গর্ভবতী নারীদের চোখে বিণ্নি সমস্যা দেখা দিতে পারে

207

ঢাকা, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ (বাসস) : একত্রিশ বছর বয়সী চুমকী দাশ ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। প্রতিমাসেই এক-দুবার করে নিয়মিত গাইনি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায় তার স্বামী। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরেই তার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। আবার চোখেও কেমন জানি সমস্যা হচ্ছে। মাঝে মাঝে সব কিছুই ঘোলাটে মনে হচ্ছে। প্রথমে ভেবেছিল সন্তান সম্ভবা। তাই হয়ত এমন হচ্ছে। কিন্তু দিন দিন যেন এ সমস্যা বেড়েই চলেছে। আর তাই একদিন স্বামীকে বলেই ফেলল।
পরদিন স্বামী অফিস থেকে ফেরার পরই নিয়ে যায় ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার সব কিছু শোনার পর বেশ কিছু পরীক্ষা করতে দেয়। পরদিন সব রিপোর্ট দেখে, ডাক্তার জানান চুমকীর ডায়াবেটিস।
ডায়াবেটিসের কিছু ওষুধ দেয়ার পাশাপাশি তিনি একজন চোখের ডাক্তার দেখানোরও পরামর্শ দেন। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী তারা যান রাজধানীর ফার্মগেটস্থ ইসলামীয়া ইস্পাহানি চক্ষু হাসপাতালে। সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষা-নীরিক্ষার পর জানা যায়, চুমকী চোখের রেটিনোপ্যাথি ঝুঁকিতে আছেন। তবে তা প্রাথমিক পর্যায়ে। নিয়মিতভাবে ওষুধ আর চশমা ব্যবহারে রোগটি নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
সায়মা আক্তার জুঁই পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। গত কয়েক দিন ধরেই তার প্রচন্ড মাথা ব্যথা। আবার হঠাৎ হঠাৎ করেই চোখের সামনে দাগ বা লাইন দেখতে পায়। তখন সব কিছুই কেমন অস্পষ্ট হয়ে যায়। জুঁইয়ের সব কথা শুনে শাশুড়ি তাকে একজন গাইনি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। বিভিন্ন পরীক্ষা-নীরিক্ষার পর দেখা যায়, জুঁই উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে। গাইনি ডাক্তার তাদের পরামর্শ দেন চোখের ডাক্তারের কাছে যাওয়ার।
চক্ষু রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে গিয়ে জানতে পারেন জুঁই প্রিএকলামপসিয়া নামের জটিল এক সমস্যায় আক্রান্ত। আবার তার রক্তচাপও অতিরিক্ত। ডাক্তারের পরামর্শে তারা দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেন জুঁইকে।
চক্ষু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শামসুন নাহার বলেন, গর্ভাবস্থায় নারীদের চোখের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। কোন কোন সময় তা জটিল আকারও নিতে পারে।
তিনি বলেন, অনেক নারীই গর্ভবস্থায় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারেন। আবার অনেক নারীর ডায়াবেটিস আগে থেকে থাকতে পারে। যেসব নারীর ডায়াবেটিস থাকে তাদের চোখের রেটিনোপ্যাথি হওয়ার ঝুঁকি বেশি। আর তাই যেসব নারীর ডায়াবেটিস রয়েছে অথবা অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর ডায়াবেটিস হয় তাদের অবশ্যই চোখের ডাক্তার দেখানো জরুরী। অন্যথায় এটি জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
এছাড়াও যেসব নারীর উচ্চ রক্ত চাপ রয়েছে তাদেরও বিভিন্ন ধরনের চোখের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে এক্ষেত্রে প্রিএকলামপসিয়া নামের এক জটিল সমস্যা দেখা দেয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। তিনি বলেন, এ ধরনের রোগীদের যদি রক্তচাপ অতিরিক্ত মাত্রায় থাকে তবে তাদের দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে চিকিৎসা করানোই উত্তম।
ডা. শামসুননাহার বলেন, এসব ছাড়াও গর্ভবস্থায় অনেক নারীর চোখ শুকিয়ে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। সমস্যাটি তেমন গুরুতর না হলেও রোগীকে চক্ষু রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়াটা জরুরি। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু চোখের ড্রপ ব্যবহার করলে এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, অন্তঃসত্ত্বা নারীদের আর এক ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। আর তা হল চোখ উঠা। যাকে কনজাংটিভাইটিস বলা হয়। এটি মূলত ভাইরাসজনিত সমস্যা। কয়েক দিন পর তা সেরে যায়। এক্ষেত্রেও ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চোখের ড্রপ ব্যবহার করলে তা দ্রুত সেরে যায়।
আরেক চক্ষু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সাবিনা ইসলাম বলেন, গর্ভাবস্থায় নারীদের এমনিতেই বিভিন্ন ধরনের রোগ দেখা দেয়। এসব রোগের আবার বেশ কিছু উপসর্গ রয়েছে। যার ফলে চোখের ক্ষতি হয়। মূলত ডায়াবেটিসে আক্রান্ত অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের চোখের ঝুঁকি একটি বেশিই। আর তাই তাদের চোখের ডাক্তার দেখানো খুবই জরুরি।
এসব ছাড়াও মাথা ব্যথা, চোখে দাগ দেখা অথবা চোখ শুকিয়ে যাওয়া অথবা উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে এমন অন্তঃসত্ত্বা নারীদের অবশ্যই চক্ষু রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী চলা উচিত। অন্যথায় এসব রোগ মারাক্তক আকার ধারণ করতে পারে। এজন্য তিনি চোখ এবং হাত সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার পরামর্শও দেন।

image_printPrint