ডাকসু নির্বাচনের জন্য ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে ঐক্য দরকার : তোফায়েল

127

ঢাকা, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ (বাসস) : দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-কে কার্যকর করার জন্য সকল সক্রিয় ছাত্র সংগঠনের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সাবেক ডাকসু সহসভাপতি (ভিপি) তোফায়েল আহমেদ।
১৯৬৮-৬৯ মেয়াদের ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদ মঙ্গলবার তাঁর বনানীর বাসভবনে বাসস’কে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘যদি ডাকসুকে কার্যকর করা যায়, তাহলে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধসহ ছাত্র রাজনীতির সোনালী অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে এই প্লাটফরম থেকে ছাত্র প্রতিনিধিরা ভবিষ্যতে জাতিকে নেতৃত্ব দিবেন।’
এই প্রবীন আওয়ামী লীগ নেতা ও পার্লামেন্টারিয়ান স্মৃতিচারণ করে বলেন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের সবকিছু বাহ্যিকভাবে ছাত্র নেতৃবৃন্দের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নেতৃত্বে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে ছাত্র নেতৃবৃন্দ দেশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।’
ছাত্র রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে ছাত্রলীগের সাবেক এই সভাপতি বলেন, দেশে বর্তমানে আদর্শিক ছাত্র রাজনীতির প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আদর্শ ভিত্তিক কোন ছাত্র রাজনীতি নাই। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকান্ডের পর, সামরিক শাসকরা, বিশেষত জেনারেল জিয়াউর রহমান ও জেনারেল এরশাদ, ছাত্রদেরকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করে ছাত্র রাজনীতির মূলোৎপাটন করেছেন।’
তিনি বলেন, দেশের রাষ্ট্রপতি হিসাবে জিয়া ছাত্র রাজনীতিকে দূষিত করার উদ্দেশ্যে ছাত্রদেরকে নৌবিহারে নিয়ে গিয়েছিলেন।
তিনি আরও বলেন, ‘সামরিক শাসকরা ছাত্র রাজনীতিকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন, যাতে ছাত্ররা আন্দোলন করতে না পারে।’
তোফায়েল আহমেদ বলেন, স্বাধীনতার পূর্বে ছাত্র সংগঠনগুলো মূলধারার রাজনীতির বাইরে গিয়ে নৈতিকতা ও আদর্শ বজায় রাখত বলে সেসময় ছাত্র রাজনীতির বৈশিষ্ট্য ভিন্ন ছিল।
তিনি বলেন, ‘আমরা, ছাত্র নেতারা, কখনো আওয়ামী লীগের মঞ্চে উঠতাম না। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ কখনো আমাদের মঞ্চে বসতেন না।’
তোফায়েল আহমেদ বলেন, তিনি যখন ছাত্রলীগের সভাপতি হয়েছিলেন, শুধুমাত্র তখন আওয়ামী লীগ নেতা হিসাবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রদের অনুষ্ঠানে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা বুদ্ধিজীবীদেরকে আমাদের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি করতাম। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত শামসুর রহমান খান, রুহুল কুদ্দুস, ফজলুর রহমান এবং সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন আমাদের অতিথি হয়েছিলেন।’
তোফায়েল আহমেদ বলেন, ছাত্ররা এখন জাতীয় নেতাদের কাতারে চলে যাওয়ায় এবং মূল ধারার রাজনীতি করায় এখন ছাত্র রাজনীতির পটভূমি পাল্টে গেছে। তিনি আরো বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলে গেছে এবং ছাত্রদের রাজনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘদিন ডাকসু নির্বাচন ও হল ইউনিয়ন নির্বাচন না হওয়ায় ১১ মার্চের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, এ নির্বাচন হতে হবে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ, এতে কে নির্বাচিত হলো, সেটি কোন বিষয় নয়।
তিনি বলেন, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) এবং ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) থেকে আমাদের অভিমত ছিল ভিন্ন। আমরা নানা বিষয় নিয়ে বিতর্ক করেছি তবে দেশ ও দেশের জনগণের কল্যাণে ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দৃষ্টান্ত হিসেবে তিনি বলেন, ১১ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করা খুব একটা সহজ ছিল না। আমরা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা, ছাত্রদের সমস্যা, পাট শিল্প জাতীয়করণসহ সকল দাবী ১১ দফার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছি।
তিনি বলেন, ডাকসু নির্বাচন থেকেই ছাত্র ইউনিয়নগুলোর নির্বাচন শুরু হতে হবে এবং পর্যায়ক্রমে রাকসু, চাকসু ও জাকসু এবং অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ও কলেজগুলোতে ছাত্র ইউনিয়ন নির্বাচত হতে হবে।
তোফায়েল আহমেদ বলেন, ছাত্র নেতারা যদি সৎ ও আদর্শবান হয় তবে নির্বাচিত ছাত্র নেতারাই ভবিষ্যতে দেশের নেতৃত্ব দিবে। তিনি বলেন, কেউ ভিপি অথবা জিএস পদে নির্বাচিত হবার পর তিনি শাসক হিসেবে নয় বরং তাকে ছাত্রদের কল্যাণে কাজ করতে হবে। ছাত্র সম্প্রদায়কে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে হবে। বর্তমানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, সরকারের কোন কর্মকান্ড ছাত্র নেতাদের কাছে ভুল মনে হলে তাদেরকে এর প্রতিবাদ করতে হবে। তারা সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করবে।
তিনি বলেন, নিয়মিত ছাত্ররা ছাত্রাবাসে অবস্থান করবে. অনিয়মিত ছাত্র এবং বহিরাগতদের আবাসিক হলে অবস্থান করার কোন অধিকার নেই। ছাত্র এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হবে ক্যাম্পাসে একটি অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখা। এটি করা সম্ভব হলে ডাকসু সফল হবে। আমি মনে করি ক্যাম্পাসে সকল ছাত্র সংগঠনের সহ-অবস্থান থাকতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে আমি কয়েকবার ক্যাম্পাসে গিয়েছিল আমার কাছে মনে হয়েছে ক্যাম্পাসের বর্তমান পরিবেশ ভাল। আমি সংবাদপত্রের পাতায় দেখেছি, ছাত্রদল নেতারা ক্যাম্পাসের মধুর ক্যান্টিনে যাচ্ছে। তারা ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে পাশাপাশি বসছে, আমরা কিছু বিষয়ে তাদের মধ্যে ভিন্ন মতও দেখেছি। আমাদের সময়েও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা এক সঙ্গে মধুর ক্যান্টিনে বসেছি, খাবার খেয়েছি। আমাদের ছাত্র জীবনে সে সময়ে আমরা আমাদের স্বর্ণালী দিন কাটিয়েছি। আমরা কখনো বিলাস জীবন-যাপন কাটায়নি। আমরা ট্রেনের তৃতীয় শ্রেণীর কম্পার্টমেন্টে ভ্রমণ করেছি। আমরা যখন স্টীমারে বরিশাল গিয়েছি, তখনও তৃতীয় শ্রেণীতে ভ্রমণ করেছি। আমরা একটি আদর্শ বজায় রেখেছি।
তিনি বলেন, আমরা যখন কোন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগ দিতে ট্রেনে ভ্রমণ করেছি, তখন দেখেছি ট্রেন বিভিন্ন স্টেশনে ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে থেমেছে, আমি মনে করেছি, জনগণ উত্যক্ত করবে। অথচ আমার ধারণা ছিল ভুল, জনগণ উত্যক্ত করেনি, তাদের মধ্যে অনেক উদ্দীপনা লক্ষ্য করেছি, তারা আমাদের বক্তব্য শুনার জন্য অনেক দূর দূরান্ত থেকে ছুটে এসেছে। তিনি তাদের সে সময়ের রাজনৈতিক জীবন থেকে শিক্ষা নিতে বর্তমান ছাত্র সমাজের প্রতি আহ্বান জানান।

image_printPrint