রায় বিনামূল্যে এধরনের রোগীদের সেবা দেয়ার চেষ্টা করছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সুলভে ওষুধের প্রাপ্যতা দিতে উদ্যোগ নিচ্ছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ)মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন ও মেডিসিন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ডা. এবিএম আবদুল্লাহ জানান,আধুনিক বিজ্ঞানের কারণে ক্যান্সার মানেই অবধারিত মৃত্যু নয়। চিকিৎসাও এখন আর অজেয় নয়। শুরুতে সনাক্ত করা গেলে চিকিৎসায় এর নিরাময় সম্ভব। নিত্যনতুন অধিক কার্যকরী কেমোথেরাপি জাতীয় ওষুধ আবিস্কার এবং রেডিওথেরাপির ব্যাবস্থা থাকায় ক্যান্সার নিরাময় সম্ভব হচ্ছে।
তিনি বলেন, উন্নত বিশ্বে মৃত্যুর কারণগুলোর মধ্যে ক্যান্সার দ্বিতীয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তৃতীয়। ক্যান্সারের লক্ষণ নির্ভর করে কোথায় কী ধরনের ক্যান্সার হচ্ছে তার উপর। তাই শরীরে কোন অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন্ হতে হবে।
সমাজসেবা অধিদফতরের মহাপরিচালক গাজী মোহাম্মদ নুরুল কবির জানান, ক্যান্সার নিয়ে আতংক যেমন রয়েছে তেমনি আছে আশার বাণীও। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার নির্বাচনী ইশতেহারে ক্যান্সারকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন। দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে ক্যান্সার হাসপাতাল গড়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। এছাড়া ক্যান্সার আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবার সহায়তায় দেয়া হচ্ছে জনপ্রতি ৫০ হাজার টাকা। গত অর্থবছরে এ খাতে বাজেট ধরা হয়েছিল ৫০ কোটি টাকা। এ অর্থবছরে ৭৫ কোটি এবং আগামী অর্থবছরে ১৫০ কোটি টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এ অর্থবছরে উপকারভোগীর সংখ্যা ১৫ হাজার। গতবছর ছিল ১০ হাজার। তার আগের বছর ছিল সাড়ে সাত হাজার। এপর্যন্ত সাড়ে ১৪ হাজার দরখাস্ত জমা পড়েছে। এই কিস্তিতে পৌনে চার হাজার জনকে এই টাকা দেয়া হবে। এরমধ্যে আরো দরখাস্ত জমা পরবে। চলতি অর্থবছরে টার্গেট ধরা হয়েছে ১৫ হাজার জনকে এই সহায়তা প্রদান করা হবে।

image_printPrint